ইরানের উপরে নূতন করিয়া আরেক দফা অবরোধ আরোপ করিবার জন্য ভীষণ রকমের তত্পর হইয়া উঠিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টি। রিপাবলিকানদের এই তত্পরতা, ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত করাইবার পথে আন্তর্জাতিক যে উদ্যোগ চলিতেছে তাহা নস্যাত্ করিয়া দিতে পারে বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন মার্কিন সেক্রেটারি অফ স্টেট জন কেরি। মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের অধিকারী রিপাবলিকানদের ভাষ্যমতে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি লইয়া আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উদ্যোগ অত্যন্ত ঢিমে তেতালা গতিতে চলিতেছে যাহা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। রিপাবলিকানরা ইরানের বিরুদ্ধে নূতন করিয়া অবরোধ আরোপ না করাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান মিত্র ইসরায়েল ও সৌদি আরবসহ গোটা সুন্নি দুনিয়ার স্বার্থ বিরোধী বলিয়াও যুক্তি দেখাইতেছে। উল্লেখ্য, ইরান তাহার পরমাণু কর্মসূচিকে বেসামরিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করিলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এই কর্মসূচির পিছনে বোমা বানাইবার বাসনা সুপ্ত রহিয়াছে বলিয়া মনে করিতেছে শুরু হইতে। ইসরায়েল, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলি দেশও একই মনোভাব ব্যক্ত করিয়া আসিতেছে।
রাশিয়া, ফ্রান্স, চীনের মত বৃহত্ শক্তিগুলি ইরান বিষয়ক সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা বলিতেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও এই রাষ্ট্রগুলি মিলিয়া গত সপ্তাহে ইরানের নিকট একটি প্রস্তাবও উত্থাপন করিয়াছে। কেরি মনে করিতেছেন যে, এমন একটি পরিস্থিতিতে রিপাবলিকানরা যেই ধরনের ব্যতিব্যস্ততা দেখাইতে শুরু করিয়াছে তাহা অন্য বৃহত্ শক্তিগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে বিরক্ত করিয়া তুলিতে পারে। রিপাবলিকানদের এহেন তত্পরতা একটু একটু করিয়া আলোচনার পথে আগাইতে থাকা ইরানকেও নূতন করিয়া দোদুল্যমানতার মধ্যে ফেলিয়া দিতে পারে বলিয়া মনে করিতেছেন কেরি। স্মরণ করা যাইতে পারে যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদেনিজাদের আমলে ইরানের সহিত বিশেষ করিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকিয়াছিল। কিন্তু কিছুদিন পূর্বে প্রেসিডেন্ট পদে মধ্যপন্থী হাসান রুহানির আগমনের পর হইতেই পরমাণু কর্মসূচি প্রসঙ্গে ইরানের বক্তব্যে বড় লক্ষণীয় পরিবর্তন দৃষ্ট হইতেছে। রুহানি একাধিকবার এই মর্মে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন যে, ইরান কোনদিনই পরমাণু বোমা বানাইবার পথে হাঁটিবে না।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, দীর্ঘদিন ধরিয়া অবরোধের মধ্যে থাকা ইরানের সামপ্রতিক পরিবর্তনকে কাজে লাগাইতে চাহিতেছে বারাক ওবামার প্রশাসন। এইক্ষেত্রে তাহারা নূতন করিয়া কথার যুদ্ধ সূচনাতে আগ্রহী নহে। কিন্তু রিপাবলিকানরা সম্ভবত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে বেকায়দায় ফেলিবার লক্ষ্য হইতেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি লইয়া মাঠ গরম করিতে চাহিতেছে। ইরানের ব্যাপারে গড়-মার্কিনীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরিয়াই কারণে-অকারণে আতঙ্ক সৃষ্টি করিবার একটা প্রবণতা চালু আছে মূলধারার মিডিয়া ও রাজনীতিতে। এই আতঙ্ককে কাজে লাগাইয়া নানা সময়ে বিশেষ করিয়া রিপাবলিকানরা ভালো ফায়দাই তুলিয়া নিয়াছে। এইবারও দেখা যাইতেছে যে, ইরান অধুনা যত নমনীয় মনোভাব দেখাক না কেন, রিপাবলিকানরা দেশটির ব্যাপারে যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রদর্শনকেই লাভজনক জ্ঞান করিতেছে। উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভসে ইরানের উপরে নূতন করিয়া অবরোধ আরোপের প্রস্তাবও পাস করিয়া লইয়াছে রিপাবলিকানরা কিন্তু ওবামা প্রশাসনের অনিচ্ছার কারণে তাহাদের লক্ষ্য পূরণ হইতেছে না। নূতন করিয়া রিপাবলিকানরা যে তত্পরতা শুরু করিয়াছে তাহাতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে কংগ্রেসে দুই দলের লড়াই শুরু হইয়া যাইবে। শেষাবধি এই লড়াইয়ের ফল ঠিক কী হইবে তাহা এখন অনুমান করা সম্ভব নহে। কিন্তু ইরান সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের যে উদ্যোগটি শুরু হইয়াছে তাহা রিপাবলিকানদের তত্পরতায় নিশ্চিতভাবেই বেশ খানিকটা বিঘ্নিত হইল।
