আবেগের বানভাসির মধ্যে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নেমে শচিন টেন্ডুলকার নিজের ২০০তম এবং শেষ টেস্টে দর্শকদের নিরাশ করেননি ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাত্র ১৮২ রানে আউট হয়ে যাওয়া প্রথম ইনিংসের জবাবে স্বাগতিকদের দুই উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মাঠে এসে হাল ধরেন শচিন। তাতে মুম্বাই টেস্টের প্রথম দিনে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় দুই উইকেটে ১৫৭। অথচ দিনের শুরুতে অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি টসে জিতে ফিল্ডিং নিলে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন দর্শকরা। তবে দুই স্পিনার প্রজ্ঞান ওঝা ও রবিচন্দন অশ্বিনের নৈপুণ্যে প্রথম দিনেই শচিনের ব্যাটিং দেখতে পান দর্শকরা।
শচিনকে ঘিরে ভক্তদের সীমাহীন আবেগ আর উন্মাদনা মিলিয়ে ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে এই টেস্টে শচিনই শুধু খেলবেন, বাকিরা আছেন শুধু তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। তাই সিরিজে তৃতীয় বারের মতো ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভালো শুরুর পরও ১৮২ রানে মুখ থুবড়ে পড়া, প্রজ্ঞান ওঝার পাঁচ উইকেট শিকারকে ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে ক্রিকেটের সর্বকালের সেরাদের সম্মুখভাগে থাকা শচিনের অপরাজিত ৩৮। তার সাথে অবশ্য দিন শেষে অপরাজিত থাকেন চেতেশ্বর পূজারা (৩৪)।
মুরালি বিজয় আর শেখর ধারওয়ানের ব্যাটে দারুণ এক শুরুর পর শেন শিলিংফোর্ডের ধাক্কায় কেঁপে ওঠে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস। কলকাতা টেস্টে ভারতের একমাত্র ইনিংসে ছয় উইকেট তুলে নেয়া এই অফ স্পিনারের জোড়া আঘাতে শুরুর ১৩ ওভারেই ৭৭ রান তুলে ফেলা ভারত থমকে যায় হঠাত্ই। তাতে মাঠে উপস্থিত দর্শকদের মোটেই বিচলিত মনে হয়নি। কারণ, যার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষায় সেই শচিনের আসার সময় হলো যে!
তার আগমনিতে ড্রেসিংরুম সংলগ্ন গ্যালারির একাংশ দাঁড়িয়ে পড়লো আগে ভাগেই। এরপর দাঁড়িয়ে প্রায় স্টেডিয়ামই। বেড়ে গেল ভক্তদের চিত্কারের মাত্রাও। ওয়াংখেড়ের সিঁড়ি বেয়ে মাঠে নামলেন শচিন।
তবে তুমুল করতালি আর বিনম্র শ্রদ্ধায় মহানায়ককে বরণ করে নিতে গ্যালারির এই ব্যস্ততা, মুম্বাইর এত আয়োজন শচিনকে ছুঁয়ে গেল সামান্যই। এর আগের বহুবারের মতোই ব্যাট হাতে স্ট্রেচিং করতে করতে মাঠে ঢোকা শচিনকে দেখে আর দশটা ম্যাচের কোন পার্থক্য চোখে পড়লো না। সাধারণ আরেকটি দিনের মতোই সহজ-স্বাভাবিক আচরণে বুঝিয়ে দিলেন মানবিক আবেগের মতো বিষয়গুলোকে বরাবরের মতো এবারও একপাশে সরিয়েই রাখতে চাইছেন তিনি। যদিও শচিনকে বিদায় জানানোর সাক্ষী হয়ে অনেকটা নিশ্চিতভাবেই ক্রিকেট ইতিহাসের অংশ হতে যাওয়া ক্যারিবীয় খেলোয়াড়রা এই ব্যাটিং জিনিয়াসকে গার্ড অফ অনার জানান। নিজের দলও শচিনকে সম্মানিত করে তার নেতৃত্বে লাঞ্চের সময় মাঠ থেকে বেরিয়ে এসে।
শিলিংফোর্ডের বলেই সিরিজের প্রথম টেস্টে বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তে আউট হওয়া শচিন শেষটির প্রথম ইনিংসেও বোলার হিসেবে পান তাকেই। অপরপ্রান্তে মাত্রই ক্রিজে আসা আরেক ব্যাটসম্যান চেতেশ্বর পূজারা। কোন রান এল না প্রথম বলে। তৃতীয় বলে রানের খাতা খুললেন। দারুণ এক ড্রাইভে শিলিংফোর্ডকে সীমানা ছাড়া করে পেয়ে গেলেন প্রথম বাউন্ডারিও। এরপর সময় গড়ানোর সাথে সাথে খেললেন দারুণ আরো কিছু শট। যার মধ্যে ছিল সেই চিরপরিচিত স্ট্রেট ড্রাইভও। ৭৩ বল খেলে পাঁচটি চারের মারে শচিন দিনশেষে অপরাজিত রইলেন ৩৮ রানে। অপর প্রান্তে ৩৪ রানে অপরাজিত থাকা পূজারাও যোগ্য সঙ্গই দেন তাকে। ৩৪ ওভার শেষে যখন দিনের খেলা শেষ হলো সেসময় সফরকারিদের প্রথম ইনিংস থেকে ধোনির দল পিছিয়ে ছিল কেবল ২৫ রানে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর আগে নিজেদের ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে প্রথম উইকেট হারায়। কিয়েরন পাওয়েল, মারলন স্যামুয়েলস এবং চন্দরপলদের ব্যাটিং দৃঢতায় লাঞ্চের পর এক পর্যায়ে তিন উইকেট হারিয়ে ১৪০ রান তোলে। এরপর দুই স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন এবং ওঝার স্পিনের সামনে হঠাত্ করেই খেই হারিয়ে ফেলে ক্যারিবিয়রা। ওঝা ৪০ রানের খরচায় নেন পাঁচ উইকেট। প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরির পাশাপাশি বোলিংয়েও দারুণ নৈপুণ্য দেখানো অশ্বিন দখল করেন তিনটি উইকেট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ১৮২/১০ (পাওয়েল ৪৮, ব্রাভো ২৯, চন্দরপল ২৫, ডিউনারাইন ২১; ওঝা ৫/৪০, অশ্বিন ৩/৪৫)।
ভারত ১ম ইনিংস: ১৫৭/২ (বিজয় ৪৩, ধাওয়ান ৩৩, টেন্ডুলকার অপরাজিত ৩৮, পূজারা অপরাজিত ৩৪; শিলিংফোর্ড ২/৪৬)
