কথা ও কাজে সততা

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০২
মানুষ যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন তার শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। কাজের গুণাগুণ ও গুরুত্ব ভেদে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক সামর্থ্যের মাত্রা ভিন্ন হয়। পরিকল্পনাও কাজ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নও কাজ। তবে পরিকল্পনা করার জন্য তুলনামূলকভাবে শারীরিক সামর্থ্যের প্রয়োজন হয় কম। অন্য কথায় একটি দেশের প্রেসিডেন্টও কাজ করেন, তবে তাঁর কাজে শারীরিক সামর্থ্য অপেক্ষা মানসিক সামর্থ্যের গুরুত্ব বেশি। আবার মানুষের অতি প্রয়োজনীয় বসতবাড়ি গড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আর্থিক সামর্থ্য। মানব শিশু জন্ম নেয়ার সাথে সাথে এসব সামর্থ্য জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হয় না। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সামর্থ্যকে কাজোপযোগী করার দায়িত্ব মানুষের। কিছু দায়িত্ব আছে যা পালন করতে হয় সমাজ বা সরকার প্রধানকে। ক্ষমতা বা যোগ্যতাবলে মনের ইচ্ছাকে বা পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের জন্যে যে পদক্ষেপ তার উপর নির্ভর করে কাজের ফলাফল। অর্থাত্ নিষ্ঠার সাথে গৃহীত কাজেই কেবল সুফল আসে। সমাজ বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক সামর্থ্য অর্জন এবং প্রয়োগে দেখা দিচ্ছে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা যাকে বলা হয় বিজ্ঞান। বর্তমানে বিজ্ঞানের অবস্থান এমন এক পর্যায়ে যে কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্যে কাঙ্ক্ষিত কাজ করা অসম্ভব হয়ে যায়। পাশাপাশি সমাজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোন এক সমাজের কোন কিছুই আর গোপন বা একক নয়। অর্থাত্ সমগ্র বিশ্ব এখন এক ছাতার নিচে যাকে বলা হচ্ছে “গ্লোবাল ভিলেজ”। গ্লোবাল ভিলেজের সুবিধা যেমন আছে তেমনি অসুবিধাও আছে। আমাদের শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক সামর্থ্য মত উন্নয়নশীল দেশকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে উন্নত বিশ্বের দেশসমূহের সাথে। প্রত্যেকেরই নিজ স্বার্থ দেখা স্বাভাবিক। আমাদের মত দেশের অর্থনীতির অভিভাবক অনেকেই কিন্তু উন্নয়নের স্বার্থে সঠিক সময়ে সঠিক সহযোগিতা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সহজলভ্য হয় না। এসব প্রতিকূলতায় সরকারের পদক্ষেপের গুরুত্ব অনেক বেশি। ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সাল, দীর্ঘ ৪২ বছর। ৭ কোটি ৫০ লাখ লোক ছিল ১৯৭১ সালে। বর্তমানে ১৬ কোটি। অনেক স্বপ্ন ছিল আমাদের। ১৯৭১ সালে আমার মত অনেকেই জীবনের প্রথম সার্টিফিকেট পরীক্ষা না দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল পরবর্তী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে। ৪২ বছর পর আমি হিসাব মিলাতে পারি না। এখনও এক-তৃতীয়াংশ মানুষ তার খাদ্য ক্রয় করতে পারে না। এক-তৃতীয়াংশ শুনতে হয়ত খুব অল্প শোনায় কিন্তু সংখ্যাটি প্রায় ৫ কোটি। তবে আশার কথা যে কেউ না খেয়ে মারা যায় না। উন্নত বিশ্ব এখন খুব সজাগ। বদনাম নিতে রাজি নয়। তবে এ দরিদ্র জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যের বিষচক্র থেকে মুক্তি পাক তাও হয়ত তারা চান না। যদি তাই থাকত পরিকল্পনায় তাহলে “৬ষ্ঠ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল” পর্যন্ত যেতে হত না আমার বিশ্বাস। আমার মতে একটি দেশের ১৬ বছরের পরিকল্পনা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নই যথেষ্ট উন্নয়নের স্রোতধারায় আনার জন্য। ১৬ বছর বলছি এ কারণে যে, একটি মানব শিশুর জন্মের সূচনা অর্থাত্ মা-এর পেটে আসার সাথে সাথে তার উপযুক্ত খাদ্য এবং চিকিত্সা শুরু করতে হবে। অপুষ্ট শিশু অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের দায় হয়ে দাঁড়ায়। জন্মের পর থেকে এস.এস.সি. পরীক্ষা পর্যন্ত সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখার মাধ্যমে উপযুক্ত নাগরিক তৈরি করতে হবে। এস.এস.সি. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর একজন মানুষ তার নিজ দায়িত্ব নিজেই নিতে পারে। জাতীয় সমস্যা বিবেচনায় রেখে সার্বিক উন্নয়নের বাস্তবমুখী পরিকল্পনা এবং তার শতভাগ বাস্তবায়নই যথেষ্ট একটি দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে সঠিক রাস্তায় আনার জন্যে। কথার সাথে মিল রাখতে পারলেই সুন্দর ভবিষ্যত্ সম্ভব। না হয় প্রতিবছরই থাকবে উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং পাশাপাশি বছর শেষ হওয়ার সাথে সাথে জাতীয় দায়ও বৃদ্ধি পাবে। এই কারণেই বর্তমানে অর্থাত্ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হয়েছে জাতীয় “দায় ও দায়ের সুদ” পরিশোধ খাতে। আমাদের দেশের অধিকাংশ গরীবের বসবাস গ্রামে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের মৌলিক চাহিদা অর্থাত্ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিত্সার সেবা থেকে গ্রামের গরীব জনগণ বঞ্চিত। সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে। সরকারের দাবি প্রায় সকল স্কুলগামী ছেলেমেয়ে বর্তমানে শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কথা এবং কাজে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এই বছর জুনিয়ার স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ১৯ লাখের মত ছেলেমেয়ে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে অবস্থান এমন জনসংখ্যা হওয়া উচিত প্রায় ৪০ লাখ। যদি তর্কের খাতিরে ১৯ লাখই ধরি তাহলেও প্রতিবছর শ্রম বাজারে প্রবেশ করে ২৫ লাখের মত। প্রতিবছর কতজন ছেলেমেয়ে এস.এস.সি. এবং এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় অংশ নেয় বা কতজন ছেলেমেয়ে উক্ত পরীক্ষায় পাস করে তা আমাদের সকলের জানা। সুতরাং আমাদের কথা এবং কাজ হবে আমাদের শ্রম বাজারে প্রত্যাশিত সকল যুবক-যুবতী যেন শিক্ষিত হয় বা করতে পারি। আমাদের পরিকল্পনাবিদরা কি জানেন একজন অশিক্ষিত চাকরি প্রার্থীর বেতন কত হওয়া উচিত বা সে কত পেয়ে থাকে? অন্যদিকে সে জাতীয় অর্থনীতিতে কি অবদান রাখতে পারে? দেশ বিদেশের বাজারে অশিক্ষিত শ্রমিক সরবরাহ করে জিডিপি বৃদ্ধি করা যাবে না। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে মানসম্মত উন্নতির মাধ্যমেই সম্ভব জাতীয় উত্পাদন বৃদ্ধি করা। অবশ্যই তা হতে হবে দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য। মনে রাখতে হবে শিক্ষা ক্ষেত্রের অবদানের একমাত্র প্রমাণ হচ্ছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উত্পাদনশীলতার মাত্রা কোন পর্যায়ে। সরকারের কথা কতটুকু সত্য তার প্রমাণ মিলবে দেশের আপামর জনসাধারণের আর্থিক সচ্ছলতা কতটুকু তার উপর। দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আনতেই হবে, সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। ইতিমধ্যে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে, ৪২ বছর শেষ করেছি। সাধারণ মানুষের কথা বলার সুযোগ শুধু জাতীয় নির্বাচনের দিন ভোট দেয়ার মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সাধারণ মানুষের কথা চিন্তায় রাখা। মনে রাখবেন সমাজের জন্যে ভাল কাজ করলে ইহকালে যেমন ভাল তেমনি পরকালেও মহান আল্লাহ পুরস্কার দেবেন। অবশ্য যাঁরা ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস করেন। লেখক :এফসিএ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন