[ রা জ নী তি ]

গণতন্ত্রে নির্বাচনের বিকল্প নেই

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৭
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি যে রূপ ধারণ করেছে—তা বেশ বিপজ্জনক। এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্যেও মস্ত বড় সংকট বয়ে নিয়ে আসতে পারে। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, একদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে নির্বাচন প্রতিহত করার আলামত। নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কেননা, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার গঠনের একমাত্র উপায় হচ্ছে নির্বাচন। জনগণ তাদের পছন্দের দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসায়। সরকার গঠনের এমন পদ্ধতি সাধারণ কোনো মুখের কথায় নয়, লিখিত আইন তথা সংবিধান মতোই হয়ে থাকে। প্রশ্ন হতে পারে, সেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? এই প্রশ্নে আমরা জাতীয়ভাবে দীর্ঘদিন লড়াই করেছি, নানা এক্সপেরিমেন্টও করেছি। গত কয়েক বছর ধরে অনুষ্ঠিত নানা ধরনের নির্বাচন থেকে ধারণা করা যায় যে, কারচুপির তেমন কোনো অপচেষ্টা কারোরই সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশে নেই। তাছাড়া এ দেশের মানুষ ভোট দেয়া ও ফল দেখা নিয়ে যতোটা সচেতন ও আগ্রহী তা বেশ বিস্ময়কর। পৃথিবীর অনেক দেশেই মানুষ ভোট দান নিয়ে এতোটা উত্সাহী হতে দেখা যায় না। যতোটা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এটি এখন আমাদের জন্যে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও দেখা গেছে এ দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং ব্যাপক মানুষের মধ্যে নানা ধরনের সন্দেহ, আগাম ধারণা, অনুমানভিত্তিক মতামত চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ নিয়ে এক ধরনের ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রবৃত্তি বেশ উদ্বেগজনক বিষয়। যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি সেই নির্বাচন সম্পর্কে আগাম সন্দেহ করা, এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা, আন্দোলনের নামে মারামারি, সহিংস হরতাল, পোড়াপুড়ি, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়া কতোখানি যুক্তিযুক্ত হচ্ছে তা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী অপশক্তির হাতে জনগণের জীবন ও সম্পদকে ঠেলে দেয়া নির্বাচনকে পণ্ড করা ইত্যাদিতে অংশ নেয়ার শেষ পরিণতি রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতিসহ কোনো ক্ষেত্রেই সুখকর কিছু বয়ে আনবে না। কেননা, এর মাধ্যমে দুর্বৃত্তায়িত শক্তি সর্বত্র প্রতিষ্ঠা লাভের সুযোগ পাচ্ছে। এমনিতেই আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি আধুনিক শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান বিজ্ঞান ইত্যাদিতে এখনো নির্ভরযোগ্য কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। গণতন্ত্রে আমাদের উত্তরণ এখনও নানা সমস্যায় আটকে আছে। আমরা বড়জোর নির্বাচনের ধারায় উত্তরণ ঘটানোর পর্বে আছি। তাতে নানা বাধা-বিপত্তিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। দীর্ঘদিন এই নির্বাচন ব্যবস্থাই দুর্বৃত্তায়িত শক্তির হাতে জিম্মি হয়েছিল। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে কিছু অর্জন ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছি। আরো অনেক কিছুই আমাদের করণীয় বাকি রয়ে গেছে। কোথায় গলদসমূহ তা চিহ্নিত করে সেগুলোর সংস্কারে উদ্যোগ নেয়া, প্রয়োজনে আইন, বিধি-বিধান তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন ছিল। আন্দোলনের প্রধান এজেন্ডা হওয়া দরকার আইনি বিধি-বিধান প্রণয়ন ও কার্যকর করা। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে নির্বাচনকালে কিভাবে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হয়, চলতে দিতে হয় তা নিয়ে দাবি-দাওয়া উত্থাপন করা, আলোচনা-সমালোচনা পর্যালোচনা— যা কিছু দরকার তা সমাপ্ত করা। গণতান্ত্রিক সমাজে যারা গণতন্ত্রের ধারাকে এগিয়ে নিতে চায় না, সে ধরনের ভূমিকা রাখে না তাদের অবস্থান নির্ণিত হয় গণতন্ত্র বিরোধী শিবিরে। আমাদের দেশে অবাধ গণতন্ত্রের নামে অসংখ্য দল ও শক্তি আছে যারা গণতন্ত্রের সুবিধাসমূহ শতভাগ ভোগ করছে, কিন্তু গণতন্ত্রকে দল বা দলের অনুসারীরা মোটেও ধারণ করে না, কোনো ভূমিকাও রাখে না। অধিকন্তু গণতন্ত্র বিরোধী চেতনাই তারা ধারণ করে। ফলে আমাদের দুর্বল গণতন্ত্র এমনিতেই বার বার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, তার ওপর যখন এভাবে ছুরিকাঘাত করা হয় ভেতর থেকে, তখন নানা ধরনের অপশক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে রাজনীতিসহ সকল কিছু, সে ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নির্মাণের আশা-দুরাশাতেই মিলিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মনে হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমন একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—যখন গণতন্ত্রকে সকলে যার যার সুবিধা, স্বার্থ এবং শক্তিতে অপব্যবহার করতে যা যা তাদের পক্ষে করা সম্ভব তাই করা হচ্ছে। সেভাবেই প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ফলে গণতন্ত্র বাংলাদেশে নানা অগণতান্ত্রিক শক্তির হাতে কমবেশি জিম্মি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি দেশের রাজনীতিতে ক্রমেই শক্তি অর্জনের মাধ্যমে পুষ্ট হচ্ছে, এখন নানা সংগঠন ও জোট গঠনের মাধ্যমে এতোটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, সত্যিকারের গণতন্ত্রের চর্চা ধ্যান-ধারণা ও বিকাশের উদ্যোগ সম্মুখে অগ্রসর হতেই পারছে না। একটি উদাহরণ দেয়া এ প্রসঙ্গে খুবই প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি মনে করছি। গণতন্ত্র মানে হচ্ছে জনগণের অধিকার। এটি যে কোনো মানুষ, সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর স্বাধীন অবস্থান ও অস্তিত্বের পথকে বাধা মুক্ত করার ধারণাই প্রকাশ করে। সেই অর্থে গণতন্ত্র মানে হচ্ছে সকল নাগরিকের বৈধ অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করা। এখানে কারো কোনো হস্তক্ষেপ চলে না। এক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত পরিচয় কারো জন্যে কোনো বাধা হতে পারে না। সে কারণেই বলা হচ্ছে গণতন্ত্রের মৌল চরিত্র হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, ধর্ম সম্প্রদায় বা জাতি গোষ্ঠীর পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়ার কোনো সুযোগ গণতন্ত্রে নেই। সে ক্ষেত্রে গণতন্ত্র মানলে অসাম্প্রদায়িকতাকে মানতে হবে, অনুসরণ করতে হবে, চলতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটানো চলবে না। এখন পাঠকই বিচার করুন বাংলাদেশে মুখে সব দলই গণতন্ত্রের কথা বলে, অথচ বাস্তবে অনেকেই সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে দলকেই শুধু নয়, রাষ্ট্রকেও নিয়ে যেতে সকল শক্তি নিয়োগ করে চলছে। আমাদের মতো অনুন্নত সমাজ ব্যবস্থায় দেশে গণতন্ত্রের সুযোগ নেয়ার ক্ষেত্রে সমাজের এমন অনেক গোষ্ঠী তত্পর থাকে যারা আদতে গণতন্ত্রকে ধারণ করে না। তারা বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানাতে তাদের দল ও রাজনীতিকে পরিচালিত করে। যখনই কোনো দল সেই আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজনীতি করে, নিজের শক্তিবৃদ্ধির রাজনীতি করে, গণতন্ত্রের সকল সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহার করে তখন প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তি বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে। গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে বাংলাদেশে বেশ কিছু দল উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে প্রচার-প্রচারণায় ব্যবহার করছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। বলতে দ্বিধা নেই বর্তমানে বাংলাদেশে এসব ধারার সকল শক্তি এখন খুবই কাছাকাছি অবস্থান করছে, জোট গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী অনেক দল ও গোষ্ঠী নানা প্রশ্নে ও বিভ্রান্তিতে পড়ে বিভক্ত হয়ে আছে। এ ধরনের অবস্থায় বাংলাদেশ কার্যত রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। সেখানে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে সৃষ্ট অনৈক্যের সুযোগ নিচ্ছে সেই সব গোষ্ঠী ও দল যারা বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। আদর্শের এমন লড়াইতে অনেকেই বিভ্রান্ত ও দিকভ্রান্ত। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধোত্তর জার্মানি এবং ইতালিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী মানুষকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্র ক্ষমতায় তারা গণতন্ত্রের সুবিধা নিয়েই অধিষ্ঠিত হয়েছিল অর্থাত্ নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে তারা যে ইতালি বা জার্মান রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। বাংলাদেশেও সে ধরনের চেষ্টা কম হয়নি, এখনো ক্ষান্ত হয়নি অনেকেই। তাদের অনেকেরই উগ্র ও হঠকারী মতাদর্শিক রাজনীতি ও রাষ্ট্র চিন্তার বিষয়গুলো এসব আন্দোলন, হরতাল, রাজনীতি, প্রচার-প্রচারণায় কোনো লুকানো বিষয় নয়। এক সময় উগ্র বাম রাজনীতিবিদরা সর্বহারার রাজত্ব কায়েমের জন্যে নির্বাচন, গণতন্ত্র, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছুকে অস্বীকার করেছে, এগুলোর বিরুদ্ধে মানুষ হত্যা, লুটপাট, অভ্যুত্থান, পাল্টা-অভ্যুত্থান ইত্যাদিতে তারা ক্ষুব্ধ ছিলো। আদর্শিক এসব লড়াই সমাজ বাস্তবতা থেকে কতো দূরে ছিল-তা অংশগ্রহণকারী এসব দল ও ব্যক্তি তখন উপলব্ধি করতে চায়নি, কিন্তু তাদের উগ্র আচরণ ও ভূমিকা গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, নিজেরাও এখন বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা এরমধ্যে হয়ে গেছে। তখনও বাংলাদেশ একই অবস্থা অন্যভাবে বিরাজ করছে। উগ্র ধর্মান্ধতাকে ব্যবহার করে এখন বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, সেধরনের রাজনীতিতে থেকে দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নিয়েছে—যা একসময় এ দেশে উগ্র ও হঠকারী বাম রাজনীতিতে যুক্ত তরুণরা করেছে। এমন এক বাস্তবতায় দেশের রাজনীতি এখন বিভক্ত। এই অবস্থায় বাংলাদেশের সম্মুখে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার উপায় কী? খুব গভীরভাবে ভাবা দরকার। সর্বহারার আদর্শের বিপ্লবীদের পতন ও বিলুপ্তি যতটা সহজ ছিল ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে যে বিপ্লব ঘটানোর রাজনীতি তা তার চেয়ে ভয়ঙ্কর মনে হয়। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ধারাকে বজায় রাখার জন্য প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকলকে হঠকারী রাজনীতি বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের সুস্থ ধারায় ফিরে আসতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার রাজনীতি অব্যাহত রাখতে হবে। নির্বাচনে কেউ জনগণের রায় কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করলে সকলেই মিলিতভাবে তা রুখে দেবে, প্রতিহত করবে। আমাদের বিশ্বাস তেমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে সৃষ্টি হবে না। তাহলে কেন নির্বাচন বর্জন বা প্রতিহত করার চিন্তা? এগুলোর কোনোটিই গণতন্ত্রসম্মত হবে না। গণতন্ত্রে সরকার প্রতিষ্ঠার উপায় হচ্ছে নির্বাচন, কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার নির্বাচিত বা পুনঃনির্বাচিত হতে পারে। এর অন্যথা হলে দেশে হানাহানি, সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ঘটবে, তাতে গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে। গণতন্ত্র বিপন্ন হলে বাংলাদেশ অনিশ্চিত দেশে রূপান্তরিত হলে কেউ কি বিস্মিত হবে? আমরা কি তেমন একটি পরিস্থিতিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি না? লেখক : অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন