কবি সুকান্ত লিখিয়াছিলেন, ‘অবাক পৃথিবী অবাক যে বার বার/ দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার।’ কথাটি আজকের বাংলাদেশের জন্য সর্বতোভাবে প্রযোজ্য। কেননা, বিগত বেশ কিছু বত্সর ধরিয়া এইখানে যেন কেবলই মৃত্যুর মিছিল চলিয়াছে। মৃত্যুর এক উপত্যকা যেন আজিকার এই বাংলাদেশ। আর এই সকল মৃত্যুর মধ্যে অধিকাংশই ঘটিয়াছে বা ঘটিতেছে অপঘাতে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা এই দেশে অবিশ্বাস্য হারে বাড়িতেছে। আবার রাজনৈতিক সহিংসতাজনিত মৃতের সংখ্যাও নেহায়েত্ কম নহে। স্বাভাবিক মৃত্যুর যেন আর কোন গ্যারান্টিই নাই আমাদের সকলের স্বপ্নের ও সাধের এই বাংলাদেশে। কানিজ ফাতেমা তাসনিম নাম্নী এক অষ্টাদশী কলেজ ছাত্রী কয়েকদিন পূর্বে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের নিকটে বিআরটিসির দোতলা বাসের ধাক্কায় নিহত হইয়াছে। মৃত্যুর দুইদিন পরই ছিল তাহার জন্মদিন আর তাহার ঐ জন্মদিন পালনের জন্য পরিবারের তরফ হইতে চলিতেছিল আনন্দঘন আয়োজন। কিন্তু যন্ত্রদানব তাহাকে পরিবারের সহিত সে আনন্দ উপভোগের কোন অবকাশই দিল না। নিষ্ঠুর এই মৃত্যু মানিয়া নেওয়া যায় না। এমনিভাবে কিছুদিন পূর্বে কমলাপুরে বাসের ধাক্কায় সন্তানের চোখের সামনে নিহত হয় গৃহবধূ রোকসানা বেগম। ইহার কিছুদিন পর ঐ কমলাপুরেই বাসের ধাক্কায় অপর এক গৃহবধূ সানজিদা আক্তারের প্রাণ প্রদীপ চিরকালের জন্য নিভিয়া যায়। রাজধানীতে বেপরোয়া বাস ও ট্রাক চালকদের নির্মমতায় প্রায় প্রতিদিনই এমন ধারার দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার উত্তরায় মিনিবাসের ধাক্কায় এক হোন্ডাচালক তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটিয়াছে। এই সকল মৃত্যুর কি কোন সান্ত্বনা হয়? কি বলিয়া আমরা নিহতদের পরিবার পরিজনকে প্রবোধ দিব? শুধু রাজধানীই নহে সারাদেশেই সড়ক দুর্ঘটনার নিদারুণ নিষ্ঠুর চিত্র দেখিতে দেখিতে আমাদের অনুভূতিও বুঝিবা আজ ভোতা হইবার জোগাড়।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল কেবলই দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইয়া চলিয়াছে। ঘরের বাহিরে পথে পথে যেন ওত পাতিয়া রহিয়াছে মৃত্যুর দূত। সড়ক দুর্ঘটনার বহু সংবাদ আবার থাকিয়া যায় আমাদের জানার বাহিরে। পত্রিকায় কিংবা অন্যকোনো গণমাধ্যমে আসিয়া পৌঁছায় না সেইসব খবর। প্রত্যহ কত মায়ের বুক খালি হইতেছে, অকালে ঝরিয়া পড়িতেছে প্রতিভাবান জীবন, কত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হইয়া চিরতরে কর্মক্ষমতা হারাইয়া দুর্বিষহ জীবন যাপন করিয়া চলিয়াছেন তাহার কোনো ইয়ত্তা নাই। মেধাবি চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, আরেক প্রতিভা মিশুক মনিরের জীবন হরণ করিয়াছে সড়কপথের ধাবমান দানব। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা রিপোর্টে তথ্য প্রকাশ করা হয় যে, এই দেশে গড়ে প্রতিবত্সর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটিয়া থাকে ১২ হাজার মানুষের। এতদব্যতীত কর্মক্ষমতা হারান কম করিয়া হইলেও ৩৫ হাজার মানুষ। বিশ্ব ব্যাংকের অন্য এক হিসাবে বলা হয় বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার যন্ত্রযানের মধ্যে ৮৫. ৬০ ভাগ কখনও না কখনও দুর্ঘটনা কবলিত হইয়া থাকে।
আমরা সকলেই আশা করি অপঘাত মৃত্যুর এই বেদনার্ত অভিযাত্রা একদিন না একদিন বন্ধ হইবে। মানুষের জীবন যে কত মূল্যবান উহা অনুধাবন করিতে সকলেই সচেষ্ট হইবে। সড়ক-রেল কিংবা নৌপথের যাহারা যানচালক তাহাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত হইবে। এই কামনা ও আশা প্রকাশ ছাড়া এই দেশের অসহায় ও নিরীহ জনগোষ্ঠীর আর কিইবা করিবার আছে?
