মেট্রো সিটি টু মেগাসিটি

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৯
এ জগত্ পরিবর্তনশীল। যা ছিল একদিন আধুনিক, তা এখন উত্তর আধুনিকতার দিকে ধাবমান। এই উত্তর আধুনিকতাও একদিন শেষ হয়ে যাবে। তখন কী আসবে? সেই নামটির কথা ‘অতি-উত্তর আধুনিক’ অনুমান করা যেতে পারে। কালের পরিবর্তনের ঢেউ আসে পশ্চিম দিক থেকে। ইংরেজিতে যা ছিল মডার্ন, তা এগিয়ে যাচ্ছে পোস্টমডার্নের দিকে। ইংরেজিতে পরের নামটি কি হবে। তা পশ্চিমের লোকেরাই ঠিক করবে। আমাদের আলোচনা নগর বা শহর নিয়ে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শহরেও ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এখন যেগুলো ‘মেট্রো সিটি’ সেগুলোও আর ‘মেট্রো’ থাকছে না। সব দিক দিয়ে তাদের যে পরিবর্তন বা অগ্রগতি, এই মেট্রো কথাটি কী নামে যে পরিচিত হবে তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। মেট্রোর একটা মাপকাটি আছে। এই মাপকাঠির দৈর্ঘ্য সমাপ্ত হয়ে গেলে, অন্য কাঠির দরকার হবে। নগরের মাপকাঠি দিয়ে তো আর মহানগরের পরিধি মাপা সম্ভব নয়। একটা শহরকে মেট্রো সিটি হিসাবে পরিগণিত হতে হলে তার প্রথম বৈশিষ্ট্য হবে জনসংখ্যা। এখন পৃথিবীতে যেহারে লোকসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, মেট্রো সিটিগুলো আর মেট্রোতে থাকবে না। তখন তাদের বলতে হবে মেগাসিটি। প্রাচীনকাল থেকেই ক্রমশ শহর নগর আর তার পরে মহানগরের জীবনকে আপন করে নেয়া মানুষের এক সহজজাত প্রবৃত্তি। অতি প্রাচীন সভ্যতার যুগেও ছিল বিভিন্ন পর্যায়ের নগর ও শহর। কালক্রমে পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠে মহানগর বা মেট্রো সিটি। এখন এইসব মেট্রো সিটির যুগেরও অবসান ঘটতে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এটা অবশ্য সবেমাত্র শুরু। এখন আরম্ভ হতে যাচ্ছে মেগাসিটির যুগ। ২০২৫ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক মেগাসিটির আবির্ভাব ঘটবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞমহল। এমন মতামত প্রকাশ করেছে ‘ফোর্বস ’নামে জগদ্বিখ্যাত সাময়িক পত্রিকাটি। বিশ্বজুড়ে এই যে অগন্তি মেট্রোগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তার ফলাফল কি ভাল হবে? এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা কিন্তু দ্বিধাবিভক্ত। এই মহানগরীগুলো কি পরিকাঠামো ও পরিবেশগত দিক থেকে মানুষের বোঝা বহন করতে সক্ষম হবে? কিছু ক্ষেত্রে এইসব মহানগরী জনতার ভার বহনে যোগ্য বলে মনে হলেও, অন্য একাংশ এখনও প্রস্তুত নয় বর্ধিত জনসংখ্যার বোঝা বইতে। অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় যে, কিছুদিন পূর্বে একদল সমাজবিদ মন্তব্য করেছিলেন, মহানগরীসমূহের ক্রমাগত বৃদ্ধি—বর্ধিত জনগণের সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করবে। কারণ উন্নয়নশীল বিশ্বে এখন এমন এক উন্নত প্রযুক্তির সময় এসেছে, যার দ্বারা বিশ্বের যে কোনও স্থানে বাস করে ব্যবসা-বাণিজ্য করা এবং নিজের কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পৃথিবীটা এখন ছোট হয়ে গেছে। এক স্থানে বসে থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সমাজসেবা করা যেতে পারে বিশ্বব্যাপী। সর্বশেষ সমীক্ষায় প্রকাশ, আগামী ২০২৫ সালে সমস্ত পৃথিবীতে নগরসমূহের লোকসংখ্যা হবে পাঁচ বিলিয়ন। অর্থাত্ ৫০০ কোটি। ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী ২০৯০ সালে দ্বিগুণ অর্থাত্ ১০ বিলিয়ন। ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটের সঞ্চালক নেনসি কোটের মতে টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা অর্থাত্ ফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্যান্য সেবার পরিস্থিতি এখনও পর্যন্ত সব মহানগরে গড়ে ওঠেনি। আগের পদ্ধতিই চলে আসছে। যার ফলে সব দিক থেকেই মানুষের উপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। মেগাসিটিগুলো এই চাপ সামলাবে। ইতিপূর্বে নিজেদের শক্তিশালীরূপে প্রতিষ্ঠিত করা মধ্যম আকারের মহানগরগুলোতে কেবল মানুষের চাপই বাড়েনি, সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যারও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন নাগরিক সভ্যতার উপাদানগুলোর আগমন শুরু হয়ে গেছে। ফলে নগরসমূহ হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় কিন্তু জনজটে ভরা। সমীক্ষায় প্রকাশ, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকায় ২০২৫ সালের মধ্যে দশটি মেগাসিটি গড়ে উঠবে। তার প্রধান কারণ হলো এখানকার গ্রামাঞ্চলের লোকেরা সুযোগ-সুবিধার সন্ধানে শহরের দিকে ধাবমান হচ্ছেন। সমীক্ষা বলছে, এশিয়ার মেগাসিটির মধ্যে আছে ভারতবর্ষের মুম্বাই, কলকাতা ও দিল্লি, পাকিস্তানের করাচি, আর চীনের সাংহাই। লাতিন আমেরিকার সম্ভাব্য মেগাসিটির মধ্যে আছে মেক্সিকো সিটি এবং ব্রাজিলের সাওপাওলো। পরম্পরাগতভাবে ‘পাওয়ার সিটি’ অর্থাত্ অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত ক্ষমতার অধিকারীরূপে বিবেচিত নিউইয়র্ক ও টোকিও আগামী ১৭ বছর পর্যন্ত একই রকম মেগাসিটি হিসাবে থাকবে বলে মতামত প্রকাশ করেছে এই সমীক্ষা। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে মহানগরের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি— লন্ডন ও নিউইয়র্ক। ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় একুশে। মনে করার মতো যে, ৩৩টি সম্ভাব্য মেগাসিটির মাঝে ছয়টি বাদ দিয়ে বাকি সবগুলোই অবস্থিত উন্নত বিশ্বে। এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে, এইসব মেগাসিটিগুলোর একটা বড় সমস্যা হবে নাগরিকদের জন্য যথাযোগ্য সেবা প্রদান। চিন্তার কথা কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা হাতে নেননি। যাতায়াত ব্যবস্থা, আবাসগৃহ তথা দূষণজনিত সমস্যাগুলো মোকাবিলার জন্য এখন থেকেই যথাযোগ্য পরিকল্পনা হাতে নেয়া উচিত বলে মনে করে উপর্যুক্ত সমীক্ষা। করাচি (পাকিস্তান) ঃ এই সম্ভাব্য মেগাসিটিগুলোর মাঝে একমাত্র নিউইয়র্ক বাদে অন্য কোনো শহরই একুশ শতকে আরামে বসবাসের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেনি। নিউইয়র্কের জন্য যথাযোগ্য পরিকল্পনা সরকার হাতে নিলেও অন্য শহরগুলো নিজের মতো করে বিনা পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিন্তার কারণ মুম্বাইকে নিয়ে। প্রতিবছর মুম্বাইয়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ১.৮ শতাংশ হারে। অন্যান্য শহরের তুলনায় মুম্বাইতে দরিদ্র লোকের সংখ্যাও প্রচুর। মেট্রো সিটি মুম্বাই যখন মেগাসিটিতে পরিণত হবে, তখন এইসব দরিদ্র নাগরিকদের দুর্দশার অন্ত থাকবে না। তাই এখন থেকেই সুচিন্তিত পরিকল্পনা হাতে নেয়া উচিত বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।  লেখক :সাংবাদিক-কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন