কাল নিরবধি, নিরবধি সময় এবং নদীর স্রোত। কারো জন্যে অপেক্ষমাণ নয়। সময়ের দোলাচলের ভেতরেই মানব জাতির উত্থান-পতন। প্রাচীন গ্রীস দেশের তথা ইউরোপের শিল্প ও সাহিত্য সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে। সেই শিক্ষা-দীক্ষার যে আলোক বর্তিকা ছড়িয়ে পড়ে তারই ধারাবাহিকতায় “আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’। সেই আঁধারের যাত্রীদের একজন আলো হাতে এসেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের প্রিয় শিক্ষক, কবি, নাট্যকার জিয়া হায়দার।
জিয়া স্যার জন্মেছিলেন পাবনা শহরের উপকণ্ঠে দোহারপাড়া গ্রামে ১৯৩৬ সালের ১৮ নভেম্বর তারিখে। পিতা শেখ মোহাম্মদ হাকিম উদ্দিন ও মাতা রহিমা খাতুনের প্রথম পুত্র সন্তান। সেই জিয়া স্যারকে দেখতে পেলাম ১৯৭৪ সালে, আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। ইতিপূর্বে পরিচিত হয়েছিলাম তাঁর কবিতা ও নাটকের সঙ্গে! মনে পড়ে তত্কালীন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত একটি নাটকের কথা, তিনি যে নাটকটি রচনা করেছিলেন, নাটকটির নাম, শুভ্রা সুন্দর আনন্দ কল্যাণী। তত্কালীন সময়ে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলো নাটকটিকে নিয়ে। ১৯৭০ সালে স্যার যোগ দিয়েছিলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে, সেই সময়ে উজ্জ্বলতম একদল অধ্যাপক ছিলেন বিভিন্ন বিভাগে। প্রফেসর আনিসুজ্জামান, ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল, ড. অনুপম সেন, এবং চারুকলায় ছিলেন অধ্যাপক দেবদাস চক্রবর্তী। রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর -সহ অনেক গুণী অধ্যাপক। প্রফেসর আবুল ফজল ছিলেন আমাদের ভি.সি.।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১২/১৪ মাইল দূরে পাহাড়ঘেরা সবুজের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারদেরকে যেতে হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে, ছাত্র ছাত্রীরা তথা আমরা যেতাম ট্রেনে। ট্রেনেই চলতো পড়ালেখার কথোপকথন, মাঝেমধ্যে স্যারদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা। একদিন হঠাত্ শুনতে পেলাম, স্যারদের পরিবারের সকল ভাইয়েরা শিল্পকলা সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এবং আরো জানতে পারলাম— জিয়া স্যারই প্রথম পূর্ব পাকিস্তানি, যিনি ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯৬৬-৬৮ সালে মার্কিন সরকারের বৃত্তি নিয়ে নাট্যকলায় লেখাপড়া করেছেন।
পরবর্তী সময়ে বিশেষত দেশ স্বাধীন হবার পরে একাধিকবার তিনি বিদেশে গিয়েছেন, বৃটেন, জার্মান, আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশে, নাট্যকলার উপর শিক্ষা গ্রহণ করতে। দেশে ফিরে ক্লাসে গিয়ে তিনি নাট্যকলার ছেলেমেয়েদের তাঁর অভিজ্ঞতা এবং নাটকের ধারা বোঝাতেন আমাদের। উপরন্তু অ্যাবসার্ড ধর্মী নাটক। বলা যেতে পারে শুভ্রা সুন্দর আনন্দ কল্যাণী সম্পূর্ণ এ্যাবসার্ড ধর্মী নাটক। জিয়া স্যারের শুভ্রা সুন্দর তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং আজকের বাংলাদেশের নাট্য জগতের নতুন আঙ্গিকের তিনি অন্যতম পুরোধা। নাট্যকর্মে এমন প্রখরভাবে এ্যাবসার্ড নাটক রচিত হয়নি ইতিপূর্বে। জিয়া স্যার তাঁর একাধিক নাটকের রচনাকারি হলেও নাট্যকলার ছাত্র-ছাত্রীরা এক বাক্যে মেনে নেবেন শুভ্রা সুন্দর কল্যাণী আনন্দ একটি অ্যাবসার্ড ধর্মী নাটক এবং একটি মনোরম স্থানে যাওয়ার অভিযান। তার ‘এলেবেলে’ একটি সামাজিক প্রহসন ও ব্যঙ্গরসের নাটক। তিনি সেখানেও উজ্জ্বল। তিনি অনুবাদ করেছিলেন ‘ডক্টর ফস্টাস’ এ্যান্টিগোনে এবং কয়েকটি আধুনিক ইউরোপীয় নাটক।
জিয়া স্যার ছিলেন, চট্টগ্রাম এবং ঢাকা বেতারের নাট্য নির্দেশক এবং বিটিভিতে তাঁরই নির্দেশনায় ‘সফোক্লিফিসের’ একটি নাটক ‘ইডিপাস’ প্রচারিত হয়েছিলো। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-এর তিনিই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৬৮। চট্টগ্রামের ‘বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব থিয়েটার আর্টস’ (বিটা) চট্টগ্রাম। পরিচালক, ইউনিভার্সিটি থিয়েটার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁরই অবদান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ‘থিয়েটারের কথা’ এই শিরোনামে পাঁচ খণ্ড নাটক বিষয়ক গ্রন্থের জনক। থিয়েটারের কথা পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় রবীন্দ্র ভারতী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটারের কথা পাঠ্য। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ এবং নাট্যকলা নিয়ে ৩১টি গ্রন্থের লেখক। দুঃখের বিষয় দুটি, তাঁর হাতে গড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ অনেক আগেই মারা গিয়েছে। তিনি নিজে গিয়েছেন না ফেরার দেশে- ২/৯/০৮ তারিখে। স্যারকে এখনো স্মরণ করি। আজ ১৮ নভেম্বর তাঁর শুভ জন্মদিন।
লেখক:প্রাক্তন ছাত্রী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
