আজ অবিস্মরণীয় আশুরা দিবস। ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ফোরাতের দুই কূল ছাপা নদীর কিনারায় রসূল (স.) এর আহলে বায়াত প্রিয় দৌহিত্র আলী (রা.) ও ফাতেমা (রা.) এর কলিজার টুকরাসম ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁহার পরিবার পরিজনসহ মোট ৭২ জন মর্দে মুজাহিদ এক বিন্দু পানি হইতে বঞ্চিত হইয়া শাহাদাতের পেয়ালা পান করিয়াছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়— ‘নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া/আম্মা লাল তেরী খুন কিয়া খুনিয়া/কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে? সে কাঁদনে আঁসু আনে সিমারের ছোরাতে’ আরবী আশুরা শব্দের অর্থ দশ। মহররম মাসের এই দশ তারিখে পৃথিবীর বিস্ময়কর ঐতিহাসিক বহু ঘটনার অবতারণা হাইয়াছে। যেমন ১০ মহররম হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হইয়াছিল। এই দিনেই তাহাকে বেহেশতে প্রবেশ করানো হইয়াছিল। এই দিনেই তাহাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হইয়াছিল। প্রায় তিনশত বত্সর পরে আরাফাত ময়দানে আদম-হাওয়ার সাক্ষাত্ ও তাহাদের তওবা কবুল হইয়াছিল। তাহাছাড়া এইদিনে হযরত নূহ (আ.) এর কিশতি ৪০ দিন পর জুদি পাহাড়ে পৌঁছায়, হযরত ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড হইতে সুস্থভাবে বাহির হইয়া আসেন। হযরত আইউব (আ.) ১৮ বত্সর রোগ ভোগের পর তাঁহার হারানো সিংহাসন ফিরিয়া পাইয়াছিলেন। হযরত সোলায়মান (আ.) তাহার বাদশাহী লাভ করেন, দাউদ (আ.) এর তওবা কবুল হয়। হযরত ইদ্রিস (আ.) কে আল্লাহ আসমানে উঠাইয়া নেন। হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট হইতে উদ্ধার পান। হযরত ইউসুফ (আ.) কুয়া হইতে উদ্ধার পান এবং এই দিনেই তিনি মিশরের খাদ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেন, তাওরাত কিতাব প্রাপ্ত হন এবং ফেরাউনের কবল হইতে মুক্ত হন। আর ফিরাউন ও তাহার সৈন্য সামন্তের নীল দরিয়ায় সলিল সমাধি হয়। হযরত ঈসা (আ.) ইঞ্জিল শরীফ কেতাব প্রাপ্ত হন এবং এই দিনেই আল্লাহ তাহাকে আসমানে উঠাইয়া নেন। এই দিনেই উম্মতে মুহাম্মাদীর গুনাহ মাফ করা হয়।
আশুরা দিবসে সর্বশেষ যে হূদয়বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটিয়াছিল তাহা কারবালা প্রান্তরে। ইয়াজিদের নির্দেশে কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের সৈন্যরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছিল। সেইদিন ছিল ১০ই মহররম ৬১ হিজরী, ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দের ১৯ অক্টোবর। সকালে একটি লাল সূর্যের উদয় হইলো পশ্চিম আকাশে। ফজরের নামাজের পরই হযরত হুসাইন (রা.) তাঁহার সাথীদের দাঁড় করাইলেন। মাত্র ৩২ জন ঘোড় সওয়ার ও ৪০ জন পদাতিক সৈন্য নিয়া গঠিত তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনী। ডানদিকে যুহাইর বিন কাইন এবং বামদিকে হাবীব বিন মুযাইর নিজ নিজ দলের অধিনায়ক নিযুক্ত হইলেন। বাহিনীকে এইভাবে সাজাইলেন যে পিছনে তাঁবুগুলি। আর পিছনের দিকটাকে অধিকতর নিরাপদ করিবার জন্য পরীখাসদৃশ গভীর গর্তগুলিতে আগুন জ্বালাইয়া দিলেন, যাহাতে শত্রুরা পিছন দিক হইতে আক্রমণ করিতে না পারে। আর ফুরাতের পানি নিজেদের দখলে নিলেন। যথারীতি যুদ্ধ শুরু হইলো। প্রবল বীরবিক্রমে মুসলিম সৈনিকেরা শাহাদাতের পেয়ালা হাতে নিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়ে প্রায় দুই হাজার শত্রু সৈন্য খতম করিয়া দিলেন। কিন্তু মুসলিম বাহিনী হইতেও ঝরিয়া পড়িল অনেকগুলি তরতাজা প্রাণ। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের বা ইয়াজিদের বাহিনী পানির দখল নিয়া নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুসাইন শিবিরে পানির জন্য হাহাকার পড়িয়া গেল। কাসেমকে কোলে নিয়া শত্রুদের কাছে এক কাতরা পানি প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু শিশু পুত্র আলী আকবর ও কাসেমের মৃত্যু হযরত হুসাইনকে আবারও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করিলো। তিনি অনেক শত্রু নিধন করিলেন। অবশেষে একটি তীর আসিয়া তাহার গণ্ড মোবারক অবধি বিদ্ধ হইল। সাথে সাথে ঘোড়ার পৃষ্ঠ হইতে তিনি মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন। একটানে তীরটি বাহির করিয়া ফেলিলেন ও শত্রুদের উপর আক্রমণ চালাইতে থাকিলেন। কিন্তু গণ্ডদেশ হতে রক্তক্ষরণ তাঁহাকে দুর্বল করিয়া ফেলিল। এমতাবস্থায় পর পর কয়েকটি তীরবিদ্ধ হইলেন হুসাইন (রা.)। অবশেষে জ্ঞান হারাইয়া ফেলিলেন। নিষ্ঠুর পাষণ্ড নরখাদক সিমার হযরত হুসাইন (রা.) এর মস্তক কর্তন করিয়া খণ্ডিত মস্তক নিয়া এজিদের দরবারে পৌঁছাইলো। এই যুদ্ধে হযরত হুসাইন (রা.)-এর পুত্র জয়নাল আবেদীন ছাড়া সবাই শাহাদাতবরণ করেন। আমরা প্রার্থনা করি কারবালার শহীদানের মাগফিরাত। সেই সাথে এই পবিত্র দিনে কামনা করি দেশ ও মুসলিম উন্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি।
