সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন বিল ২০১৩ পাস করা হইয়াছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী এই কমিশন সরকারের অনুমোদন ব্যতীত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করিতে পারিবে না। আগে এই ব্যাপারে কমিশনের একক ক্ষমতা ছিল। সংশোধিত আইনে নূতন করিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে ৩২/ক ধারা। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা আবশ্যিকভাবে পালন করিতে হইবে। এই বিধি অনুযায়ী উপরোক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপিত হইলে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোন আদালত সেই অভিযোগ আমলে নিতে পারিবে না। শুধু তাহাই নহে, কোন আদালতে এই মামলার বিচার হইবে তাহাও সরকার নির্ধারণ করিয়া দিবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন বিল ২০১৩ জাতীয় সংসদে উত্থাপন ও পাস হইবার পর হইতেই নানা সমালোচনা চলিতেছে। স্বভাবতই কশিমন ইহাতে অসন্তুষ্ট। কমিশনের চেয়ারম্যান ইহাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। কেহ কেহ ইহাকে বৈষম্যমূলক আইন দাবি করিয়াও উচ্চকণ্ঠ হইয়াছেন। তাহাছাড়া সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিদেশি দাতাগোষ্ঠীরাও কড়া সমালোচনা করিয়াছেন। কিন্তু আমাদের সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে সম্পর্ক তাহার বাস্তবতা অনেকেই সঠিকভাবে উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন না বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফেরেশতা বা ধুয়া তুলসি পাতা এই কথা নিশ্চয়ই কেহ বলিবেন না। তবে ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলি এখনও ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত হইতে পারে নাই। ঔপনিবেশিক আমলে সরকারি কর্মকর্তাদের ওরিয়েন্টেশানটাই এমন ছিল, যাহাতে তাহারা নিজেদের জনগণ হইতে আলাদা বিবেচনা করেন। পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা লোকপ্রশাসনের কোন কোন বইতে রাজনীতিবিদদের হইতেও তাহাদেরকে পৃথক করিয়া দেখানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বলা হয় যে, সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতিবাজ ও কনস্টিওয়েন্সি অরিয়েন্টেড রাজনৈতিক নেতাদের হাত হইতে দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। এরূপ মনোভাব ও মনোবৃত্তি বা তাহার প্রচ্ছন্ন প্রভাব আজও যে নাই তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। তাই দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থ দেখভালের দায়িত্ব তাহাদের উপর ন্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে। সুতরাং তাহাদেরকে কেন অসম্মানিত ও অপমানিত করা হইবে? বিশেষত যেই সময় রাজনীতিবিদরা কোন জাতীয় সংকটের সমাধান দিতে পারেন না, তখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চালাইয়া নেওয়া ও ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনার দায়িত্ব কি তাহাদের উপরই বর্তায় না?
যদি কোন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠে, তাহা হইলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাহাদের বিরুদ্ধে ডিপার্টমেন্টাল বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। সুতরাং অনেকে মনে করেন নূতন করিয়া আইন প্রণয়নের কোন দরকারই ছিল না। আর দুদককে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করিবার এখতিয়ার দিলেই যে সব সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবে তাহাও নহে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাথার উপর কোন তরবারি উঁচু করিয়া তুলিয়া ধরা হইলে তাহারা মনোযোগ দিয়া রাষ্ট্রীয় ও সরকারি কাজে অংশগ্রহণ করিতে পারিবেন না একথাও অস্বাভাবিক নহে। মোটকথা, তাহাদের সর্বদা সন্ত্রস্ত রাখিয়া কোন কিছু করিতে গেলে তাহাতে হিতে বিপরীত হইবার আশঙ্কা থাকিয়াই যায়।
