সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক আফ্রিকার হাতির ওপর একটি গবেষণা কাজ শেষ করেছেন। তারা দক্ষিণ আফ্রিকা ও কেনিয়ায় দুটি কেন্দ্রে দুই দল হাতিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। যাদের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার হাতি তাদের বাচ্চাদের সামনে নিধন করা হয়েছিল। আর কেনিয়ার হাতি তাদের বাচ্চাদের সামনে এরকম কোন অমানবিক ঘটনা ঘটেনি। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার হাতির বাচ্চাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদেরকে নানা পরিচিত শব্দ শোনালেও তারা সঠিকভাবে সাড়া দিচ্ছে না। আনন্দ, ভয়, বিপদ এসব বিষয়ে তারা ভুলভাবে সাড়া দিচ্ছে। অথচ কেনিয়ার হাতির বাচ্চারা ভালোভাবে সাড়া দিচ্ছে। অন্যদেশ যেখানে হাতির মানসিক-সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিয়ে চিন্তা করছে সেখানে আমরা আমাদের শিশু-কিশোরদের জীবন নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা করছি না। শিশুর সামনে বাবা-মা মারা যাচ্ছে, ঝলসে যাচ্ছে কোমল শিশুর হাত পা মাথা, তারা নিজেরা বহন করছে মারাত্মক বিস্ফোরক, পরীক্ষা হবে কিনা তা নিয়ে বাচ্চারা সারারাত চিন্তা করছে। কে দায়ী, কে এসবের দায় নেবে?
এ সময় দেশের জনগণ উদ্বিগ্ন, উদ্বিগ্ন সারা পৃথিবী। দেশ কোনদিকে যাবে? যারা এতদিনে মাঝে মাঝে আশার বাণী শোনাতেন তারা এখন একদম চুপ করে বসে আছেন, হতবাক হয়ে গেছেন সরকার ও বিরোধী দলের কার্যক্রম দেখে। সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি। সরকার নানাভাবে তার কাজকর্ম করে যাচ্ছে। বিরোধী দলকে প্রস্তাব দিচ্ছে আবার তাদের গ্রেফতারও করছে। আর বিরোধী দল সপ্তাহে তিন-চারদিন করে হরতাল দিচ্ছে; বাসে আগুন জ্বলছে, মানুষ মরছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে। দিনমজুর রিকশাচালক খেতে পাচ্ছে না। মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। অথচ সবাই বলছে জনগণ তাদের পক্ষে আছে। জনগণ তাদের চায়, তাদের মতামতকে পছন্দ করে। প্রশ্ন হলো, এই জনগণ কারা? এই কি সেই জনগণ যে হাসপাতালে যাবার পথে আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। এই কি সেই জনগণ যে দুবেলা খাবার জন্য তার জীবন বাজি রেখে রিকশা বা অটো নিয়ে রাস্তায় নেমে লাশ হয়ে ফিরে আসছে ঘরে? এই কি সেই জনগণ যারা সরকার বা বিরোধী দলের বিষয়ে কথাবার্তা বলতে পর্যন্ত কুণ্ঠিত হচ্ছে? জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম যখন ব্যাহত হয়, জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো যখন দিনের পর দিন অপূর্ণ থেকে যায় তখন রাষ্ট্রযন্ত্র চলছে এমন বলা যায় না। আমরা সত্যিকার অর্থে এই দেশের সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝতে পারছি না। না সরকার না বিরোধী দল।
আমরা নিজেরাই আমাদের সব সম্ভাবনাগুলোকে নষ্ট করতে চলেছি। প্রতিবার ভোটের আগে অহেতুক যুদ্ধে নেমে পড়ছি। অথচ আমরা সবাই জানি এই উন্নয়নশীল দেশকে গড়ে তুলতে হলে এসব নষ্ট চিন্তা বাদ দিতে হবে। নষ্ট চিন্তা হলো যা আমাদের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, গণতন্ত্রকে বিপন্ন করে। গত চল্লিশ বছরে আমরা অনেক ভুল করেছি, অনেক রক্তপাত করেছি, অনেক দলাদলি হিংসা-বিদ্বেষে নেমে পড়েছি। নিজেরা যা করেছি সেটাকে সবসময় ভালো বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর আর নেমে আশার ইচ্ছে কারো হয় না। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হবার পর আমরা মনে করেছিলাম যে, আর কোনদিন আমাদের গণতন্ত্র বিপন্ন হবে না। অথচ বার বার আমরা গণতন্ত্র বিপন্ন করতে দেখছি নির্বাচিত সরকারকেই। বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন করেছিল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। ২০০৭ সালে আবার তাদের ভুলের জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ হলো দুবছরের জন্য। পরোক্ষ সামরিক শাসনও যে কত ভয়াবহ তা যারা গ্রেফতার ও নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন তারা ভালো করে জানেন। বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত হয়ে এলেও তারা আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়নি কখনো। তাদের যুক্তি আছে।
তবে সরকার ও বিরোধী দল মিলে দেশটাকে আজ যেখানে নিয়ে গেছে আর এজন্য ব্যাপক জনদুর্ভোগ নেমে এসেছে এবং সামনের দিনে যা আসবে তা স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে আমরা কোনভাবে মানতে পারি না। দেশের সাধারণ মানুষ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিংবা ভুক্তভোগী গরীব জনগণকে জিম্মি করে প্রধান দুই দল প্রতিদিন দেশকে যে অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে তা কাম্য নয়। তারা কারো পরামর্শ কখনো গ্রহণ করে না শুধু দলীয় মতামত তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র, উন্নয়ন এসব কেবল তাদের কথার কথা। দুই দলের মধ্যে কোন গণতন্ত্রের চর্চা নেই, বোধ নেই। তারা দেশের জন্য তাই সত্যিকারের গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে পারে না। এখন তো মানুষ ভাবতে শিখছে আমরা অগণতান্ত্রিক অসহিষ্ণু ও বুদ্ধিহীন জাতি। না হলে ক্ষমতা পরিবর্তনের বাস্তবতাকে আমরা মেনে নিতে পারছি না কেন? কেন পরস্পরের প্রতি আস্থার অভাব ঘটে? কেন সব উদেযাগ ব্যর্থ হয়?
স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর আমাদের প্রাপ্তি নিয়ে আমাদের ভাববার সময় এসেছে। আমাদের সাথে বা কিছু আগে পরে স্বাধীন দেশগুলো আজ কোথায় পৌঁছে গেছে। আমাদের দেশের চোখে পড়ার মতো যে উন্নয়ন তাতে সরকারের ভূমিকা খুবই নগণ্য। এদেশের পরিশ্রমী খেটে খাওয়া মানুষ এবং বেসরকারি উদ্যোগের কারণে আমাদের জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বেড়েছে। সরকারের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল সেই জায়গাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকার তার উল্টোটাও করেছে। সব সরকারের বেলায় এটা প্রযোজ্য।
এখন জনগণ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের দিকে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে তাকিয়ে আছে, নিদান কষছে, বক্তৃতার খই ফুটছে। আর দাঁড়িয়ে মার খাচ্ছে জনগণ। এই সমস্যা আমাদের সৃষ্ট, এই পাপ আমাদের। দুই প্রধান দলের যদি সত্যি কিছু করার থাকে তাহলে এক্ষুণি তা করুন। আমরা কি করতে পারি আপনাদের জন্য। কিস্সু করার নেই। আমরা জীবনানন্দের সেই বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি চরণ আপনাদের শোনাতে পারি: সকল লোকের মাঝে বসে/আমার নিজের মুদ্রাদোষে/আমি একা হয়েছি আলাদা?/আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
