ভাই অজিতের চোখে শচিন

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:২০
শচিন টেন্ডুলকারের ‘ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড’ অজিত টেন্ডুলকার মনে করেন তার ভাইয়ের যা কিছু অর্জন এটা সম্ভব হয়েছে শুধু প্রতিভা আর শৃংখলার মিশেলে। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেয়া বিরল এক সাক্ষাত্কারে অজিত অনেক প্রসঙ্গের মধ্যে এও জানান যে, আজ বৃহস্পতিবার তারা ক্রিকেট মাঠে যাবেন শচিনের খেলা দেখতে। শুধু যাবেনই না চুটিয়ে উপভোগ করবেন ভাইয়ের খেলা। বলা হয়ে থাকে শচিনের এই উচ্চতায় ওঠার পেছনে ভাই অজিতের অবদান অনেকখানি। কিন্তু বিনয়ী এই ভাই কখনো প্রচারের আলোয় আসেন না, এমনকি কৃতিত্বও দাবি করতে নারাজ। তাই তিনি সাদামাটা- ভাবেই বলতে পারেন,‘আমি শুধু ওর সঙ্গে থেকেছি। শচিন এত প্রতিভাবান আর তার সঙ্গে এত ডিসিপ্লিনড যে, বাকি কাজটা ওই করেছে।’ অজিতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল শচিন হঠাত্ অবসরের সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? তার তো দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও যাওয়ার কথা ছিল। জবাবে তিনি বলেন,‘মাঝখানে যে ছ’মাস গ্যাপ ছিল, সেই সময়েই শচিন ভাবছিল কী করা উচিত। ও এখন ওয়ানডে খেলে না বলে মাঝে অনুশীলনের সুযোগও পায়নি। তখনই নানারকম পরিকল্পনা মাথায় ঘুরছিল। তার পর সবাই মিলে কথাবার্তা হল। এ প্রসঙ্গেই তিনি জানিয়ে রাখেন ভাইয়ের অবসরের দিনে তারা শোকার্ত নন। কারণ এটাই তো জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম। অবসর তো একদিন না একদিন হওয়ারই ছিল। তাই ওয়াংখেড়েতে তারা সপরিবারে যাচ্ছেন। চুটিয়ে ওকে শেষবারের মতো দেখে নিতে। এটা ঠিক যে, শচিনের খেলা দেখা নিয়ে তার পরিবারের লোকদের কিছুটা কুসংস্কার ছিল। এ কারণে ভাই অজিত যেমন, তেমনি ভারতীয়দের এই ক্রিকেট ঈশ্বরের মা, বৌ অঞ্জলি সবার মধ্যে কিছু না কিছু সংস্কার দেখা যেত। অজিত বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে বলেন,‘ঠিকই’। আমরা শচিনের খেলা কখনও লাইভ দেখতাম না। বাড়িতে থাকলেও টিভি বন্ধ করা থাকত। বা লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়তাম। ভিস্যুয়ালাইজ করতাম, ও দারুণ ব্যাট করছে। সলিড সব ড্রাইভ খেলছে। পুল করছে। শচিন ক্রিজে থাকার সময় আমার মা প্রার্থনায় বসতেন। অঞ্জলি নির্দিষ্ট একটা জায়গায় বসে থাকত। আমার বড় ভাই আর তার স্ত্রী, বোন আর বোনের হাজবেন্ড সবাই মিলে প্রার্থনা করত যে, ধুমধাম মারতে গিয়ে ও যেন উইকেট না দিয়ে আসে। অথচ এই ব্যাটসম্যানটিকেই ক্রিকেট দুনিয়ার তাবত বোলার সমীহ করতেন। ভয় পেতেন। তাহলে কেন এই কুসংস্কার? অজিতের মতে-‘দেখুন, ব্যাটসম্যান ক্রিজে পৌঁছে গেলে পৃথিবীর আর কেউ তার সঙ্গে থাকে না। সে তখন নিজেই একমাত্র হতে পারে তার ত্রাতা। এত বছর ধরে গোটা পরিবার ওর জন্য যা করে এসেছে তার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু আমরা চেয়েছি ব্যাটিং ক্রিজে অন্তত স্পিরিটে ওর সঙ্গে থাকতে। সশরীরে যদিবা নাও থাকতে পারি। ও যেন জানে, পরিবার কখনও ওকে নিঃসঙ্গ থাকতে দেয়নি। সবাই ওর কাছেই আছে। কুসংস্কার থাকলেও পিতার মৃত্যুর পর শচিনের নিরানব্বই বিশ্বকাপে ফেরাটা ছিল আবার অতিজাগতিক এক কথন। কেননা পরিবার মিলেই একরকম জোর করে তাকে ক্রিকেট মাঠে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। বিশেষ করে তার মা। এ প্রসঙ্গে শচিনের বড় ভাই বলেন,‘ফেরত তো পাঠানোরই কথা। মে মাসে যখন বাবার প্রথম হার্ট অ্যাটাক হল, শচিন শ্রীলঙ্কায়। বাবা তখন অক্সিজেন মাস্ক পরা অবস্থায়। কাছে গিয়ে বললাম, শচিনকে জানাইনি। কাল ও ব্যাট করবে। পরের দিন সেঞ্চুরি করল। বাবাকে এসে জানালাম। উনি ওই অবস্থার মধ্যেই কী খুশি! শচিনের ক্রিকেট ঘিরে বাবার যা দরদ ছিল, মৃত্যু হয়েও যদি পাঁচ মিনিটের জন্য উনি ফেরত আসতেন, ঠিক বলতেন, এ কী! আমার শোকে বাড়িতে বসে আছ কেন? যাও গিয়ে দেশের হয়ে খেলো। মুম্বাই টেস্ট শেষে আর খেলবেন না শচিন। সর্বকালের সেরাদের শীর্ষে থাকা এই প্রবাদপ্রতিমের কিংবা তার পরিবারের জীবন কেমন হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এটাই হবে যে, চব্বিশ বছর পর আর সে ইন্ডিয়া ক্যাপ পরবে না। শচিনও সকালে উঠে ভাববে না গোটা দেশের আনন্দ এনে দেয়ার অমানুষিক দায়িত্ব আমার ওপর। চিন্তা হবে না কোন কোন বোলারকে পিটিয়ে জেতাতে হবে। মিডিয়ার কাটাছেঁড়া আর প্রতিনিয়ত বিদ্ধ করবে না ওকে। আর বাটার চিকেনটা বেশি করে খাওয়ার সময় দুশ্চিন্তা তাড়া করে ফিরবে না।’