থমকে গেছে সবকিছু— গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বাসনা, সুখ-শান্তির তীব্র প্রতীক্ষা সবকিছু। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীর ফোনালাপের পর গণমানুষের মনে দীর্ঘ উপেক্ষিত যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল, তা ভেংগে টুকরো টুকরো হলো ফোনালাপ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায়। এত কিছুর পরও আমরা ভাবছি, কথা বলছি, লিখছি— হতভাগ্য জাতির বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করছি।
দু’নেত্রীর ফোনালাপের আগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার কাঠামো ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের রূপরেখা প্রণয়ন করে রাজনীতিবিদগণের নিবিড় চিন্তার খোরাক যুগিয়েছিলেন। আশা করা হয়েছিল, সেসব ফর্মুলার সারাংশ চয়ন করে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সরকার ও বিরোধী দলীয় জোটের স্বার্থপর রাজনৈতিক এজেন্ডার কাছে পরাস্ত হলো বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের সবটুকু। এমন দুর্ভাগ্যের ভোগান্তিতে জর্জরিত হবে বাংলাদেশের মানুষ, তা বোধকরি ৩০ লক্ষ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বিদেহী আত্মার কেউ-ই ভাবেননি, হয়ত বা পারলৌকিক জীবনে তাঁরা ডুকরে কেঁদে উঠছেন। তাঁদের রেখে যাওয়া সোনার বাংলাদেশের স্বপ্নভংগ দেখে। আমরা কি তাদের আত্মার পাশে দাঁড়িয়ে মৌন-নিরবতায় প্রতিজ্ঞা করতে পারি না জাতীয় স্বার্থ, হ্যাঁ একমাত্র জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে আমাদের রাজনৈতিক কর্ম-পরিকল্পনায়!
রাজনৈতিক সংকটের ভয়ংকর সময়ে বিরোধী দলীয় নেত্রীর ফোনে ভেসে এলো প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠ— আলাপ হলো, মান-অভিমান, অভিযোগ-অনুযোগ উত্থাপিত হলো দু’জনের পক্ষ থেকেই। আমরা আশ্বস্ত হলাম তবুও। ঐদিনকার ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং পরের দিনের পত্র-পত্রিকায় পৃষ্ঠা জুড়ে আশাবাদ ব্যক্ত হলো, সুখের ঝিরিঝিরি বাতাস বইতে লাগলো সর্বত্র। আবার হঠাত্ করেই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো, যেন দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলা কৃষকের ছনের ঘর বৈশাখী তাণ্ডবে দুমড়ে-মুছড়ে গেল। কেন এমন হলো? কেন এমন হতে পারলো?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংলাপের আমন্ত্রণ জানালেন মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীকে। এমন কি ক্ষতি হতো তার দাওয়াত গ্রহণ করলে? হরতালের ঘোষণার কারণ দেখিয়ে সংলাপের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেন মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় স্পর্শকাতর বিষয়টি ছিল কোনমতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চায়ের টেবিলে সামনা-সামনি বসে জনগণের দাবি, জনগণের প্রত্যাশাকে সরাসরি তুলে ধরা। হরতাল বহাল রেখে প্রয়োজন হলে বিশেষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বেষ্টিত হয়ে তিনি যেতে পারতেন প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে। কথা কাটাকাটি হতো, মান-অভিমান হতো, ঝগড়া হতো, তারপরও একটা সমাধান হতে পারতো, সেই পরিস্থিতিতে একটা সমাধান হয়েই যেতো। অথবা হরতাল স্থগিত করে সরকারকে প্রচণ্ড চাপে রেখে সংলাপে অংশ নিতে পারতেন তিনি, একটি হুমকি জিইয়ে রাখা যেতো, জনতার দাবি অগ্রাহ্য করলে সরকারকে হরতালের ভয় দেখানো যেতো। হয়তবা এ বিকল্প নিবারক কৌশল (deterrent strategy) হিসেবে কাজ করতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মত দু’পরাশক্তিকে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা থেকেও রক্ষা করছিল তখনকার নিবারক নীতি। ঝগড়া বেধেছে বিএনপি জোট ও আওয়ামী লীগ জোটের মাঝে, সরকার ও বিএনপি জোটের মাঝে নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে তখন তিনি আওয়ামী লীগের কেউ নন, তিনি সরকারের, তিনি বাংলাদেশের, তিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রধানমন্ত্রী। বোধ করি আমাদের নেতৃবৃন্দ সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যকার এই পার্থক্যটুকু আঁচ করতে চান না, বা আঁচ করতে পারেন না। বিরোধী নেত্রী হরতাল শেষ হলে যেকোন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দেয়ার ঘোষণা দেয়াতে তেমন দোষের কিছু ছিল না। সরকারকে সইতে হয় অনেক কিছু। আমার বাবা বলতেন সরকারের থাকতে হবে গন্ডারের চামড়া। সকল ঝড়-ঝাপটা সইবার ক্ষমতা তো সবকারেরই থাকা উচিত। বিরোধী দল সরকারকে ফাঁদে ফেলে সরকারের সহ্য ক্ষমতা ধ্বংস করে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস করতে বা নষ্ট করতে যে কৌশল গ্রহণ করে, সেই কৌশলের কাছে হেরে গেলো আমাদের সরকার। হরতালের ভাংচুর নিহত-আহতের কারণ দেখিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁরই প্রস্তাবিত সংলাপের দাওয়াত সংকুচিত করে ফেললেন। বাংলাদেশের মানুষ হরতালের চরিত্র ও সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। হরতালই যেন আমাদের স্বাভাবিক জীবনাচরণে পরিণত হয় সকল সরকারের শেষ বছরে। কেউই সম্ভবত এ প্রমাণ দিতে পারবেন না যে, আমাদের কোন হরতাল শান্তিপূর্ণ হয়েছে, ভাংচুর, আহত-নিহতের কোন ঘটনা ঘটেনি। এক-দুটি সরকার সমর্থিত হরতাল-নাটক ছাড়া এই-ই হলো আমাদের রাজনৈতিক হরতালের ইতিহাস।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য স্পর্শকাতর ছিল, বিরোধী দলকে সংলাপে বসিয়ে তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নের কৌশল অবলম্বন করা। সম্ভবত এখানেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এতটুকু সতর্কতা বৃহত্তর জাতীয় রাজনৈতিক দুরবস্থা থেকে পুরো জাতিকে মুক্তি দিতে পারতো।
দু’নেত্রীর ফোনালাপ পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাসমূহ খুবই অযত্নভাবে পরিচালিত। এফবিসিসিআই এক প্রশংসা প্রস্তাব নিয়ে এলেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপ অনুষ্ঠানের। বণিক গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত সংলাপে বিএনপি সাড়া দিলেও আওয়ামী লীগের নিরুত্তরের কারণে তা ব্যর্থ হলো। একটি প্রথম শ্রেণীর ইংরেজি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে “Good-bye dialogue” শিরোনাম দেখে শিউরে উঠলাম।
আমি আশাবাদী, এখনো একবুক আশা নিয়ে গণ-মানুষের নাড়ীর যে স্পন্দন শুনছি, তা এখানে লিখছি। সফল মানুষ কখনো পেছনে যায় না, পেছন ফিরে তাকায় না। সফল যোদ্ধা কখনো পেছনকার মৃত্যু, জরা, ক্ষত নিয়ে মাথা ঘামায় না। শত শত মৃত-সহযোদ্ধার লাশ মাড়িয়ে সে শুধু সামনে যায়, শুধু সামনে। লড়তে লড়তে একসময় হয়ত সে মরেও যায়, তবুও বেঁচে থাকে ইতিহাসে।
আমাদের দু’নেত্রীকে ইতিহাসে সম্মান এবং প্রশংসার জায়গা করে নিতে হবে। সময় তাঁদের বড় সম্পদ এখন। যে কোন মূল্যে “সময়” কে সাক্ষী রেখে অনতিবিলম্বে তাদের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। দুটি কারণে আমি এটা বলছি। প্রথমত ইতিমধ্যে জনগণের এক বিরাট অংশের মনে দু’নেত্রী ও দু’জনের ব্যাপারে অনীহা ও বীতশ্রদ্ধ তৈরি হতে শুরু করেছে। রাস্তা-ঘাট, চা-স্টল, গ্রাম-গঞ্জে যেখানে গিয়েছি, সেখানে মানুষকে বলতে শুনেছি এমন সব কথা, যা দু’নেত্রী ও দু’দলের বিরুদ্ধে যায়। এমনি এক অনুভূতির পরিশীলিত ও সংঘবদ্ধ রূপ হলো তৃতীয় শক্তির তত্পরতা। আমি এর বিরোধী। কারণ তৃতীয় শক্তির সকলেই অতীতে বা বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রত্যক্ষ পরোক্ষ অনুসারী, অনুগামী ও দলীয় কার্যক্রমের অংশীদার হিসেবেই পরিচিত। সমাধান কখনো মাইনাস টুতে নয়, সমাধান “টু প্লাসে”। অর্থাত্ দু’নেত্রীকে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংস্কারের সংস্কৃতিতে প্রজ্ঞাবতী হয়ে দলীয় নেতৃবৃন্দকে রাজনৈতিক সহনশীলতা, অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সংলাপে অভ্যস্ত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও আশ্বস্ত করতে হবে।
ইতিমধ্যেই বিরোধী জোটের উপর্যুপরি হরতালে জনজীবন বিপর্যস্ত। সরকারের মন্ত্রীদের পদত্যাগের পর দেশ এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছে। এরমধ্যে কোন সমাধান না হলে, সংলাপ না হলে দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে, এটা নিশ্চিত।
দু’নেত্রী ও দু’দলের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর দ্বিতীয় তাগিদ হলো আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিঃহস্তক্ষেপের অতীত বাস্তবতা। ১/১১ এর বিভীষিকাময় রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমরা ভাবতে পারি না। আবার আমাদের রাজনীতিতে বহিঃহস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়ার মতো অবস্থানেও আমরা নেই। আমরা উন্নয়নশীল দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি (Political economy) নিয়ে খুব কমই ভাবি এবং সে কারণে আমরা রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণে ভুল করি। আমাদের মত গ্রহীতা দেশের পক্ষে দাতাদের ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা অগ্রাহ্য করার সুযোগ কোথায়। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদগণ অর্থনীতির পাতায় পাতায় “সাহায্য ও নির্ভরশীলতা” (aid and dependency) নিয়ে লিখেছেন অজস্র, সেই গবেষণাগুলো পন্ডিতদের নিরন্তর সাধনার সার। ইতিমধ্যে দাতারা ক্ষুব্ধ, বিদেশিরা হতাশাগ্রস্ত এমন খবর ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী ভারত বার বার মিটিং করছে, বাংলাদেশ নিয়ে ভাবছে। যারা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে একটু পড়াশুনা করেন, তারা জানেন ‘ভারত-মতবাদ’ (India doctrine) আমাদের কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আবার যারা বিশ্বরাজনীতির অলিতে-গলিতে বিচরণ করেন, তারাও জানেন যুক্তরাষ্ট্রের দখলতত্ত্ব (Hegemonic Stability Theory) বাংলাদেশের মত কত করুণ ভবিষ্যতের জন্ম দিতে পারে। পরিশেষে দু’নেত্রীকে অনুরোধ করবো, সকল জড়তা, দ্বিধা, সংশয়, মান-অভিমান, অভিযোগ দূরে রেখে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অচিরেই যেকোন পর্যায়ে সংলাপে বসতে। এ দেশ আমাদের দু’নেত্রী আমাদের হূদয়ে, এদেশের যেকোন সমস্যায় সমাধান সম্ভব কেবল তাঁদের দ্বারাই। আমরা সবকিছু তছনছ হয়ে যাওয়ার আগে এই শেষ অনুরোধ রাখছি প্রিয় নেতৃদ্বয়ের কাছে।
লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
e-mail:[email protected]
