দিনাজপুর জেলা সদরের সহিত ১৩টি উপজেলার সংযোগ সড়কসমূহে বেইলি ব্রিজ রহিয়াছে ৯টি। এইসব বেইলি ব্রিজের উপর দিয়া প্রতিদিন গড়ে ১৫ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। ট্রাকসহ ছোটবড় নানান ধরনের যানবাহন চলাচল করিয়া থাকে। দুর্ঘটনাও ঘটে হর হামেশা। রেলিং ভাঙিয়া যানবাহন পানিতে পড়িয়া যাইবার ঘটনাও ঘটে। গত মঙ্গলবার এই বিষয়ে একটি নাতিদীর্ঘ রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে দৈনিক ইত্তেফাকে। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, বেইলি ব্রিজগুলির বেশির ভাগেরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। নড়বড়ে অবস্থা, যেকোনো সময় ভাঙিয়া পড়িবার আশংকা। দিনাজপুর পার্বতিপুর সড়কের তিনটি ব্রিজের অবস্থা খুবই খারাপ। কিন্তু প্রয়োজন বড় বালাই, উপেক্ষা করা যায় না। কাজেই মানুষ ঝুঁকি নিয়াই যাতায়াত করিয়া থাকেন।
শুধু দিনাজপুর বলিয়া তো কথা নহে, সারাদেশেই বিভিন্ন সংযোগ সড়কের উপর বেইলি ব্রিজ রহিয়াছে। সেইসব ব্রিজের বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনা ঘটিবার সংবাদও পত্রিকায় ছাপা হইতে দেখা যায় প্রায়শ। আমরা যতদূর জানি বেইলি ব্রিজ স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়। নেহায়েত সাময়িক কাজ চালাইবার জন্যে এই ধরনের ব্রিজ স্থাপন করা হয়। যুদ্ধের সময় এইরূপ সেতুর ব্যবহার দেখিতে পাওয়া যায় বেশি। ১৯৪২ সালে উত্তর আফ্রিকায় ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম এই ধরনের ব্রিজ তৈরি করে। ইহার পর আমেরিকান সামরিক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটও ইহার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। ব্রিটিশ আমল হইতেই বাংলাদেশের বেইলি ব্রিজ নির্মাণ চলিয়া আসিতেছে। এক সময় জাপান অনুদান দেওয়া শুরু করে এবং চীন ও ভারত হইতে বেইলি ব্রিজের যন্ত্রাংশ কেনা শুরু হয়। আমাদের দেশে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় বহু স্থানে ভাঙিয়া যাওয়া সেতু-কালভার্টের স্থলে বেইলি ব্রিজ স্থাপন করিয়া সাময়িক যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। পরে এই ধরনের অনেক ব্রিজ স্থাপন করা হইয়াছে। বোধগম্য কারণেই স্টিলের তৈয়ারি এইসব সেতু হালকা হইয়া থাকে। ভারি যানবাহন চলিবার জন্য এই ধরনের সেতু মোটেও উপযুক্ত নয়। শুধু বেইলি ব্রিজের কথাই বা বলি কেন! যে কোনো সেতু বা রাস্তার একটা মেয়াদ থাকে। সেইগুলি কতটুকু ওজন বহন করিতে পারে তাহারও একটা সীমারেখা রহিয়াছে। আমাদের দেশে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যেইসব সড়ক ও সেতু রহিয়াছে সেইগুলি খুব ভারি যানবাহন চলিবার উপযোগী নয় অনেক ক্ষেত্রেই। তাহারপরও সেইসব রাস্তার উপর দিয়া ট্রাক, বাস ও লরির মত ভারি যানবাহন চলে নির্বিচারে। উপরন্তু বেশিরভাগ সময়ই ওইসব যানবাহন ওভার লোডেড থাকে। ট্রাকের গায়ে ‘পাঁচটন’ লেখা থাকিলেও প্রকৃতপক্ষে দ্বিগুণ-তিনগুণ মালামাল বহন করা হইয়া থাকে। ইহার পরিণতিতে রাস্তা ও ব্রিজ কালভার্টের আয়ুষ্কাল আরও হ্রাস পায়। মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার আগেই সেইগুলি ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া যায়। বেইলি ব্রিজসমূহের অবস্থা তো আরও খারাপই হইবার কথা।
এই বাস্তবতা মানিয়া লইয়াই রাস্তাঘাট, পুল কালভার্ট ও বেইলি ব্রিজসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ করা দরকার। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারাদেশে ব্রিজের সংখ্যা ৪৬৫৯টি। তন্মধ্যে স্টিল ও টিম্বার ডেকের বেইলি ব্রিজের সংখ্যা যথাক্রমে ১০০৫টি ও ৮২টি। ইহাছাড়া এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনেও বেইলি ব্রিজ রহিয়াছে। এইসব ব্রিজের দেখভাল করিবার স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষ নাই তাহা তো নহে। রাস্তা ও ব্রিজ দেখা-শোনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যাহাদের উপর ন্যস্ত কর্তব্য পালনে তাহাদের বেখেয়াল হইলে চলিবে না। বেইলি কিংবা পাকা সেতু সময়ান্তরে সংস্কার করা অত্যাবশ্যকীয়। মেয়াদ ফুরাইবার কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিবার আগেই প্রয়োজনীয় সংস্কার করা বাঞ্ছনীয়। মনে রাখা দরকার যে, সংস্কার-মেরামত একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। দিনাজপুরের উপজেলা সংযোগ সড়কসমূহের উপর ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজসমূহ মেরামতের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে, ইহাই প্রত্যাশিত।
