‘অপমানে হতে হবে তাঁহাদের সবার সমান’

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০০
যে কোনো রিলেশনের মূল ভিত্তি হল বিশ্বাস। এটা যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন সম্পর্কের চরম অবনতি যে দেখা দিবে সেটা খুবই স্বাভাবিক। হউক সে সম্পর্ক ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিক, বন্ধুত্ব কিম্বা রাজনৈতিক। অনেক সময় অবিশ্বাস যখন চরমে পৌঁছে তখন পরিণতিতে নেমে আসে নৃশংসতাও। আমাদের দেশের রাজনীতি নির্বাচনের আগে নৃশংস রুপ ধারণ করে। সাধারণ মানুষ সেই নৃশংসতার বলির পাঠা হন। আর বিরোধীরা তা থেকে ফায়দা লুটতে চান, ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকেন। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়। সামনের নির্বাচনকে ঘিরে এবারো আমরা দেখতে পাচ্ছি অবিরাম হরতাল হচ্ছে। কোনো সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা, আবারো ৬০, আবার ৮৪ও। অপেক্ষা করছে হয়ত আরো দীর্ঘতম হরতাল— কে জানে কি হবে। কোমলমতি স্কুলগামী ছেলে-মেয়েদের পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও হরতাল বন্ধে কোনো বিবেচনা নেই। বিরোধী দলের রাজনীতিকরা হরতালকে বরাবরই গণতান্ত্রিক অধিকার বলে চালিয়ে আসছেন! তাই যদি সত্যি হয়— তাহলে যে ছেলে-মেয়েরা হরতালের শিকারে পরীক্ষা দিতে পারল না বা পরীক্ষা পেছাল, বা তাদের জীবন থেকে শিক্ষার কয়েকটি দিন কেড়ে নেওয়া হল, তাদের জন্য হরতাল কতটুকু গণতান্ত্রিক অধিকার? ইদানিং হরতালে মানবিকতা যেন একেবারেই অনুপস্থিত— আছে শুধুই বীভত্সতা। পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, বাস-ট্র্যাকে আগুন দেয়া, রেলের পাত উপড়ে ফেলা, আবার কখনো গাড়ির ভিতরে মানুষকে রেখেই আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা- এ কোন নৃশংসতার খেলা? হসপিটালের বার্ণ ইউনিটে অভাগা মানুষদের পোড়া শরীর ও বীভত্স মুখশ্রী এবং তাদের স্বজনদের আহাজারি, এসব দৃশ্য যখন আমরা দেখি টেলিভিশনের চ্যানেলগুলোতে বা কোনো না কোনোভাবে সংবাদ মাধ্যমে— মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কোন যুগে বসবাস করছি? এ কোন গণতন্ত্রের দীক্ষায় দীক্ষিত আমরা? এই বাংলাদেশই কি সোনার বাংলা- যা চেয়েছিল মানুষ আজ থেকে ৪২ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর নেত্রীত্বে? যার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ নির্বিঘ্নে শহীদ হয়েছিলো? লাখো মা ও বোনেরা তাঁদের সম্ভ্রম হারিয়েছিল? অথচ আজ যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা কতই না মামুলি— শুধু একটি নির্বাচন কি পদ্ধতিতে হবে তাকে ঘিরে? সমাধানের জন্য দরকার শুধু সদিচ্ছা, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস-আস্থা, আন্তরিকতা। কে ক্ষমতায় যাবে বা বিরোধী কাতারে থাকবে তা তো ভোটের মাধ্যমে জনগণই নির্ধারণ করে দিবে। নির্বাচন সর্বদলীয় হউক বা নির্দলীয় হউক তা নিয়ে তো দরিদ্রগোষ্ঠী লাভ-ক্ষতির কোনো অংক কষে না। তারা তো ক্ষমতাও চায় না। অংশীদারও হতে চায় না। শুধু একটু আয়ের আশায় রাস্তায় বেড়োয় পরিবারের একটু রুজি সংগ্রহের জন্য। অথচ ফিরতে হচ্ছে তাদের কাউকে লাশ হয়ে, অগ্নিদগ্ধ হয়ে হসপিটালের বার্ণ ইউনিটে- বেঁচে থাকলেও লড়তে হচ্ছে কাউকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে। যারা ক্ষমতায় যাবেন বা থাকবেন তাদের গোঁয়ারতুমির জন্য বা অসমঝোতামূলক আচরণের জন্য কেন একটি নিরীহ সাধারণ মানুষ বা একটি নিরপরাধ শিশুই বাসে অগ্নিদগ্ধ হবে অথবা পুড়িয়ে অঙ্গার হয়ে মারা যাবে? এ যেন সেই পরকালের হিসাব-নিকাশের ফলাফলে জাহান্নামের আগেই দুনিয়াতে জাহান্নামের আগুনে সাজা! কি তাদের অপরাধ? তারা রুজির সন্ধানে রাস্তায় নেমেছে এই কি তাদের অপরাধ? হায়রে সভ্যতা? এ কেমন বীভত্সতা? আর কতকাল রাজনীতিকরা সমঝোতার বুলি শোনায়ে ভুলাবেন আমাদের? কত লাশ দেখতে চান তারা? কত দগ্ধতা? কত লাশ পোড়ানোর গন্ধ? কত হরতালের বিনিময়ে একটি নির্বাচনের পদ্ধতি খুঁজে পাবেন তারা? কবি গুরুর “প্রশ্ন” কবিতার একটি চরণ যেন এখানে উদ্ধৃতি না করলেই নয়- “আমি যে দেখেছি-প্রতিকারহীন, শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে”। সরকারের প্রতি বিরোধী বিএনপি জোটের ইলেকশন রিগিং নিয়ে যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে তার যৌক্তিকতা কোথায়? গত পাঁচ বছরে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে এই সরকারের অধীনে পৌর কর্পোরেশন ও স্থানীয় পর্যায়ে, তাতে ভোট রিগিংয়ের কোনো অভিযোগ বিরোধী শিবির করেনি। অথচ সামনের জাতীয় নির্বাচনে ভোট রিগিং হতে পারে- শুধু এই রকম একটা সম্ভাব্যতাকে অজুহাতে নিয়ে হানাহানি, জাতিকে অশান্তিতে রাখা, চাপের মধ্যে রাখা, মানুষের জীবনকে বিপন্ন করা, হরতালের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে দেশকে পতিত করা- তা নৈরাজ্য ছাড়া আর কি হতে পারে? তদুপরি এই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে, আধুনিক টেকনোলজির যুগে, ২৬-২৭টি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরার চোখকে ফাঁকি দিয়ে, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের চোখগুলোকে উপেক্ষা করে, কোটি কোটি জনগোষ্ঠীর মোবাইল ফোনের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ভোট রিগিং করে পুনরায় ক্ষমতায় বসবে- সেই দিবাস্বপ্নের সম্ভাবনাই বা কততুকু যৌক্তিক? আর যদি নির্বাচনে সরকারী দল ভোট রিগিং করে জয়ী হয়, সেই সময় বিরোধী দল বিএনপি আন্দোলনে নামলে তার যৌক্তিকতা মানুষ ফেলে দিতে পারবে না। কিন্তু বর্তমানে তাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা কোথায়? এই আন্দোলন শুধু মানুষকে কষ্ট দেবার জন্য। দেশের এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি আজ দেশ-বিদেশের সব বাংলাদেশি ভাই-বোনদেরকেই ভাবিয়ে তুলেছে। যে যে দলেরই হউক না কেন, যে মতাদর্শেরই হউক না কেন, সহনশীলতার মাধ্যমে, ধরজের মাধ্যমে, জ্ঞান ও বিবেচনার মাধ্যমে একটি জটিল সমস্যার সমাধানও আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যাবে এমন প্রত্যাশা করে আজ সাধারণজনে। দেশ গণতন্ত্রের ধারা থেকে বিচ্যুত হউক অথবা অপশক্তির কোনো অপঘাতে আবার পিছিয়ে পড়ুক- এমন ভাবনা আর আমরা করতে চাই না। আমরা গণতন্ত্রের পথে অর্থনৈতিক মুক্তির আলোকে একটি সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ গড়ার অংশীদার হতে চাই। সেই ধারাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হলে দুই নেত্রীকে বিভেদ ভুলে আজ আলোচনার টেবিলে আসতেই হবে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “দুর্ভাগা দেশ” কবিতার দু’টি চরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। “হে মোর দুর্ভাগা দেশ/ যাদের করেছ অপমান/ অপমানে হতে হবে তাঁহাদের সবার সমান”। লেখক :যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত alamrowshon¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন