[ রা জ নী তি ]

নির্বাচনী রাজনীতির বর্তমান চালচিত্র

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০১
নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হচ্ছে আগামী ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ অর্থাত্ বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের আগেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে কমিশন প্রস্তুত। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের সংস্কার এবং নতুন নির্বাচনী আচরণ বিধি করে ফেলেছে। দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যেমন: গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে যেখানে আগে বিধান ছিল যদি কেউ কোন দল থেকে নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে চায় তাকে অবশ্যই সেই দলের সদস্য হিসেবে ৩ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। বর্তমানে এই বিধানটি তুলে দেয়ায় যে কেউ নির্বাচনকালীন সময়ে দলে যোগ দিয়েই শুধুমাত্র অর্থের জোরে মনোনয়ন পাবেন। দলের জন্য উত্সর্গীকৃত রাজনীতিবিদরা এতে রাজনীতিতে উত্সাহ হারিয়ে ফেলবেন। অন্যদিকে নতুন আচরণবিধি থাকা সত্ত্বেও সরকারদলীয় মন্ত্রীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেই ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। উপরের দুটো ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশন নীরব মদদদাতার ভূমিকাই পালন করেছেন। পূর্ববর্তী নির্বাচন কমিশনের চেয়ে বর্তমান কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা তাই অনেক দূর পিছিয়ে পড়লো। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা হচ্ছে, এগুলো সংস্কারের মাধ্যমে এক ধাপ এগোয় আবার ঠিক কিছুকাল পরেই আর এক ধাপ পিছিয়ে যায়। যাহোক, এতো গেলো নির্বাচন কমিশনের কথা। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে যে দ্বন্দ্ব অর্থাত্ বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন আর আওয়ামী লীগ চায় সর্বদলীয় সরকারের অধীনে এই নির্বাচন করতে চায়। এই দ্বন্দ্ব নিয়ে সংলাপ প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই ভেস্তে গেছে। সংলাপ যে হবে না এ বিষয়ে আমি আগেও ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি লেখায় বলেছিলাম। বাংলাদেশের বিগত বিশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়েছে এর কোন প্রমাণ মেলেনি। আমি আমার ঐ লেখায় আরও বলেছিলাম, চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান এক তরফাই হবে। এর মানে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল যেভাবে সমাধান চাইবে সেভাবেই হবে। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপিকে এককভাবেই সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী করতে হয়েছিলো। বর্তমান সংকটের সমাধান সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে না হলেও, সংবিধানের আওতার মধ্যেই হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ১৮ নভেম্বর একটি নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার গঠন করতে যাচ্ছেন। এই মন্ত্রিসভায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপির জন্য কয়েকটি পদ রাখার কথাও বলা হয়েছে। মন্ত্রিসভার গঠন থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, এটি একটি ডান, মধ্যম ও বামপন্থি কোয়ালিশন সরকারের কাঠামোর মত। এই কাঠামোর পেছনে যে আওয়ামী লীগের একটি নির্বাচন কৌশল আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে মন্ত্রিসভায় যদি বিএনপি যোগ দেয়, তাহলে ঐ কৌশল কতটুকু কার্যকর হবে, তা দেখার জন্য আমাদেরকে আর একটু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আওয়ামী লীগ সর্বদলীয় সরকার গঠন করে ফেললে তা বিএনপির আন্দোলনের জন্য অনিশ্চিত যাত্রার ক্ষেত্রে আরেকটি মাত্রা যোগ করবে। এই অনিশ্চিত যাত্রার সূচনা হয়েছিলো যখন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোনে সংলাপে বসার আমন্ত্রণকে প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে। ঐ সংলাপে ত্বরিত সাড়া দিলে তা বিএনপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতো, এ বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত। কিন্তু, তা না করে উপর্যুপরি হরতাল আহ্বান বিএনপির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় ফাটল সৃষ্টি করেছে- যা বিভিন্ন মহলের সাথে আলোচনায় এটি বুঝা যায়। বিএনপির আন্দোলনের জন্য আর একটি দুর্বল দিক হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দলটির ফর্মূলা। কোন রকম প্রস্তুতি ছাড়াই প্রস্তাবিত এই ফর্মূলার চূড়ান্ত বক্তব্যটি হচ্ছে যে কোন মূল্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়া। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করবেন। বিএনপির এই বক্তব্যে অস্পষ্টতা আছে বলে আমি মনে করি। বিএনপি এটি পার্থক্য করেনি যে, দলটি ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে চায় না, না চায় তার নির্বাহী ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে। যদি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার উপরই বিএনপি সকল সংশয়, তাহলে তা দাবি আকারে পেশ করা যেতো। আসলে ব্যক্তি শেখ হাসিনাই মুখ্য বিষয়। বেগম খালেদা জিয়া কোন অবস্থাতেই শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। যা তিনি বহুবার বলেছেন। উপরে উল্লেখ করেছি, আন্দোলনের স্ট্র্যাটেজি হিসেবে বিএনপি হরতাল পালন করছে। সামনে হয়তো তারা আরও হরতালের ডাক দিবে। এমনকি অবরোধ অসহযোগেরও ডাক দিতে পারে। এ অবস্থায় দলটির নেতাকর্মীরা আরও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হতে পারে। সর্বোপরি আন্দোলনের এক পর্যায়ে যদি জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচন আরও ৩ মাস পিছিয়ে দিতে পারে। এতে করে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ আরও ঝুলে যেতে পারে। একদিকে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ঝগড়া করছে, অন্যদিকে এই সংকট থেকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। উপরে উপরে মহাজোট ছেড়ে যাবার হুমকি দিয়ে, দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি রাজনীতিতে তার গুরুত্বকে বার বারই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। সাম্প্রতিক সময়ে কাদের সিদ্দিকী -বদরুদ্দোজা চৌধুরী-কামাল হোসেনের সাথে রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রচেষ্টা রাজনীতিতে তার গুরুত্ব তুলে ধরারই আরেকটি প্রমাণ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি সম্ভবত ক্ষমতাসীন দলের সাথে তার দর কষাকষির একটি প্রক্রিয়া। এরশাদ যে এক্ষেত্রে সফল হয়েছেন, তার প্রমাণ অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় তার দল থেকে ৬-৭ জনের অন্তর্ভুক্তি পাওয়া। একদিকে জাতীয় পার্টি থেকে ৬-৭ জনের অন্তর্ভুক্তি অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের আমিরের সাথে এরশাদের সাক্ষাত্ মহাজোটের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে। চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ থেকে শুরু করে অনেক বিদেশি শক্তি তাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহবান জানিয়েছে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হউক এ বিষয়ে তাদের কারোরই আপত্তি নেই। আমি মনে করি বাইরের শক্তি কখনই আমাদের রাজনৈতিক সংকট সমাধান করে দিতে পারে না। বাইরের যেকোন হস্তক্ষেপ দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তির জন্য অপমানজনকও। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের চলমান সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের তত্পরতা লক্ষণীয়। বাইরের শক্তি সংকটের সমাধান করতে না পারলেও, তারা চাপ প্রয়োগ করতে পারে আবার তাদের নিজস্ব স্বার্থের বিষয়টি প্রচ্ছন্নভাবে সামনে নিয়ে এসে নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের জঙ্গিবিরোধী সাফল্যের সাথে ভারত এবং আমেরিকার স্বার্থ যে অভিন্ন এটা বোধগম্য না হওয়ার কোন কারণ নেই। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা জনমতের বিপক্ষে অবস্থান নিবেন বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যেই সরকার ২৫ নভেম্বর আমেরিকার সাথে টিকফা চুক্তি সই করতে যাচ্ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব কিছুটা হলেও কমবে। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের সকলেরই কামনা, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনই একমাত্র পথ যার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব। সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিয়ে বিএনপি জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র এবং অর্থ এই তিনটি মন্ত্রণালয় নিজেদের অধীনে রাখার দাবি করলে তা বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য একটি সম্মানজনক পথ হতে পারে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন