ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অব্যাহত অচলাবস্থা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০২
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেশকিছুদিন যাবত্ চলিয়া আসা অচলাবস্থায় নূতন মাত্রা যোগ হইয়াছে। অতিষ্ঠ পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা চট্টগ্রামের সহিত ঢাকাসহ ২০টি রুটে বুধ ও বৃহস্পতিবার পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়াছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনের অনুরোধে বুধবারের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হইলেও বৃহস্পতিবারের কর্মসূচি এখনও বহাল আছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কয়েকটি স্থানে অব্যাহতভাবে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পরিবহন শ্রমিকদের উপর হামলার প্রতিবাদে আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতি এই কর্মসূচি ঘোষণা করিয়াছে। একই সাথে জোর দাবি জানানো হইয়াছে যানবাহন ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার। দাবি পূরণ না হইলে আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণের হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করা হইয়াছে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলির এক যৌথসভায়। চট্টগ্রাম বন্দরের সহিত রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সংযোগ রক্ষাকারী সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটিতে দীর্ঘদিন যাবত্ যাহা ঘটিতেছে তাহাতে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের পিঠ যে দেওয়ালে ঠেকিয়া গিয়াছে তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না। মহাসড়ক ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং জনসাধারণের অবস্থা আরও করুণ। উল্লেখ্য যে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করিয়া গত ফেব্রুয়ারিতে সীতাকুণ্ড-সংলগ্ন মহাসড়কে যে সহিংস পরিস্থিতির সূচনা হইয়াছিল তাহা থামিবার কোনো আলামত দেখা যাইতেছে না। বরং ইতিমধ্যে সমগ্র এলাকাটি পরিণত হইয়াছে আতঙ্কের জনপদে। প্রায় স্থবির হইয়া পড়িয়াছে স্থানীয় দুই শতাধিক শিল্পকারখানার উত্পাদন এবং সরবরাহ কার্যক্রমও। প্রশাসনের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত দুই সপ্তাহে সীতাকুণ্ডে মহাসড়কের ৩৭ কিলোমিটার অংশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস, পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকসহ ৬৯টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে। ভাঙচুর করা হইয়াছে আরও কয়েকশত গাড়ি। শুধু যে নির্বিচারে যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পরিবহন শ্রমিকদের উপর হামলা হইতেছে তাহাই নহে, সেই সাথে চলিতেছে এলোপাতাড়ি সড়ক অবরোধের ঘটনাও। ফলে সৃষ্টি হইতেছে দীর্ঘ ও দুঃসহ যানজটের। অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগ ও অপূরণীয় অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হইতেছে যাত্রী এবং মূল্যবান আমদানি ও রফতানি পণ্যবাহী যানবাহনগুলির নিরাপত্তাও। সর্বশেষ গত শনি, রবি, সোমবারও অর্ধশতাধিক গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে। ভাঙচুরের শিকার হইয়াছে শতাধিক গাড়ি। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরাই যে এই তাণ্ডবের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে আসল ভুক্তভোগী যে দেশের জনগণ ও অর্থনীতি তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি হইল, মহাসড়কটি সচল রাখিবার জন্য তাহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেছেন। কিন্তু সেই চেষ্টা যে খুব একটা কাজে আসিতেছে না তাহা ইতোমধ্যে স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। কাজে আসিবার কথাও নহে। সহিংসতাই বলি আর অচলাবস্থাই বলি— কোথায় ইহার মূল নিহিত রহিয়াছে তাহাও দেশবাসীর অজানা নহে। রোগের আসল কারণটি দূর করা না গেলে সমস্যা উত্তরোত্তর বাড়িতেই থাকিবে— ইহাই স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যের বিষয় হইল, সেইদিকে যাহাদের মনোযোগ দিবার কথা তাহারা নির্বিকার। পাশাপাশি ইহাও সত্য যে সভা-সমাবেশ করিবার অধিকার সকলেরই আছে। কিন্তু সেই অধিকারকে যখন যাহা ইচ্ছা তাহা করিবার অধিকার বলিয়া ধরিয়া নেওয়া হয় তখন যাহা হইবার কথা এখনও ঠিক তাহাই হইতেছে। ফলে সীতাকুণ্ডের পরিস্থিতিকে আলাদা করিয়া দেখিবার অবকাশই বা কোথায়? শুধু এইটুকু বলা যায় যে কোনো দেশপ্রেমিকের পক্ষে এইভাবে জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করা এবং অর্থনীতির দফারফা করা সম্ভব নহে। বলা অসঙ্গত হইবে না যে, দেশের ‘লাইফলাইন’ হিসাবে বিবেচিত একটি মহাসড়কে দিনের পর দিন এই ধরনের অচলাবস্থাই যদি চলিতে থাকে তাহা হইলে জনগণের অর্থে প্রতিপালিত একটি প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষ থাকার প্রয়োজনই বা কী?