শচীনের বিদায়

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০১
ক্রিকেট জগতের মহাবিস্ময়কর প্রতিভা শচীন টেন্ডুলকার কালের অমোঘ নিয়মে অবশেষে সম্প্রতি অবসর গ্রহণ করিয়াছেন। সুদীর্ঘ চব্বিশটি বত্সরের অক্লান্ত পরিশ্রম অবিচল নিষ্ঠা আর হিমাচলের মৌনতাসদৃশ্য একাগ্রতায় তিনি শুধু ভারতীয় ক্রিকেটের নহে বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনেরও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিকেটার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিয়া গেলেন। এগার বত্সর বয়সে যে বালক ব্যাট হাতে মুম্বাইয়ের পক্ষে খেলিতে নামিয়াছিলেন কালের চলমান স্রোতের উপর ভর করিয়া সেই বালকই একদিন ভারতীয় ক্রিকেটের চীনের প্রাচীর হইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি যেন বিশ্বের তাবত্ বোলারের নিকট ছিলেন দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর। তিনি ক্রিকেটের সকল গিরিখাত বাধার দুর্লংঘ পাহাড় কিংবা কন্টকাকীর্ণ সড়ক অতিক্রম করিয়াছেন অনায়াসে কেবলই স্বীয় অদম্য ইচ্ছা, গভীর মনঃসংযোগ আর ক্রিকেটের প্রতি অবিশ্বাস্য অনুরাগের উপর ভর করিয়া। পিতার প্রেরণাকে শচীন জীবনের সবচাইতে বড় আশীর্বাদরূপে গণ্য করিয়াছেন। কারণ সেই বালক বয়সেই পিতা তাহাকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘স্বপ্নকে তাড়া করো, তবে কোন শর্টকাট খুঁজিও না। পথ হয়তো কঠিন হইবে তথাপি হাল ছাড়িও না’। পিতার এই নির্দেশ শচীন আজীবন পালন করিয়া গিয়াছেন পরম নিষ্ঠা এবং ইবাদতের মতো বিশ্বাস দ্বারা। একাগ্রতা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, দুর্জয় সাহস ও অদম্য মনোবল থাকিলে মানুষের সাফল্য ও খ্যাতি যে গিরিরাজ্যের মাথা ডিঙ্গাইয়া যাইতে পারে শচীন টেন্ডুলকার ইহার এক প্রকৃষ্টতম উদাহরণ। সোনার হরিণকে ধরা যায় না; কিন্তু শচীন টেন্ডুলকারের নিকট যেন সেই সোনার হরিণ স্বেচ্ছায় ধরা দিয়াছিল। টেস্ট কিংবা ওয়ানডে উভয় প্রকার ক্রিকেটের ক্ষেত্রেই তিনি আজ রাজাধিরাজের মহিমায় সমাসীন। ক্রিকেটের অঙ্গনে বিশ্ব অনেক উঁচু মানের ক্রিকেটারের সাক্ষাত্ পাইয়াছে; কিন্তু শচীন তাহাদের সকলের মাঝেই এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। ডন ব্র্যাডম্যান, ওয়ালী, হ্যামন্ড, গারফিল্ড, সোবার্স, কনরাড হান্ট, হানিফ মোহাম্মদ, ফ্রাংক ওরেল, ভিভ রিচার্ড, সুনীল গাভাস্কার প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য ক্রিকেটারদের মাঝে শচীন আপন আলোতে এমনই সমুজ্জ্বল যে আর সকলকে সে আলো যেন অনেকখানি নিষ্প্রভ করিয়া দিয়াছে। শচীনের আলোর জ্যোতি সুদীর্ঘকাল ক্রিকেট গগনকে আলোকময় করিয়া রাখিবে এবং সেই আলোর পথ বাহিয়া ভবিষ্যতের ক্রিকেটাররা পাইবে পথের দিশা ইহাতে সন্দেহ কী! দীর্ঘ চব্বিশটি বত্সর শচীনের ব্যাটের সুনিপুণ ছোঁয়ায় ক্রিকেট এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করিয়াছিল। আর অসাধারণ নৈপুণ্যে তিনি এমনই এক ক্ল্যাসিক ভঙ্গি রপ্ত করিয়াছিলেন যাহা সকল বিচারেই অনন্য সাধারণ। কোন এক অপার্থিব প্রেরণায় যেন ধূমকেতুর ন্যায় ‘পুচ্ছ’ নাচাইয়া সকলকে বারংবার তাক লাগাইয়া দিয়াছেন তিনি। খুরের দাপটে মেদিনী কাঁপাইয়া ফিরিয়াছেন সদম্ভে। সব সময়ই তাহার কণ্ঠে ছিল ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ এই সংকল্প আর অন্তরে ছিল সেই সংকল্প বাস্তবায়নের বিস্ময়কর তাগিদ ও তাগাদা। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তিনি এমন সব রেকর্ড গড়িয়া গিয়াছেন যাহা অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে কাহারও পক্ষে অতিক্রম করা শুধু দুঃসাধ্যই নহে অসম্ভবও বটে। টেস্ট ও ওয়ানডেতে শতটি শতক করিবার গৌরবের অধিকারী কেবল তিনি নিজে। এখানে তিনি অনন্য এক মেধা দ্বিতীয়ম। ইহাছাড়াও, আরো অনেক রেকর্ড গড়িয়াছেন শচীন যাহা তাহাকেতো বটেই এমনকি গোটা ভারতবাসীকে এবং একই সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেটকে আনিয়া দিয়াছে বিশেষ গৌরব ও মহিমা। তাই কালের নিয়মে আর ক্রিকেট অঙ্গন হইতে শারীরিকভাবে বিদায় লইলেও শচীন টেন্ডুলকার ক্রিকেট অনুরাগীদের নিকট কেবল প্রাতঃ স্মরণীয়ই থাকিবেন না, থাকিবেন এ অঙ্গনের সবচাইতে ঋজু কৃতীমান ও কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব হিসাবে চির উজ্জ্বল। চিরঞ্জীব। জয়তু শচীন!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন