গীতাঞ্জলির শতবর্ষ

রবীন্দ্রনাথ ও শতবর্ষের বাঙালির প্রথম নোবেল

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০৭
দেশের অবস্থা দেখলে মনে হয়, আমাদের জীবনে শান্তি, আনন্দ, কল্যাণ বা অর্জন বলে কিছু নেই। আমরা কেবল মারামারি আর হানাহানিতেই ব্যস্ত থাকি। বাঙালি যে যুদ্ধ ও রক্তপাতে এ দেশ স্বাধীন করেছিল, তার নাম মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, নৃশংসতা এবং বিজয় সবগুলোই বিশ্ব ইতিহাসের সাথে তুলনাযোগ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা বড় বড় কয়েকটি যুদ্ধ-সংঘাত বাদ দিলে পৃথিবীর কোন দেশে এমন গণহত্যা সংঘটিত হয়নি। এত রমণীর লাঞ্ছনা বা বুদ্ধিজীবী নিধনও চোখে পড়ে না, অতঃপর জনস্রোতে, জনউচ্ছ্বাসে যে বিজয় তাও ছিল অভাবনীয়, মনোরম ও রক্ত অক্ষরে লেখা অনন্য সাধারণ। যারা আমাদের দমিত পদদলিত আর নিজ দেশে পরবাসী করে রাখতে চেয়েছিল তাদের আগ্রাসন ও অত্যাচার ভেঙে স্বাধীনতার আলোয় এক কবিও আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি আমাদের প্রাণের মানুষ আপনজন রবীন্দ্রনাথ। অকারণ নিষিদ্ধ আর সাম্প্রদায়িকতার শিকার কবি রবীন্দ্রনাথ কখনোই অন্তর থেকে মুছে যাননি, তিনি ছিলেন বটে, তারপরও পাক আমলের নিষেধাজ্ঞায় থেকেও না থাকা থেকেই আমাদের শক্তি যুগিয়েছেন, সে শক্তি যে কত প্রচণ্ড এবং জোরালো তা এখন বোঝানো মুশকিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্বল্পধারণ ক্ষমতাকে অসীম করে তুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। আমাদের দুর্বল প্রাণে শক্তি যোগানো অকুতোভয় রবীন্দ্রনাথের গান ছিল সঞ্জীবনী সুধা। স্বাধীন দেশেও আমরা তাকে ভুলিনি। এ জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার অনুসারীরা কবি গুরুকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফিরিয়ে আনেন। রবীন্দ্রনাথ রচিত বাংলা সঙ্গীত বেয়ে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের শীর্ষে পৌঁছে যাওয়া ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বেছে নেই আমরা। রবীন্দ্রনাথের এই প্রত্যাবর্তন আমাদের মনোজগতে দিয়েছে নতুন স্পন্দন। প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে যখনই কোন সংগ্রাম বা দ্রোহের প্রয়োজন পড়েছে তিনি, তার কবিতা বা গান আমাদের পথের দিশা হয়ে দখা দিয়েছে। শুধু দ্রোহেই বা বলি কেন? প্রেমে আনন্দ বিরহে কোথায় তিনি নেই। বিশ্বায়নের নবপ্রযুক্তি ও বাঁধভাঙা তথ্য প্লাবনে আমরা ভেবেছিলাম টিকবেন তো? আজ আমরা কি দেখছি? রবীন্দ্র সঙ্গীত ছাড়া টোয়েন্টি ফর/সেভেন অর্থাত্ সাত দিনে চব্বিশ ঘণ্টা সচল কোন মিডিয়াই আসলে টিকতে পারবে না। রীন্দ্রনাথ তারুণ্যেও আজ সমান দীপ্র। খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে বা আমার পরান যাহা চায়, সারাক্ষণ জানিয়ে দিচ্ছে কতটা গভীরে ঢুকে আছেন তিনি। গৃহবধূ কেরানী, অফিসার সেনা, সাধারণ মানুষ এমন কি আমাদের ঝগড়াটে রাজনীতিবিদদের ভেতরও সমান জনপ্রিয় এই কবির আরেক ঔজ্জ্বল্য তিনিই আমাদের প্রথম নোবেল বিজয়ী। বিশ্বে বাংলা ভাষা ও বাঙালি তখন এতটা পরিচিত ছিল না, উপনিবেশে স্বাধীনতার স্পৃহাও অঙ্কুরিত হয়নি সেভাবে। আমাদের বিশ্ব পরিচয়ের প্রাথমিক কাজটি তখনই করে দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, এখনকার নোবেল আর তখনকার নোবেলও এক বিষয় নয়, তখনকার অর্জনের পেছনে মেধা ও যোগ্যতা ছাড়া আর কিছু কাজ করতো না, সে আমলে অন্ধকার ও দুর্যোগের দেশ বা অঞ্চল নামে পরিচিত বঙ্গদেশ থেকেই নোবেল পুরস্কারের আলো বা অর্জন এনে দিয়েছিলেন তিনি, তাও সাহিত্যে। গীতাঞ্জলির সে পুরস্কার এখন শতায়ু, ১৩ নভেম্বরে একশ বছরে পা দেয়া, শতবর্ষের স্মরণীয় এই দিনটিকে আমরা কি মনে রেখেছি? কোথাও সেভাবে নন্দিত বা উঠে আসতে দেখিনি বাঙালির প্রথম নোবেল জয়ের শতবর্ষ। গোড়াতে বলছিলাম, বড় কঠিন সময় যাচ্ছে দেশের। রক্ত, অন্যায়, ন্যায়, যুদ্ধাংদেহী মনোভাবে লাবণ্য শেষ, কঠিন সময়ে রুক্ষ দেশ ও জাতির মনে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করানোর প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করনি আমরা। অথচ নোবেল জয়ের শতবর্ষ ফেল না ব্যাপার নয়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালি থাকবে ততদিন তার সংস্কৃতি থাকবে। আমাদের সংস্কৃতি আমাদের জাতির প্রাণ ভোমরাও বটে, যুদ্ধাংদেহী পরিস্থিতি থেমে গেলে সংস্কৃতিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে। তারপরও গীতাঞ্জলি আর রবীন্দ্রনাথের নোবেল শতবর্ষের দিনটি কেটে গেল নিভৃতে নীরবে। আপনি আমাদের ক্ষমা করুন রবীন্দ্রনাথ। বাংলাদেশের বাঙালি রাজনীতির ডামা ডোলে বিস্মরণের পাল্লায় পড়লেও পদ্মাপাড়েই গীতাঞ্জলি জেগে আছে, আপনি জেগে আছেন, আরো শতবর্ষ জেগে থাকবেন এটাও নিশ্চিত। সিডনী থেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন