“কত বড়ো আমি’ কহে নকল হীরাটি’

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৯
গিরগিটির আত্মরক্ষার কৌশলটি দেখিবার সময় চোখ বিস্ময় ঘনীভূত হইয়া যায়। প্রকৃতির সহিত মিশিয়া যাইতে এই প্রাণীটির রং বদলানোর তুলনা মিলে না। মানুষ তাহার জ্ঞান ও আত্মরক্ষার কৌশলও বহুলাংশে প্রকৃতি হইতে আহরণ করিয়া থাকে। সুতরাং এক্ষণে গিরগিটির এই যথাসময়ে আশ্রয়-স্থানের সহিত একই রংয়ে বদলে যাইবার জ্ঞানটি কিছু মানুষের জন্য পরম শিক্ষার। নিজেদের প্রয়োজনে গিরগিটি-তুল্য এই খেলা আমরা তাই হামেশাই দেখিতে পাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে। এই হঠাত্-ভোল পাল্টানোর খেলায় নৈতিকতা থাকুক অথবা না-থাকুক, ঈমান থাকুক কিংবা না থাকুক—কিছু কিছু মানুষের তাহাতে কিছু্ই যায় আসে না। তাহারা সকালে উত্তর মেরুর সৌন্দর্য বর্ণনা করিলে বৈকালে তাহার নিন্দায় মুখর হইয়া ওঠেন, কেননা দক্ষিণ মেরু তখন প্রভাববৃত্তে আসন পাতিয়াছে। তাহারা স্বয়ং ‘কত বড়’—তাহা বড় মুখ করিয়া বলেন। তাহারা স্বভাবতই এই কথাটি বিস্মৃত হইয়া থাকেন—‘‘কত বড়ো আমি’ কহে নকল হীরাটি। তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি।’ তবে বিষয়টি আরও বিবিধ দিক হইতেও ভাবিয়া দেখা যায়। যিনি সকালে এক কথা বলেন, বিকালে বলেন ভিন্ন কথা, তিনি অবশ্য বলিতেই পারেন, ‘ইহাই তো স্বাভাবিক। সকালে সূর্য পূর্ব দিকে ছিল, বৈকালেও কি আমি বলিব সূর্য পূর্ব দিকেই আছে? তাহা কি সত্যবচন হইবে?’ আর যিনি তাহার ডিপ্লোমেসি দুর্বোধ্য করিবার উদ্দেশ্যেই সকাল-বিকাল ‘উল্টো দেখুন পাল্টে গিয়েছি’-জাতীয় ডিপ্লোমেটিক কথাবার্তা বলিয়া থাকেন, তিনি যুগপত্ বুদ্ধিমান ও ধূর্ত। যদিও বুদ্ধিমান ব্যক্তি ঈমান ত্যাগ করিবেন না কখনও, কেননা বুদ্ধির নাশ ঘটিলেই ঈমানত্যাগ করিবার ধূর্তামি মগজে আসন পাতে। সুতরাং ধূর্তের আবার ঈমান কীসের? এই ধূর্তামির মাত্রা ছাড়াইয়া গেলে তিনি বা তাহারা বনেবাদড়ে ও গৃহস্থ ঘরে ছোঁকছোঁক করা একটি চারপেয়ে প্রাণীর সহিত তুল্য হইয়া ওঠেন। এই ধূর্ত ও ঈমানহীন মানুষ তখন বাহ্যত বিবিধ কিসিমের পাগলামো করিতে পাগলপারা হইয়া ওঠেন! নিজেদের বহু ছিদ্র থাকিলেও অন্যের সামান্য একটি ছিদ্রকে তাহারা প্রকাশ করেন ছিদ্র শিরোচূড়ামণি হিসাবে। তাহাদের বাগাড়ম্বরে অন্যের ছিদ্রটিতে প্রকাশ করা হয় অতল গহ্বরন্যায়—যাহার কূল নাই কিনার নাই। তাহারা তখন কবি হইয়া ওঠেন। কবি’র ন্যায় উত্তমকল্পিত উপমা দিয়া তিলকে তাল ও তালকে তিল করিয়া তোলেন নিমেষে। অথচ উপসংহারে তাহারে বোঝেন না—‘ওরে ভাই, কার নিন্দা করো তুমি। মাথা করো নত।’ কেহ হয়তো ভাবিয়া কূল পান না, ধূর্ত পথিক কি তবে পথ হারাইয়াছে? কপালকুণ্ডলার মতো কেহ কি সুধায় ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছো?’ ধূর্তরা অন্যের সহিত সম্পর্কও পাতায় অতি সাবধানে। গরজের আত্মীয়তার মধ্যেও তাহাদের চারপেয়ে প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ষোলআনা সুপ্ত থাকে। ভিক্ষার ঝুলি ও টাকার থলির আত্মীয়তার কথাও তো আমাদের শুনাইয়াছেন রবীন্দ্রনাথ এইভাবে—‘কহিল ভিক্ষার ঝুলি টাকার থলিরে, আমরা কুটুম্ব দোঁহে ভুলে গেলি কি রে? থলি বলে, কুটুম্বিতা তুমিও ভুলিতে; আমার যা আছে গেলে তোমার ঝুলিতে।’ সেই যাহা বলিয়াছিলাম, সূর্য পূর্ব হইতে পশ্চিমপাটে গেলে গরজের আত্মীয়রা তাহাদের স্বরূপ প্রকাশ করিয়া দ্বিধা করিবেন কেন? অন্যের ছোট ছিদ্রকেও অতল গহ্বর বলিয়া রাষ্ট্র করা হইবে সেই ক্ষণে। চালুনি তখন ছিদ্রান্বেষণ করিবে সূচের। যাহারা এইরূপ ধূর্তামির আশ্রয় নেয়, আখেরি নিয়তিও কি সহায় হয় তাহাদের? ইহা বুঝিতে পুনরায় দ্বারস্থ হওয়া যাইতে পারে রবীন্দ্রনাথের কাছে—‘অদৃষ্টেরে শুধালেম, চিরদিন পিছে / অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে? / সে কহিল, ফিরে দেখো। / দেখিলেম থামি, / সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি।’ অধিক মন্তব্যের আর প্রয়োজন কী?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন