বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কাছে গিয়ে কি বলেন আর রাষ্ট্রপতি প্রত্যুত্তরে কি বক্তব্য দেন, তা শোনার জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল দেশবাসী। আলোচনা শেষ হবার সাথে সাথেই সাংবাদিকদের কাছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মীর্জা ফকরুল ইসলামের বক্তব্য থেকে জানা গেলো, বিরোধীদলীয় নেত্রী চলমান সংকট নিরসনে সংলাপ ও সমঝোতার উদ্যোগ নিতে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছেন। একই সাথে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, দু’দলকেই আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের কাছে তিনি বিরোধী দলের দাবি পৌঁছে দিবেন। সংসদীয় গণতন্ত্র তথা সংবিধানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির যে অবস্থান, তাতে সরকারের কাছে বিরোধী দলের দাবি পৌঁছে দেয়া ছাড়া রাষ্ট্রপতির আর কিছুই করার থাকে না। দেশের জটিল এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি পদকে দল ও মতের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে খুবই বিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা নিয়ে অভিভাবক হিসাবে তিনি কার্যত দু’দলের হাতেই সংলাপ ও সমঝোতার দায়িত্বভার ছেড়ে দিয়েছেন।
এই যথার্থ অবস্থান গ্রহণের জন্য দেশবাসী নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে অভিনন্দন জানাবে। তবে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি নিয়ে গেলেন কেন তা আলোচনা-সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এটা দেশবাসী সকলেরই জানা আছে যে, ঘোষিত আল্টিমেটামের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রীর কাছে সংলাপ ও সমঝোতার জন্য টেলিফোন করেছিলেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। অবশ্য একেবারে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এটাও বলা যায় না। ওই টেলিফোনের সূত্র ধরে পরে বিএনপি নেত্রী সদল বলে গণভবনের আমন্ত্রণে অবশ্যই যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। প্রসঙ্গত তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বলেছিলেন, সংগ্রাম ও সংলাপ একসাথে চলবে। এতদসত্ত্বেও দেখা গেলো, সংলাপের আহ্বান যখন এলো তখন তিনি সংলাপের চাইতেও সংগ্রামকেই প্রাধান্য দিলেন। প্রধানমন্ত্রী হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ তিনি মানেননি। ভাল কথা, মানবেন কেন! তবে হরতালের মধ্যেই তো তিনি সংলাপে যেতে পারতেন। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই বয়সে হরতালের মধ্যে গাড়িতে চড়ে যদি গণভবনে যেতেন, তবে এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো। কেউ কি বলতেন তিনি হরতাল ভঙ্গ করেছেন, বরং দেশবাসী খুশি হতো। খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ জানাতো। অবশ্য এমনটা না করেও তিনি যদি তারিখ সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে বলতেন, আমি ওই তারিখে আসবো, তবে প্রধানমন্ত্রী কি সেই তারিখ প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন! কিন্তু সেই পথে তিনি যাননি। একটু খেয়াল করলেই লক্ষ্য করা যাবে, ইতিপূর্বেও সংলাপ ও সমঝোতার কোনো সুযোগই তিনি গ্রহণ করেননি। এটা কারোরই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সংলাপ ও সমঝোতার জন্য সংসদই সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। বিগত নির্বাচনের আগে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিরোধী দলে গেলেও তিনি সংসদে যথাযোগ্য ভূমিকা নিবেন। সেই অঙ্গীকার তিনি আগেও রাখেননি, এখন দুর্যোগের মুহূর্তে যখন রাস্তায় মানুষ মরছে, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ হচ্ছে, তখনও রাখছেন না। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী যখন সংবিধান সংশোধন করার বাধ্যবাধকতা ছিল এবং বিএনপি নেত্রীই যখন বলে বলে মাঠ গরম করছিলেন, দেশে সংবিধান নেই ইত্যাদি ইত্যাদি; তখন সরকারি দল বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটি ও সংসদে যোগদান করে মতামত প্রদানে বার বার আহ্বান জানালেও এর কর্ণপাত করা হয়নি। বিএনপি নেত্রীর পূর্বাপর কৌশল পর্যবেক্ষণে এটা বলা যায় যে, সংলাপ ও সমঝোতার বিষয়কে তিনি একেবারেই পাত্তা দেননি। তিনি ভেবেছিলেন, নির্বাচনের আগে আন্দোলন করে বাধ্য করবেন সরকারকে তার দাবি মেনে নিতে। ঠিক যেমন ১৯৯৬ সালের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করেছিল সরকারি দল বিএনপিকে। বিএনপি নেত্রী ‘আপোষহীন’ থেকে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করে নির্বাচনে বিজয়ের আগেই বিজয় মিছিল বের করতে চেয়েছিলেন। তাই সংলাপের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি না করে বাধ্য করানোর রাজনীতির কৌশলের মধ্যেই ছিলেন খালেদা জিয়া। যদি তা না হতো তবে প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন পাবার পর কিংবা হরতাল শেষ হবার পর টেলিফোন করে আমন্ত্রণের সময় ঠিক করে নিতে পারতেন। কারণ প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা বরাবরই বলে যাচ্ছিলেন, সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ এখনও বহাল রয়েছে। ১৯ নভেম্বর বরগুনার জনসভায়ও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘গণভবনে আসুন। আমরা আলোচনা করে ফয়সালা করি।’ প্রকৃত বিচারে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া তার দলের শক্তি সম্পর্কে বেশ বাড়তি একটি ধারণা করে রেখেছিলেন। নিশ্চিত হয়ে আরো ভেবেছিলেন যে, জামায়াত যেহেতু আছে আর হেফাজতকে যেহেতু নামানো যাবে, তাই সরকারকে বাধ্য করার মতো সংগ্রামের জোয়ার সৃষ্টি করা কঠিন হবে না। কিন্তু এটাই সত্য যে, তার দলের নামী দামী নেতারা রাস্তায় কেউ নামেননি। আরো লক্ষণীয় যে, ককটেল মারা ও আগুন দেয়ার ক্যাডার ছাড়া রাজধানীর (মফস্বলের নামমাত্র কিছু স্থানে ছাড়া) রাস্তায় তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও নামেনি। আর আন্দোলনে মাঠে না নেমেই জোরগলায় সাংবাদিকদের বলেছেন, গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেছে। বস্তুতপক্ষে আওয়ামী লীগকে বাধ্য করতে গিয়ে বিএনপিই এখন বাধ্যবাধকতার ফাঁদে পড়ে গেছে।
সংবিধান অনুযায়ী বিরাজমান সংকট সমাধান বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কিছুই করার নেই। তাই দাবিটি তিনি সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিবেন বলেছেন। এখানে প্রশ্ন হলো এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির কি কোনো ভূমিকা নেয়া সংবিধানসম্মত। নিশ্চয়ই নয়। কারণ জটিল রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো দলের পক্ষে তিনি কাজ বা কথা বলতে যাবেন কেন? বিতর্কিত হতে পারেন এমন কোনো কাজে যাওয়া বা মুখ খোলা রাষ্ট্রপতির জন্য সংবিধানসম্মত নয়। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, যারা নিজেদের নিরপেক্ষ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত হতে আগ্রহী, তাদেরও কেউ কেউ বিরোধীদলকে রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে দাবি পেশ করতে উত্সাহিত করেছেন। এখন যদি বলা হয়, বিতর্কিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত্ করতে গেছে, তবে কি ভুল বলা হবে! আর বিদ্যমান অবস্থায় জামায়াত প্রতিনিধিকে সাথে নিয়ে যাওয়াটা ‘মুক্তিযোদ্ধার দল’ বিএনপির কতটা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে তাও ভাবতে হবে। এটা বিএনপি নেত্রীর অনুধাবন করতে হবে যে, বর্তমান অবস্থায় জামায়াত নিয়ে পড়ে থাকার জের নিয়ে বিন্দুমাত্র অগ্রসর হওয়া যাবে না। কারণ জামায়াত আদৌ খড়কুটা নয়, সন্ত্রাসী দল বিশেষ!
দেশবাসী এখনও মনে করে যদি সংলাপ ও সমঝোতার আদৌ কোনো ইচ্ছা বিএনপির থাকে, তবে জামায়াত ছেড়ে গণভবনে আমন্ত্রণে যেতে চেয়ে সোজাসুজি প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করতে পারে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী যেখানে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং আমন্ত্রণও অব্যাহত আছে, সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো মন্ত্রী-নেতার কাছে সংলাপ-সমঝোতার জন্য টেলিফোন করা সৌজন্য ও ভদ্রতার পরিচায়ক নয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সাক্ষাতের মাধ্যমেই শেষ করতে হবে। আর সংসদে যখন বিএনপি নেতা এম. কে আনোয়ার বলেই দিয়েছেন, সরকার প্রধান প্রশ্ন সমাধান হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, তখন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়া বা হরতালের বেড়াজালে দেশকে ফেলার অর্থ কি? প্রধানমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে তিনি প্রস্তুত। বিএনপি ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া যদি বুঝে থাকেন আন্দোলন দিয়ে বাধ্য করা তার দলের কর্ম নয়, তবে সরাসরি আওয়ামী লীগ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পথে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়।
কোনো দলের বিশেষত বিএনপির জন্য এখন জেদ ধরার অবকাশ নেই। কারণ নির্বাচন না করে বিএনপি কি করবে! বিএনপি কি বিপ্লবী পার্টি যে সরকারকে উত্খাত করে ক্ষমতা দখল করবে? নাকি নির্বাচিত ও সাংবিধানিক সরকারকে আদৌ উত্খাত করা সম্ভব! অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় কেউ আসলে তার জন্য সংবিধান মোতাবেক কোন শাস্তি রয়েছে, তাকি জানে না বিএনপি! প্রকৃত বিচারে এখন এই সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দেশপ্রেমিক কর্তব্য। নির্বাচন হতেই হবে। আর নির্বাচনে জনগণ উত্সব হিসাবে নামবেই। আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোট বিরোধী বাক্স থাকলে পড়বেই। নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হলে নিজ দলের প্রার্থী সকলকে কি বিএনপি ধরে রাখতে আদৌ পারবে! জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের হয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানের পর শেষ পর্যন্ত বিএনপি বাদে আর সব দলই নির্বাচনে যোগ দিবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আর্মি নামানোর যে দাবি বিএনপির ছিল, সেই দাবি কার্যকর করতে নির্বাচন কমিশন গেছে রাষ্ট্রপতির কাছে। এতে আর্মি নির্বাচনে নামবে বলেই ধারণা করা চলে। অর্থাত্ নির্বাচনে ভোট চুরি-ডাকাতি বা মিডিয়া ক্যু করার কোনো উপায় নেই। আর এবারে এত বিতর্কের পর সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেয়ার পর যদি ভোট চুরি ডাকাতি হয়, তবে আওয়ামী লীগের সর্বনাশ ও ভরাডুবি হবে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি থাকবে বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে। দেশের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম। তাই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিশেষভাবে বিএনপির গণতান্ত্রিক দল হিসাবে টিকে থাকার স্বার্থে জামায়াতকে বাদ ও প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সংলাপ-সমঝোতায় গিয়ে বিএনপি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হোক, এটাই জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে দেশবাসীর একান্ত কামনা।
[লেখক: রাজনীতিক]
