বাংলাদেশের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে চলছে নানা সমীকরণ। অবশেষে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ মহাজোট ছেড়ে দিয়েছেন গতকাল এবং তিন দিন আগে ছাড়ার ঘোষণা দেয়ার সময় তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে অত্যাচারী ও দুর্নীতিবাজ সরকার নামে অভিহিত করেছেন। একজন স্বৈরাচারী শাসকের একজন নির্বাচিত সরকারকে এরকম অভিধা দেবার কতটা অধিকার রয়েছে—বিষয়টি প্রশ্ন সাপেক্ষ।
এরশাদ বলেছেন, তিনি নির্বাচনে যাবেন এবং নির্বাচনে না গেলে লোকে তাকে বেঈমান বলবে। আর তিনি যদি নির্বাচনে না যান, তবে দেশের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সাবেক প্রেসিডেন্ট সরকার পরিবর্তনের তিনটি পথের কথাও উল্লেখ করেন। তা হল: ভোট, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং সামরিক অভ্যুত্থান।
এই এরশাদের দল জাতীয় পার্টি ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৩০টি আসনে জয়লাভ করেছিল এবং মন্ত্রিসভায় একটি পদ লাভ করেন তার ভাই জিএম কাদের। নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা বহাল না হলে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে না—এ কথা জানার পর থেকেই এরশাদ মহাজোট ত্যাগের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন। শনিবারের অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, দু’একদিনের মধ্যেই তিনি (এরশাদ) মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেবেন। তবে এরশাদের কেচ্ছার শেষ এখনও হয়নি।
সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের পতনের পর এ দেশে আর সামরিক শাসন প্রত্যাবর্তন করেনি। তার পতনের পর ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিএনপি ১৯৯৬ সালে তাদের মত করে নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তারপর আবার বিএনপি। ২০০৬ সালে বিচারপতি কেএম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবার বিষয়টি নিয়ে দোলাচল সৃষ্টি হয়। দেশে চরম নৈরাজ্য চলাকালে ছায়া সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং সেই ক্ষমতা প্রলম্বিত হয় দু’বছর। সে সময় সবচেয়ে বেশি বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় রাজনীতিবিদদের। ব্যবসায়ীরাও নানা বিড়ম্বনার শিকার হন। ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা কিভাবে সেই দুর্বিসহ দিনসমূহের কথা এত সহজে ভুলে গেলেন!
ইতোমধ্যে রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ। ঢাকায় এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নতুন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠ ুও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যক্ষ করতে চায়। ভারতের হাইকমিশনার জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশকে ঘিরে নয়া দিল্লী-ওয়াশিংটন সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় শনিবার পঙ্কজ সরণ উক্ত বক্তব্য প্রদান করেছেন।
অন্যদিকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংলাপে বসতে তার দল ‘রাজি’। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘সেই আলোচনা হতে হবে কেবল নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে, অন্য কোন বিষয়ে নয়’। এর আগে আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগের মহাসচিব সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে তিনি টেলিফোন করে পাচ্ছেন না। আর সৈয়দ আশরাফ বলেছেন তিনি কোন ফোন পাননি। তবে ২২ অক্টোবর দুই মহাসচিবের মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়েছিল।
প্রশ্ন হল, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও গণতন্ত্র বার বার কেন হোঁচট খাচ্ছে? ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধন করেছে ক্ষমতাসীনেরা। এদেশে ‘পরাজয়ের উত্কণ্ঠা’ এবং ‘ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার আকাঙ্ক্ষা’ থেকেই শুরু হয় নানা কর্মকৌশল এবং কথার চালাকি। একটি দেশকে অস্থিতিশীল এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবার চরম মূল্য এদেশের রাজনীতিবিদেরা ইতোপূর্বে দিয়েছেন। বিএনপি বলছে, ১শত ২৭ দিন হরতাল করে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করা হয়েছিল, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা কেন বিলোপ করা হল? আওয়াম লীগ বলছে, একটি স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন থাকতে পারে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের পর থেকে ওই পদ্ধতি পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি আন্দোলন করে আসছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী তাদের অধীনে নির্বাচনের কথা বলেছিল, তবে বিভিন্ন মহলের আহ্বানে গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব পাওয়ার পর বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা প্রদান করেন এবং আওয়ামী লীগকে চিঠি দেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ২৬ তারিখ সন্ধ্যায় টেলিফোন করলেও তিনি (খালেদা জিয়া) নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নেয়ার আহবান জানান। এরপর আলোচনা আর এগোয়নি। প্রধানমন্ত্রী তার প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকার গঠনের কাজ করছেন। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল টানা হরতালের কর্মসূচি দিয়ে চলেছে।
ঈদের পর এ পর্যন্ত তিনটি হরতাল কর্মসূচি প্রদান করেছে বিরোধী দল। প্রথম দু’টি ৬০ ঘন্টা করে এবং তৃতীয় হরতালটি ছিল ৮৪ ঘন্টার। নিশা দেশাই আসবার কারণে এখনও হরতাল কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়নি। দেশে হরতালের নামে চলছে বোমাবাজি, যানবাহনে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, নিরীহ মানুষ হত্যা এবং হানাহানি। তিনটি হরতালে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন প্রায় অর্ধ শতাধিক মানুষ। এদের মধ্যে অনেকে মারা গেছেন।
হরতালে যারা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, তারা সকলেই খুব সাধারণ মানুষ। রাজনীতিবিদদের মত অসাধারণ মানুষ তারা নন। শখে নয়, পেটের তাগিদে তারা ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ করতে বের হন। আশ্চর্য বিষয় হল, হরতালের আগের দিন দুর্বৃত্তরা প্রাইভেট কার, সিএনজি, লেগুনা এবং বাসে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে এবং অগ্নিসংযোগ করে মানুষের মাঝে ভীতি তৈরি করে। ধরে নিলাম হরতালও গণতান্ত্রিক অধিকার কিন্তু পেট্রোল বোমা মারা এবং অগ্নিসংযোগ করা কী ধরনের অধিকার? পিতার সামনে মারা গেছে যে কিশোর, তার পিতা সারাজীবন কোন্ যন্ত্রণাক্লিষ্ট হূদয়ে বেঁচে থাকবেন। কি অপরাধ করেছিল লেগুনার হেলপার, সিএনজি চালক আর স্বর্ণ ব্যবসায়ী? মন্টু পাল তার স্ত্রীর সঙ্গে খাবার খেতে চেয়েছিলেন, তার সামান্য চাওয়া পূরণ হল না। হরতালের নামে যারা সন্ত্রাস করে, তাদের ছোঁড়া পেট্রোল বোমায় তার (মন্টু পাল) জীবন প্রদীপ নিভে গেল। অন্য যারা বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন তারা প্রতি মুর্হূতে কত কষ্ট পাচ্ছে। তা আমরা আমাদের এতটুকু হাত পোড়ার কষ্ট দিয়েই বুঝতে পারি। সীতাকুণ্ড শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ২০ জন আহত হয়েছে, শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে।
দেশে এখন চলছে সন্ত্রাস এবং দমননীতি। বিরোধী দলীয় কয়েকজন নেতাকে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি পোড়ানো এবং ভাংচুরের অভিযেগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তারা কারাগারে রয়েছেন।
দাবি আদায়ের জন্য হরতাল হবে, সেই হরতালে শ্রমিক অভুক্ত থাকবে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া ব্যাহত হবে, রোগাক্রান্ত মানুষ চিকিত্সা পাবে না। মানুষকে পুড়িয়ে মারা হবে। এ কেমন রাজনীতি! রাজনীতিবিদেরা উত্তর দেবেন?
আমরা সাধারণ মানুষ আশা করে আছি, এদেশে সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: গবেষক, সিইও, এইচএসপিপি ফাউন্ডেশন
E-mail: [email protected]
