মহা শোকের মাস মহররম

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০৭
হিজরী সনের প্রথম চন্দ্রমাসের নাম মহররম। এ মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলে। শুধু ইসলামী চন্দ্র বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাস বলেই নয়, মহররম মাসের রয়েছে অন্যরকম তাত্পর্য ও গুরুত্ব। আশুরার দিন মুসলিম বিশ্বের কাছে একদিকে যেমন পবিত্র ও স্মরণীয়; অন্যদিকে শোকাবহ। এদিনেই কারবালার ফোরাত নদীর তীরে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র পাক পাঞ্জাতনের অন্যতম সদস্য হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) সত্য-ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি মাতামহের আদর্শ সমুন্নত রাখতে গিয়ে আত্মীয় ও ৭২ সঙ্গীসহ মাবিয়ার পাপিষ্ঠ পুত্র ইয়াজিদের নির্মম ও পৈশাচিক অত্যাচারে শাহাদাতবরণ করেন। পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের দোসর পাপাত্মা সীমার তীব্র পানির অভাবে দারুণ যাতনা এবং তিনদিন অনাহারে থাকা হযরত ইমাম হোসাইনকে (আ.) পিপাসার্ত অবস্থায় ৬১ হিজরীর ১০ মহররম (আশুরা) শুক্রবার শহীদ করে। মস্তক দিলেও অসত্য-অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)। প্রিয় মাতামহের আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি। তার সে প্রাণপণ চেষ্টা বৃথা যায়নি। ইমাম হোসাইন (আ.) শহীদ হলেও ইসলামের সত্যিকার আদর্শ ও মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হওয়ার বদলে আরও মহিমান্বিত করেছেন। আর সেই কারণেই কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে :‘ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালাকে বাদ’ (কারবালার ঘটনার মধ্যদিয়েই ইসলাম পুনরায় জেগে উঠেছে)। এছাড়া আশুরার দিনে আরও অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে, যা মুসলিম ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। এ কারণেই সত্যিকার মুসলমান ও সুফী মতাবলম্বীদের কাছে মহররম বিশেষ করে আশুরার দিন বিশেষ পবিত্র ও শোকের। শেরে খোদা হযরত আলী ও খাতুনে জান্নাত হযরত মা ফাতেমা যাহরার (আ.) কলিজার টুকরা হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) তিনি শুধু রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্রই ছিলেন না, পবিত্র কোরআনের আয়াতে মুবাহালা (আল ইমরানঃ ৬১)-এর স্পষ্ট ঘোষণা মতে তার সন্তানও ছিলেন। প্রিয় এই সন্তানের মুখে নবীজীর পবিত্র মুখের লালা, তাঁর সর্বাঙ্গে নবীজীর আদরের চুম্বনের স্পর্শ, নবীজী নিজে ঘোড়া হয়ে প্রিয় সন্তানকে সেই পিঠে সওয়ার করানো, হুজুরের সিজদার হালে পিঠে সওয়ার হোসাইন যতক্ষণ স্বেচ্ছায় পিঠ থেকে অবতরণ না করেছেন ততক্ষণ সিজদা অব্যাহত রাখার ঐশী নির্দেশ, শিশু হোসাইনের ক্রন্দন শুনে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর খুতবা স্থগিত রেখে মেম্বর থেকে নেমে আসা ইত্যাদি হাজারো বিরল ঘটনা তখনও মুসলমানদের স্মৃতিপটে জীবন্ত ছিল। শুধু তাই নয়, মসজিদুন নববীর সমবেত মুসল্লীদের সামনে শিশু হোসাইনকে হাজির করে হুজুর (স.) পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছেনঃ “এ হল আমার হোসাইন, অতএব তাঁকে চিনে নাও।” উম্মতের যাতে হোসাইনকে(আ.) চিনে নিতে কষ্ট না হয় সেজন্য রাসুলুল্লাহ (স.) আরও সহজ করে দিয়ে বলেছেনঃ “হোসাইন আমা হতে আর আমি হোসাইন হতে।” কিন্তু এতসব সত্ত্বেও মাত্র অর্ধশতাব্দীকাল অতিক্রান্ত না হতেই সেই নবীর উম্মতই কীভাবে তাঁরই এ সন্তানকে চিরকালের চরম নৃশংসতায় সপরিবারে হত্যা করে উল্লাসে ফেটে পড়তে পারে— এ প্রশ্ন তাবত্ বিবেকবান মানুষের। এর উত্তর খুঁজতে কেটে গেছে চৌদ্দটি শতাব্দী। হয়তো লেগে যাবে আরো কতকাল, ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমন অবধি। সৈন্যবেষ্টিত যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি প্রাণীও ইমাম হোসাইনকে (আ.) পরিত্যাগ করে গেল না। পবিত্র কারবালাই সত্যিকার ইমানদারের পরীক্ষা। দুঃখের দিনেই সত্যিকার বন্ধুর পরিচয়। একে একে সবাই শপথ গ্রহণ করলেন একফোঁটা রক্ত থাকতে কেউ ইমামকে ছেড়ে যাবেন না। ধর্মের জন্য, সত্যের ও ন্যায়ের মর্যাদা রক্ষার জন্য মুসলমান যে হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করতে পারেন, ইমাম হোসাইন (আ.) ও তার অনুসারী ৭২ জন মুসলমান ‘কারবালা’ প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করে তারই অক্ষয় স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আমরা ইমাম হোসাইনকে (আ.) কারবালা প্রান্তরে দেখতে পাই ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, আত্মত্যাগের এক অপূর্ব মূর্তরূপে। চোখের সামনে ক্ষুধা পিপাসায় কাতর, ্আপন পরিজনের ম্লানমুখ, নিশ্চিত মৃত্যু তাকে সংকল্পচ্যুত করতে পারেনি। সদ্যজাত শিশুপুত্র আজগরের মর্মান্তিক মৃত্যু তাকে বিচলিত করতে পারেনি। নওশার সাজে সজ্জিত কন্যা-জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র নওজোয়ান কাসেমের মৃত্যু তাকে কর্তব্য-কর্ম থেকে বিরত করতে পারেনি। সত্যের পরীক্ষায় জয়যুক্ত হয়ে শহীদ হলেন ইমাম হোসাইন (আ.) কিন্তু আদর্শহীন এজিদের নিকট বায়েত গ্রহণ করতে সম্মত হননি। একদিকে অতুল ঐশ্বর্য, অপ্রতিহত ক্ষমতা ও অগাধ সম্মান আর একদিকে দুঃখ, নির্যাতন, নিষ্ঠুর নিষ্পেষণ ও মৃত্যুর হলাহল। সত্যিকার মুসলমান ঈমানের পরীক্ষা দিতে, শেষের পথই বেছে নেন। এরা চিনদিনই মুষ্টিমেয় কিন্তু পরিণামে বিজয়মালা এদেরই পদতলে লুণ্ঠিত হয়। রাসুলে করিমকে (স.) যারা প্রকৃত ভালবাসেন ও আহলে বাইত বিশ্বাস করেন তারা তার প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ও বংশধরদের হত্যাকাণ্ডের স্মরণ ও প্রতিবাদ কেয়ামত পর্যন্ত শোকের মাধ্যমে করতে থাকবে। দ্বীনের রাসুল ও খোদার আশেকান উম্মতের ভিতর থেকেই এই প্রতিবাদী দল বের হতে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত। আশুরার এই ঐতিহাসিক ঘটনার মূল চেতনা হচ্ছে ক্ষমতার লোভ, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য চক্রান্ত ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। বর্তমান দুনিয়ায় আশুরার এই শিক্ষা খুবই প্রাসঙ্গিক। ন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ও ত্যাগের যে শিক্ষা কারবালার ঘটনা মানবজাতিকে দিয়েছে তা আজকের দুনিয়ার অন্যায় ও অবিচার দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। কারবালার শিক্ষা হোক আমাদের পাথেয়। লেখক :সাজ্জাদানশীন, গড়পাড়া এমাম বাড়ী দরবার শরীফ, মানিকগঞ্জ এবং সভাপতি, পাক পাঞ্জাতন অনুসারী পরিষদ, বাংলাদেশ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন