গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অন্যতম একটি অপরিহার্য অঙ্গ হলো শাসন কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন। বিশেষত জাতীয় নির্বাচন। আমাদের দেশে সেই জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ। শুরু হয়ে যায় ছল-চাতুরি, প্রতারণা, কূটকৌশল। চলতে থাকে হানাহানি, খুনাখুনির তাণ্ডব, লাশ, অগ্নিদগ্ধ মানুষ, সহায়-সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞ, স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অসহনীয় বিড়ম্বনা-যন্ত্রণা, চরম অচলাবস্থা-অনিশ্চয়তা। পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচনের মানে হয়ে ওঠে পাঁচ বছর পরপর কয়েক মাস ধরে ক্রমাগত বাড়তে থাকা রাজনৈতিক সন্ত্রাস। আমাদের দেশে এটি এখন এমন একটি ‘মৌসুমী’ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে যে, সে জন্য কোন আবহাওয়া পূর্বাভাসের মতো পূর্বাভাসেরও প্রয়োজন হয় না।
গণতন্ত্রে কিন্তু এমন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তবু এমনটিই হয়ে চলেছে বরাবর। কেন হচ্ছে এমনটি? গভীরে গিয়ে এর প্রকৃত কারণ ও উেসর সূত্র অনুসন্ধান করতে হবে। উপরভাসা বাহ্যিক ঘটনাবলী থেকে তার প্রকৃত কারণের সন্ধান পাওয়া যাবে না। নির্বাচনকালের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের এই ‘মৌসুমী’ উল্লম্ফনের পেছনে তাত্ক্ষণিক ও দৃশ্যমান কিছু কারণ ও উপলক্ষ থাকে। কিন্তু তার প্রকৃত কারণ ও উত্স তেমন দৃশ্যমান হয় না। দ্বন্দ্বের তাত্ক্ষণিক উপলক্ষ দ্বারা তার প্রকৃত কারণ ও উত্স ঢাকা পড়ে যায়। অথচ মূল কারণ অনুধাবন না করতে পারলে তা দূর করার প্রয়াসে মানুষের সংগ্রামকে সংগঠিত করা সম্ভব হয় না।
নির্দিষ্ট সময়ান্তে, জনগণের ভোটের মাধ্যমে, দেশের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ‘জাতীয় সংসদ’ গঠন করা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতানুসারে সরকার প্রতিষ্ঠা করাই হলো ‘জাতীয় নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের প্রকৃত উদ্দেশ্য। নির্বাচনকে কোনোভাবেই শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে গণ্য করা যায় না। জনগণের ভোট প্রয়োগের মাধ্যমেই জনমতের নিরীক্ষা করা হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করাই হলো আসল কথা। তাই, এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় জনগণ তথা ভোটাররাই হলো কেন্দ্রীয় ও নির্ধারক উপাদান। কিন্তু জনগণকে কি পূর্ণভাবে সে ভূমিকা পালন করতে দেয়া হয়? না, দেয়া হয় না। নানাভাবে সে ভূমিকা খর্ব করা হয়। এই খর্ব করাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বই বুর্জোয়া দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনকালীন সংঘাতের অন্যতম উত্স।
নির্বাচন অর্থপূর্ণ হতে পারে তখনই, যখন তাতে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে। একটি শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে তা কখনোই কোনোভাবে পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে তার সম্ভাব্য সর্বাধিক নিশ্চয়তা, কিংবা কম করে বললে তার ন্যূনতম মাত্রার নিশ্চয়তা অপরিহার্য। এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে, প্রতিটি নাগরিক ‘নির্বাচিত হওয়ার’ ও ‘নির্বাচিত করার’ ক্ষেত্রে যেন সমান সুযোগের অধিকারী হয়। বর্তমানে সেটিও সঠিকভাবে হচ্ছে না।
যেমন ধরা যাক, প্রার্থী হওয়ার জন্য জামানতের অর্থের পরিমাণের বিষয়টি। কারো ক্ষেত্রে যদি তা তার এক সেকেন্ডের আয়ের সমান হয় (হাজার কোটি টাকার মালিক), আর অধিকাংশের জন্য যদি তা হয় তার কয়েক মাসের আয়ের সমান (একজন গার্মেন্ট শ্রমিক)— তাহলে কি তা সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সক্ষম হতে পারে? এক্ষেত্রে কি জামানতের অর্থের পরিমাণ প্রার্থীর ১ মাসের গড় আয়ের সমান করার বিধান করা যায় না? তাতে তো নিশ্চিতভাবেই সুযোগের অসমতা অনেকটা নিরসন হতো।
কিংবা যদি ধরি সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়ের সীমার প্রশ্নটি। এটি এবার ১৫ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ লক্ষ টাকা করা হয়েছে (অবশ্য অধিকাংশ ‘ধনবান’ প্রার্থীরা এর ১০/২০ গুণ টাকা খরচ করে থাকে। দলীয় নমিনেশন কেনার জন্য উত্সব করতেই তো কয়েক লক্ষ টাকা এবং আগাম রঙিন পোস্টার, হোর্ডিং, ব্যানারের পেছনে আরো লক্ষ লক্ষ টাকা তারা তো ইতোমধ্যেই খরচ করে ফেলেছে)। এক সাথে ২৫ লক্ষ টাকা তো ৯৫% ভোটার কখনো চোখেই দেখেনি। কোটি টাকার বাজেট নিয়ে নামা প্রতিযোগীর সাথে সে কিভাবে সমানে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে? এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যদি সব প্রার্থীর পোস্টার, লিফলেট, পরিচিতি, ইশতেহার ইত্যাদি ছাপিয়ে দিয়ে এবং সভা-সমাবেশের ব্যবস্থা করে এবং অন্য কোন ব্যয় নির্দিষ্ট বা সীমিত করার ব্যবস্থা করে তাহলে কি এক্ষেত্রে অনেকটা পরিমাণে সমতা আনা যেতো না?
আমির হোক কিংবা ফকির হোক, হিন্দু হোক কিংবা মুসলমান হোক— তথা অর্থ-বিত্ত, ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক-আদর্শিক চিন্তাধারা (স্বাধীনতা বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী ইত্যাদি ছাড়া) নির্বিশেষে ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ নিশ্চিত করাটি হলো অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন তথা জনমতের স্বাধীন ও পূর্ণ প্রতিফলন নিশ্চিত করার জন্য অত্যাবশ্যক। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের স্বাধীন তত্পরতা (জামায়াত-শিবির ইত্যাদি বাদে। কারণ, তারা হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ দলিলের শর্তানুসারে সে অধিকার হস্তচ্যুত করে বেআইনী হয়ে গেছে) একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। সে ক্ষেত্রে ছোট-বড় সব দলের জন্য সুযোগের সমতা বিধানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হলো- (১) টাকার খেলা, (২) পেশী শক্তির দাপট, (৩) প্রশাসনিক কারসাজি, (৪) ধর্মানুভূতিকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ভোট আদায়। হোণ্ডা-গুণ্ডার নির্বাচনকে ‘জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর নির্বাচন’ বলে চিত্রায়িত করা যায় না। তাকে নির্বাচনের নামে প্রহসন ও কোটিপতিদের প্রতিযোগিতা বলে বিবেচনা করাই যথার্থ। অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য এই অবস্থা দূর করা প্রয়োজন। তাছাড়া, ‘ভোট অনুপাতে আসন সংখ্যা’ ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা প্রয়োজন।
এসব কারণে অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়টি এখনো বহুলাংশে একটি প্রহসনমূলক প্রক্রিয়া হয়ে রয়েছে। তবে, ‘নির্বাচন একেবারে না হওয়ার চেয়ে, একটি খারাপ নির্বাচন হওয়াটাও ভাল’। কারণ নির্বাচন একেবারে না হওয়ার অর্থ সামরিক শাসন, ওয়ান-ইলেভেন মার্কা শাসন বা স্বৈরশাসন। সেই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রমিক-কৃষকসহ জনগণ। তাদের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেয়া হয়। ফলে তাদের রুটি-রুজির সংগ্রাম আরো বড় বাধার মুখে পড়ে। তাই, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থই হলো সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু এ ক্ষেত্রেও দু’টি কথা থেকে যায়। প্রথমত যদি দেশে বিপ্লবের পরিস্থিতি বা বিপ্লবী পন্থায় ক্ষমতা দখলের সুযোগ থাকে সেক্ষেত্রে ‘খারাপ নির্বাচন’ তো দূরের কথা তুলনামূলক ‘ভালো নির্বাচনের’ বদলে বিপ্লবের পথ বেছে নেয়াটাই শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত দেশের সব রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সবাই যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাহলে তা অনেকটা ‘ওয়াক-ওভার’ মার্কা প্রতিযোগিতার মতো বিষয়ে পরিণত হয়। এ ধরনের একতরফা ‘ওয়াক-ওভার’ মার্কা ভোটের আনুষ্ঠানিকতাকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করা যায় না। সে ধরনের ‘নির্বাচন’ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে তা অর্থপূর্ণ হয় না। সেরূপ ‘নির্বাচনের’ ফলাফল স্থায়িত্বও পায় না। সামরিক শাসনের দুই পর্বে অনুষ্ঠিত এ ধরনের ‘নির্বাচন’, বিশেষত ১৯৮৬-এর ‘নির্বাচন’, কিংবা পরবর্তীতে ১৯৯৬-এর ‘নির্বাচন’- কোনটার ফলাফলই স্থায়িত্ব লাভ করতে সক্ষম হয়নি। আমাদের দেশে যদি সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সে নির্বাচনও জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হবে না। সে কারণে তা অর্থপূর্ণও হবে না।
সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অনিশ্চয়তা এখনো দূর হয়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠানের শেষ সময় সংবিধানে নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। সে সময় সংকুচিত হয়ে আসছে। আর মাত্র ৬৮ দিন বাকি আছে। কিন্তু আজও উল্লিখিত অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। নির্বাচনকালীন সরকার কি ধরনের হবে তা নিয়ে এখনো বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পরবিরোধী বিতর্কে লিপ্ত রয়েছে। এ বিষয়ে ফয়সালা না হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না এবং সেরূপ নির্বাচন সে হতেও দিবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।
হরতালের নামে বিএনপি-জামায়াত সহিংস সন্ত্রাস পরিচালনা করছে। আগেকার দিনে হরতালে দু’চারটা মৃত্যুর ঘটনা যে ঘটতো না তা নয়। সে সব মৃত্যুর প্রায় সবই ঘটতো পুলিশের গুলিতে। এখন যে ডজন-ডজন মৃত্যু ঘটছে তার সিংহভাগই ঘটছে হারতালকারীদের সন্ত্রাসী আক্রমণে। ফলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আতঙ্কজনক অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে বিএনপি-জামায়াতের আসল উদ্দেশ্য তাদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠা নয় বরং সেই ইস্যুর সুযোগে অন্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে দেশে একটি ‘পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করা।
সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে পরিস্থিতিকে অগ্রসর হতে বাধা দিচ্ছে প্রধানত তিনটি শক্তি। তাদের মধ্যে একটি হলো- জামায়াতে ইসলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাজা কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়াকে বিনষ্ট করতে তারা মরিয়া। তারা এদেশে আবার পাকিস্তানী কায়দার সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়। সে উদ্দেশ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা ধ্বংস করা তাদের গেইম প্ল্যানের অংশ। বিএনপিকে অনেকটাই হাত করে নিয়ে এবং আওয়ামী লীগের সাথে নানা সময় নানা ‘কৌশলগত সমঝোতা’ করে তারা তাদের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয় শক্তিটি হলো- ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ শক্তি। সামরিক নিয়ন্ত্রণে দেশ শাসন করতে হলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ছিন্ন করার অজুহাত তৈরি করা প্রয়োজন। সে জন্য এই শক্তি ‘সমঝোতার’ প্রয়াস বিনষ্ট করে দেশকে অচলাবস্থায় নিক্ষিপ্ত রাখতে চায়। তৃতীয় স্বার্থান্বেষী মহলটি হলো- তারা, যারা বিজয়ের জন্য ‘ওয়াক-ওভার’ মার্কা একতরফা নির্বাচন ছাড়া স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার উপর একেবারেই নির্ভর করতে পারছে না। এসব গোলমালে পরিস্থিতির মাঝে আবার রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট অপরাপর বিদেশি শক্তি ও রাষ্ট্র।
আওয়ামী লীগের কতগুলো পদক্ষেপ এরূপ পরিস্থিতির দিকে যাওয়ার পথ করে দিয়েছে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর ইস্যুর সাথে (রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ইত্যাদি বিষয় সংক্রান্ত) ত্রয়োদশ সংশোধনীর ইস্যু (তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত) অপ্রয়োজনে যুক্ত করে সে সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছে। এর দ্বারা তারা বিএনপির হাতে এ্যাজিটেশনের একটি ইস্যু তুলে দিয়েছে।
বলা হচ্ছে যে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ফাঁক দিয়ে ওয়ান-ইলেভেন ধরনের হস্তক্ষেপ আবার ঘটতে পারে, তাই তা ঠেকানোর জন্য পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু এটি করার ফলে সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের বদলে একতরফা নির্বাচনের অগ্রহণযোগ্যতা যে অচলাবস্থা ও অরাজকতায় দেশকে নিমজ্জিত করতে পারে, তার ফলে যে ওয়ান-ইলেভেনের চেয়ে আরো বড় ধরনের ‘হস্তক্ষেপের’ সুযোগ উন্মোচিত হবে না সে নিশ্চয়তা কে দিতে পারবে? দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করার অভিলাষে এভাবে একতরফা নির্বাচনের ফাঁদে পড়ে গণতন্ত্রের ভাগ্য নিয়ে জুয়া খেলা যে কতো বিপজ্জনক তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কারণ থাকতে পারে কি?
আওয়ামী লীগের এরূপ গেইম প্ল্যানের অংশ হলো বিএনপিকে যে কোনোভাবে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের একটি বড় কারণ আসলে ছিল বিএনপি-র জন্য নির্বাচন বয়কটের ফাঁদ পাতা। জামায়াত ও উগ্রপন্থীদের উস্কানিতে বিএনপি সেই ফাঁদে পা দিয়ে নিজে যেমন আটকে গেছে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেও বিপজ্জনক ফাঁদে আটকে ফেলেছে।
আওয়ামী লীগের পাতা ফাঁদে আটকা পড়েছে বিএনপি। আর আওয়ামী লীগ আটকা পড়েছে শক্তিশালী দেশি-বিদেশি শক্তির পাতা আরো বড় ফাঁদে। এক ফাঁদের উপরে আরেক ‘মেগা ফাঁদ’। দেশকে ফাঁদের ফাঁদে আটকে ফেলার খেলা চলছে। চোরের উপর বাটপারি। পরিণামে স্বদেশ ও তার নিরপরাধ জনগণ পতিত হচ্ছে মহাদুর্যোগে।
লুটপাটের অর্থনেতিক দর্শন অনুসরণকারী দু’টি বুর্জোয়া দল স্রেফ ক্ষমতার জন্য যে দ্বন্দ্বে আজ লিপ্ত তা দেশের ভবিষ্যতকে বিপদসংকুল করে তুলেছে। প্রকাশ্যে যে ইস্যুতেই তারা বিতর্ক পরিচালনা করুক না কেন, তাদের মাঝে আসল দ্বন্দ্ব হলো লুটপাটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। তাই জাতীয় নির্বাচনের সময় এলেই শুরু হয়ে যায় দু’পক্ষের মধ্যে ‘মৌসুমী’ নির্বাচনী হানাহানি-খুনাখুনি। সর্বনাশ হয় দেশ ও দেশবাসীর। তাই এই ‘মৌসুমী’ সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে এই দুই দলকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা মেরুকরণ অথবা তার কোন গৃহপালিত ‘তৃতীয়’ নব সংস্করণের বাইরে। বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্পের মাঝে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি
E-mail : [email protected]
