বর্ষশেষে ভর্তি বিড়ম্বনা

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০১
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বত্সরের এই সময়টায় ছেলেমেয়েদের একটা কোনো ভাল স্কুলে ভর্তি করাইতে অভিভাবকগণ গলদঘর্ম হন। শুরু হইয়া যায় তাঁহাদের দৌড়-ঝাঁপ। এই দৃশ্য প্রতি বত্সরের। ভর্তি বিড়ম্বনা কমাইয়া আনিতে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম করা হইয়াছে। তাহাসত্ত্বেও পরিস্থিতির ইতরবিশেষ ঘটিয়াছে বলা যায় না। অন্যান্য বত্সরের ন্যায় এইবারও যথারীতি তত্পর হইয়া উঠিয়াছে ভর্তি বাণিজ্যের কুশীলবগণ। সমপ্রতি এই ধরনের একাধিক রিপোর্ট ছাপা হইয়াছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। অভিভাবকগণ ছোটাছুটি করিতে শুরু করিয়াছেন প্রভাবশালী মহলে। স্কুল কমিটির সদস্যদের নিকটে ধর্ণা দিতেছেন অনেকেই। নামিদামি কোনো স্কুলে ভর্তি করাইতে না পারিলে ছেলে বা মেয়েটির জীবনটাই যেনবা বরবাদ হইয়া যাইবে। উপরন্তু সমাজে মানও থাকে না। সন্তান কোন স্কুলে পড়ে, তাহা একালে অনেকের বিবেচনায় প্রেস্টিজ ইস্যু হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ফলে নাগরিক অভিভাবকগণের অনেকেই তদবির করিয়া, বড় কাহাকেও ধরিয়া কিংবা উেকাচ দিয়া হইলেও ভাল স্কুলে ভর্তি করাইতে উদগ্রীব। তাহাদের সেই সামর্থ্যও আছে বটে। লটারি, তেল-তদবির অথবা বাড়তি টাকাপয়সা গণিয়া যত সংখ্যক ছেলেমেয়ে তথাকথিত ভাল স্কুলসমূহে প্রবেশাধিকার পায় সেই তুলনায় চান্স না পাওয়াদের সংখ্যা যে অনেক বেশি—তাহাতে আর সন্দেহ কী! ভাল স্কুল মন্দ স্কুল লইয়া তর্ক উঠিতে পারে। কেহ কেহ বলিতে পারেন, স্কুল তো স্কুলই। সেইসবের মধ্যে ভালমন্দের ব্যবধান রেখা টানিবার কি যুক্তি থাকিতে পারে। যুক্তি থাকুক বা না থাকুক, বাস্তবতা এই যে, এমন কিছু স্কুল আছে, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় সেইসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে অনেক ভাল ফলাফল করিয়া থাকে। আবার এমন অনেক বিদ্যালয় আছে যেগুলি ভাল রেজাল্ট করিতে পারে না কখনই। এমতাবস্থায় সামর্থ্যবান ও সচেতন অভিভাবকগণ নামকরা স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাইতে উন্মুখ হইয়া থাকিবেন, এই তো স্বাভাবিক। অত:পর প্রশ্ন এই যে, যে সমস্ত স্কুলের ললাটে ভাল-র তকমা জুটে নাই, সেইগুলি কি সব সময়ই মন্দ বিদ্যালয় হইয়াই থাকিবে। সেইসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকমন্ডলি এবং পরিচালনা পরিষদের জন্যও বিষয়টি গৌরবজনক বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না। প্রসঙ্গত বলা আবশ্যক যে, শহরাঞ্চলে নিরেট প্রাইভেট স্কুল অনেক চালু থাকিলেও, বেশিরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ই চলিয়া থাকে সরকারি টাকায়। শিক্ষকগণ মূল বেতনের পুরোটাই পান সরকারি কোষাগার হইতে। স্কুল ভবনও, দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, নির্মিত হইয়াছে সরকারের অনুদানের টাকায়। লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরির জন্যও সরকারি অনুদান দেওয়া হয়। অন্যদিকে রাজধানীতে প্রায় ৪ শত প্রাইমারি স্কুল আছে যেইগুলি সম্পূর্ণ সরকারি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশেরই রহিয়াছে দৃষ্টিনন্দন ভবন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করাইবার কথা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অভিভাবকগণ ভাবেন না বলিলেই চলে। কারণ, ইহা কাহারও অজানা নয় যে, সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলি চলে না-চলার মত করিয়া। ওইসব স্কুলে লেখাপড়া কিছুমাত্র হয়—এমনটি খুব কম লোকই বিশ্বাস করেন। পরিস্থিতি এই রকম না হইয়া যদি সরকারি প্রাইমারি স্কুলসমূহে মানসম্মত পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করা যাইত, তাহা হইলে অভিভাবকগণ বাড়ির কাছের স্কুলে না দিয়া ছেলেমেয়েদের দূরের নামকরা স্কুলে দেওয়ার জন্য পেরেশান হইতেন না। একইভাবে সরকারি অনুদানে চলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মানোন্নয়ন করা গেলে অভিভাবকগণ ধারেকাছের স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাইয়াও নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিতেন। ভাল স্কুলে ভর্তি লইয়া নয়-ছয় কারবারের সুযোগও কমিয়া আসিতে পারিত। বিষয়টির প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের কার্যকর দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন