গতকাল ১৭ নভেম্বর ছিল মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ভারতীয় উপমহাদেশের নিপীড়িত জনগণের এই মহান নেতা ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু’ বলে চির বিদায় গ্রহণ করেন।
মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন তিনটি কালপর্বে বিভক্ত— বৃটিশভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। ১৯০৯ সালে তিনি বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯১৮ সালে তিনি প্রথমবার হজ্বব্রত পালন করেন। ১৯১৯ সালে মওলানা মোহাম্মদ আলীর পরামর্শক্রমে তিনি কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং অংশগ্রহণ করেন খেলাফত আন্দোলনে। ১৯২০ সালের মে মাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে ময়মনসিংহে আসেন এবং মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক সচেতনতা, সততা, মেধা ও কর্মতত্পরতায় অত্যন্ত প্রীত হন।
১৯২২ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে মওলানা ভাসানী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেখানেই নেতাজী সুভাষ বসুর সাথে তার পরিচয় হয়। ওই আন্দোলনে মওলানা ভাসানী গ্রেফতার হন। দেশবন্ধুর নেতৃত্বে স্বরাজ দল প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি একই সাথে কংগ্রেস ও স্বরাজ দলের পক্ষে কাজ করেন। ১৯২৪ সালে মওলানা ভাসানী সিরাজগঞ্জে কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় তিনি পূর্ববঙ্গ ও আসামে জমিদার, মহাজন ও বৃটিশ বিরোধী বিশাল কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯২৫ সালে তিনি বগুড়া জেলার পাঁচবিবির অদূরে বীরনগর গ্রামের জোতদার শামসুদ্দিন চৌধুরীর কন্যা আলেমা চৌধুরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯২৬ সালে কৃষক প্রজা আন্দোলনের আয়োজন করেন। তাঁর আসাম আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল- হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, স্থানীয়, অস্থানীয়, আসামীয়, পূর্ববাংলা থেকে আগত বাঙ্গালিসহ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান অধিকার দিতে হবে। তিনি ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগে যোগদান করেন। ১৯৪১ সালের ৩০-৩১ জানুয়ারি হবিগঞ্জে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্মেলনে আসামকে পূর্ব বাংলার সাথে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তিনি ১৯৪৪ সালে বড়পেটায় আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৪৬ সালের ২৬ জুন মঙ্গলদইতে ২ লক্ষ কৃষকের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ করেন। তার দাবি ছিল লাইন প্রথা, বাঙ্গাল খেদাও বন্ধ করতে হবে আর সর্বশেষে আসামকে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ১৯৪৭ সালের ১০ মার্চ আসাম দিবসে তেজপুর জনসভা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। জনগণের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকার ১৯৪৭ সালের ২১ জুন গৌহাটি জেল থেকে তাকে মুক্তি দেন।
১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে সন্তোসে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য এলেন। তিনি পাকিস্তানে এসে বুঝতে পারলেন মুসলিম লীগ সরকার গণবিরোধী এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে না। মুসলিম লীগ পুরোপুরি একটি শোষকের দল। তিনি ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে যোগ দিলেন। মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগের মোহ ত্যাগ করে ১৯৪৯ সালে ২৩-২৪ জুন ঢাকার রোজগার্ডেনে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। নবগঠিত পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন টাঙ্গাইলের সামসুল হক। ১৯৪৯ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি খাদ্যের দাবিতে মিছিল করেন এবং গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা এ, কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সমন্বয়ে যুক্তফন্ট গঠন করেন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ২১ দফা দাবির ভিত্তিতে মুসলিগ লীগকে পরাজিত করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
১৯৫৫ সালের ১৭ জুন এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানকে আসসালামু আলাইকুম বলতে বাধ্য হবে। ১৯৫৫ সালে ২১-২৩ অক্টোবর রূপমহল সিনেমা হলে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে এক প্রস্তাবে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে দলের নাম আওয়ামী লীগ রাখা হয়। এ ভাবেই আওয়ামী লীগকে একটি অসামপ্রদায়িক দল হিসেবে রূপান্তরিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব মওলানা ভাসানী পালন করেন। ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পুনরায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে আসাসালামু আলাইকুম বলেন। অর্থাত্ অদূর ভবিষ্যতে পূর্ববাংলার স্বাধীনতার ইঙ্গিত দেন যার ফসল বর্তমানের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
তিনি ১৯৬৮-৬৯ সালের স্বৈরচার আইয়ুব বিরোধী ছাত্র গণ-আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯৭১-এ মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, কৃষক সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশন, বামপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি, বাম ছাত্র সংগঠন, মহিলা সংগঠনগুলো এবং বিভিন্ন সামজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সমন্বয়ে মওলানা ভাসানী একটি জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গঠন করেন। তিনি হন ফ্রন্টের সভাপতি। এই জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের লক্ষ্য ছিল স্বাধীন গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা গঠন করা। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রবাশী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ-এর নেতৃত্ব দেন। এটাই তার শেষ সংগ্রামী প্রতিবাদ। আজীবন সংগ্রামী মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন ও থাকবেন।
লেখক :আইনজীবী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
