এই দুঃসাহসের উত্স কোথায়

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৮
গত শুক্রবার বরিশালের সদর উপজেলার চরকাউয়ার কালিখোলা গ্রামে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সামান্য খেলা নিয়া বিরোধের জের ধরিয়া চরআইচা গ্রামের এক যুবককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পর গতকাল সকালে ১৬টি হিন্দু পরিবারে হামলার ঘটনা ঘটে। নির্মমভাবে পোড়াইয়া দেওয়া হয় তাহাদের বসতবাড়ি। এই সময় গুজব ছড়ানো হয় এই বলিয়া যে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন একজন আহত ব্যক্তির মৃত্যু হইয়াছে। এই উভয় ঘটনাই দুঃখজনক। আর গুজবের ঘটনা উস্কানিমূলক। ইত্তেফাকের অনলাইন খবর হইতে জানা যায়, প্রথমে ক্রিকেট খেলা নিয়া নিহত যুবক পারভেজের ছোট ভাই পাভেলের সঙ্গে কালিখোলার স্থানীয় যুবক ধীমান ও পিযুসসহ কয়েকজনের দ্বন্দ্ব ছিল। তবে ঐদিন সন্নিকটস্থ একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা নিয়া আবার তাহাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে পাভেলকে পিটাইয়া আহত করা হইলে তাহার বড় ভাই এক সময় প্রতিপক্ষের সহিত সংঘাতে জড়াইয়া পড়ে। এমন সময় পারভেজকে উপর্যুপরি অস্ত্রাঘাতে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু পরিবারগুলির মধ্যে চাউল ও নগদ অর্থসহ ত্রাণ বিতরণ করিয়াছে। তিন বান্ডিল করিয়া টিন ও আরও নগদ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে। অন্যদিকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার করা হইয়াছে চারজনকে। একই সঙ্গে এ ব্যাপারে গঠন করা হইয়াছে একটি তদন্ত কমিটি। আমরা এই নিষ্ঠুরতম হত্যা ও সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের উপর বর্বরতম হামলার নিন্দা জানাই। হত্যা ও বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় অবিলম্বে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা হউক। তাহারা যত বড়ই প্রভাবশালী ব্যক্তি হউক না কেন, তাহাদের গ্রেফতার করিয়া আইনের হাতে সোপার্দ করা জরুরি। কেননা আমাদের অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায়, এই ধরনের সামান্য ঘটনা হইতেই বেশিরভাগ সময় সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি নষ্ট হয়। ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন খেলা নিয়া বিবাদের বিষয়টি একটি অতি তুচ্ছ ঘটনা। দুইপক্ষের অভিভাবকরাই তাহা মিটমাট করিতে পারিতেন। কিন্তু পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল ও সুহূদ সেই অভিভাবক সমাজ আজ কোথায়? উপরন্তু কাহারা ইহাতে ইন্ধন দিল তাহাদেরও চিহ্নিত করা দরকার। সারাদেশে যেন আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, এইজন্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বদা সতর্ক থাকিতে হইবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় যে কেহ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট করিয়া ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করিতে পারে। সমপ্রতি পাবনার সাঁথিয়ায় এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়াছে। এইখানে স্থানীয় প্রশাসনের ঘুমাইয়া থাকিবার কোন সুযোগ নাই। ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন খেলা লইয়া ছেলেদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ যাহাই ঘটিয়া থাকুক না কেন, তাহার জন্য নির্বিচারে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা মানিয়া নেওয়া যায় না। এইখানে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, একের পর এক বাড়িতে যখন আগুন দেওয়া হইতেছিল, তখন স্থানীয় প্রশাসন কোথায় ছিল? বরিশাল সদরের কাছেই ঘটিয়াছে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা। তাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে দ্রুত অকুস্থলে গিয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারিবার কি কারণ থাকিতে পারে তাহা বুঝিয়া উঠা কঠিন। এই হামলার পশ্চাতে প্রকৃতপক্ষে কাহার বা কাহাদের হাত সক্রিয় রহিয়াছে তাহা অবশ্যই খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হইলে এই ধরনের অপরাধকর্ম দেশ ও সমাজ হইতে দূর হইবে বলিয়া মনে হয় না। আমরা বরিশালের উপরোক্ত ঘটনায় প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন