সিএফএল বাল্ব নিয়ে ইতিবাচক কথার শেষ নেই। এই বাতি কম শক্তি খরচ করে বেশি আলো দেয়। শক্তির খরচ কম মানে বিদ্যুত্ও কম ব্যয় হয়। অর্থাত্ পরিবেশের জন্যও তা উপকারী। কারণ বিদ্যুত্ উত্পাদনে তৈরি হয় প্রচুর পরিমাণ গ্রিন হাউজ গ্যাস। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে এই গ্রিন হাউজ গ্যাসই মূলত দায়ী। প্রথাগত বাল্বের তুলনায় একটি সিএফএল (কম্প্যাক্ট ফ্লোরোসেন্ট লাইট) বাল্বে পাঁচ গুণ বেশি আলো দেয়। বিদ্যুত্ সাশ্রয়ী বাতির দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি হলেও সাধারণ বাল্বের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি এবং বেশি আলো দেয়ার কারণে একবার বেশি টাকা দিয়ে কিনলে আর ঝামেলা থাকে না। তাছাড়া সাধারণ বাতির তুলনায় এর গড় আয়ু ৮ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত বেশি হয়। যেখানে সাধারণ বাতির গড় আয়ু ৭৫০ ঘণ্টা থেকে দেড় হাজার ঘণ্টা সেখানে একটি বিদ্যুত্ সাশ্রয়ী বাতির আয়ু ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার ঘণ্টা। অর্থাত্ এর ভালো দিক নিয়ে বলার শেষ নেই।
কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। সুনির্দিষ্ট গবেষণায় জানা গেছে এই বাল্ব মানবদেহের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বলা যায় এই বাল্বের আলো মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন ব্রিটিশ গবেষকরা। তারা বলছেন, এই বাল্বের আলোতে ক্যানসার, স্নায়ুরোগ, চর্মরোগ, স্মৃতিভ্রম, বন্ধ্যাত্ব, মানসিক অবসাদ, থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যালজাইমার এবং পার্কিনসনের মতো কঠিন রোগের শিকার হতে পারেন যে কেউ। ইউরোপ ও আমেরিকায় একাধিক গবেষণায়ও তার প্রমাণ মিলেছে। উন্নত দেশগুলোতে সিএফলের ব্যবহার কমিয়েও আনা হয়েছে। কিন্তু আমরা হাঁটছি উল্টো পথেই। ১৯৮০ সালে সিএফএল বাল্ব পরিচিতি লাভ করে এবং ক্রমশ তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কম বিদ্যুত্ ব্যবহার করে বেশি আলো দেয়ার পেছনে এর গঠনগত পার্থক্যও আছে। বিদ্যুত্ সাশ্রয়ী বাতি মূলত ঘনীভূত গ্যাস ভর্তি একটি কাঁচের নল। এই কাঁচের নল আলোর বিকিরণ গ্রহণ করে তা আবার আলোরূপে ফিরিয়ে দেয়। এর কারণে কাঁচের নলটি যে পরিমাণ আলো উত্পন্ন করে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আলো পাওয়া যায়। কাঁচের নলটির মধ্যে থাকে ইলেকট্রনিক্স ব্যালাস্ট এবং নলটি পারদ বাষ্পে পূর্ণ থাকে। গঠনগত দিক থেকেও বিদ্যুত্ সাশ্রয়ী বাতি সাধারণ বাল্ব থেকে ভিন্ন। যখন বৈদ্যুতিক সুইচ অন করা হয় তখন ব্যালাস্ট থেকে গ্যাসের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি প্রবাহিত হয়ে ইলেকট্রিক্যাল তড়িত্ প্রবাহের রূপ ধারণ করে এবং এটি আল্ট্রাভায়োলেট বা অতি বেগুনি রশ্মি শোষণ করে। এই রশ্মি টিউবের ভেতর থেকে সাদা ফসফরাসকে উত্তেজিত করে এবং কাঁচের গায়ে লেপা কোটিং থেকে তা দৃশ্যমান আলোতে পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সিএফএল বাল্ব থেকে প্রচুর পরিমাণে মার্কারি (পারদ) জাতীয় পদার্থ, অতিবেগুনি রশ্মি এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি নির্গত হয়। মার্কারির সংস্পর্শেই সিএফএলের মধ্যে রাখা ফসফরাস জ্বলজ্বল করে প্রচুর পরিমাণে আলো তৈরি করে। তবে যখনই মার্কারির মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত্ প্রবাহিত হয়, শুরু হয় অতিবেগুনি রশ্মি বিচ্ছুরণ। এর পরিমাণ বেশি হলেই মানবদেহের ক্ষতি অবধারিত। মার্কারি এক ধরনের শক্তিশালী ‘নিউরোটক্সিন’ যা মানুষের ত্বক, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত হানে। মাইগ্রেন, চর্মরোগে আক্রান্ত যারা এবং মৃগীরোগীরা সিএফএলের প্রভাবে আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। বড়দের তুলনায় শিশু এবং সন্তানসম্ভবা মায়েদের উপর সিএফএলের প্রতিক্রিয়া আরও ক্ষতিকর। সিএফএলের আলোয় বিপন্ন হতে পারে শহরের শৈশব। শুধু তাই নয়, এ ধরনের বাল্ব নষ্ট হওয়ার পরেও তা থেকে মার্কারি নির্গত হতে পারে। তাই অব্যবহূত সিএফএল বাল্ব বিনষ্ট করার ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন জরুরি।
সিএফএলের প্রভাবে কী ধরনের রোগের শিকার হতে হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ গত জুনে ইউরোপীয় সায়েন্স জার্নাল ‘ফটোকেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফটো বায়োলজি’-র একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিএফএল থেকে চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। কারণ, অতিবেগুনি রশ্মি। এমনিতেই আমাদের মতো দেশে দিনের বেলায় সূর্যের আলো থেকে প্রচুর পরিমাণ অতিবেগুনি রশ্মি নির্গত হয়। এর পর রাতেও যদি এই রশ্মি মানুষের শরীরে ঢোকে, তাতে বিপদ ঘটতে পারে। সে জন্য আমরাও রোগীদের রাতে ‘সান্স ক্রিম’ মেখে বেরোতে হতে পারে। ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি বটে।
আসলে সব জিনিসেরই ভালোমন্দ থাকে। এ ব্যাপারে সতর্কতাগুলো উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে না। যদিও নিয়ম মেনে সিএফএল ব্যবহার করলে বিপদ অনেক কম। এক্ষেত্রে দেখতে হবে, সিএফএল বাল্বে ফসফরাসের আবরণ সঠিক মাত্রায় আছে কি না। সেই সঙ্গে সিএফএল থেকে সব সময় দূরত্ব বজায় রাখাও উচিত। আরও কিছু সতর্কতা পাঠকদের খেয়াল রাখা দরকার। যেমন: ১. সিএফএল লাগানো এবং খোলার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা। ২. ‘লো ইউভি’ লেখা সিএফএল ব্যবহার করা। ৩. সিএফএলের ওপর কাঁচ, প্লাস্টিক অথবা ফ্যাব্রিকের ঢাকনা লাগানো। ৪. সিএফএল থেকে সব সময় তিন থেকে চার ফুট দূরত্ব বজায় রাখা। এবং ৫. সিএফএল বাল্ব ভেঙে গেলে সাবধানে নষ্ট করা।
২০১০ সালে বিদ্যুত্ সাশ্রয় করার লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ সিএফএল বাল্ব বিতরণ করা হয়েছিল। এমনও অভিযোগ ছিল যে সেসব বাল্বের অধিকাংশ নিম্নমানের। প্রকৃতপক্ষে সিএফএল বাল্বের ভালো-মন্দ উভয় দিক পর্যালোচনা করে সরকারের উচিত সিএফএল বাল্বকে জনপ্রিয় করার কর্মসূচি পরিচালনা করা। সুতরাং সিএফএল বাল্ব নিয়ে এখনই জনসচেতনতা দরকার।
লেখক : সাংবাদিক, গবেষক
