‘কভু আশী বিষে দংশেনি যারে’

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪৯
সকল প্রকার যন্ত্রণার অনুভূতি কথ্য বা লেখ্যরূপে প্রকাশ করা সম্ভব নহে। যেমন—সর্পবিষের দংশন-জ্বালা। কবি যেমন বলিয়াছেন—‘কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে কভু আশী বিষে দংশেনি যারে।’ কবিরা হয়তো আগুনে শরীরের বৃহত্ অংশের দগ্ধ হইবার জ্বালা কখনও তেমনভাবে পান নাই। নইলে এই তালিকায় সর্পবিষের সহিত অগ্নিদগ্ধের অবর্ণনীয় জ্বালার নাম থাকিত হয়ত। নানা কারণে মানুষ আগুনের লেলিহান শিখার গ্রাসে পড়েন। তাহা কখনও দুর্ঘটনার, কখনও দুর্যোগের। সেই দুর্যোগ মনুষ্যসৃষ্টই অধিক। আর যাহারা কবিতা বোঝেন না, কবিতা যাহাদের পেটের তাপের খবর খুব সামান্যই রাখে, সেই খেটে খাওয়া দীনদরিদ্র মানুষই অধিক পরিণত হন এই আগুনের লকলকে শিখার গ্রাসে। সেই সকল কিছু দৃশ্য যদি ক্যামেরাবন্দি হয়, তবে আমাদের স্বাভাবিক চিত্তে চাঞ্চল্য না আসিয়া পারে না। পত্র-পত্রিকায় গত কয়েক মাসে এই বীভত্সতা ও তত্পরবর্তী দুর্ভোগের কথা আমাদের হূদয়কে আর্দ্র করিয়া তোলে। ছোট্ট শিশু মুনিয়ার কথাই ধরা যাক। আগুনে ঝলসে গিয়াছে তাহার পিঠ-বুকসহ সারা শরীরের ২৬ শতাংশ। চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষ্যে—কাহারও শরীরের ১২ হইতে ১৫ শতাংশ পুড়িয়া গেলেই সেই ক্ষত বিপজ্জনক হইয়া যায়। চামড়া মানুষের শরীরের সর্ববৃহত্ অঙ্গ, যাহার সুষম কার্যকারিতার সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত দেহযন্ত্রের ছন্দ। তীব্র যন্ত্রণায় মুনিয়া এক্ষণে ছটফট করিতেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে। ঝলসে যাওয়া হাত-পা ও পিঠে চামড়া প্রতিস্থাপন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। মুনিয়ার জীবন বাঁচাইতে আকুল তাহার পরিবার এখন অবধি ৪০ হাজার টাকা খরচ করিবার পর এক্ষণে অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র কিনিতে পারিতেছে না। একই অবস্থা শিশু শিমুল ও আল-আমীনেরও। এই তিন শিশুসহ ১৬ জন ভর্তি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে। মনুষ্যসৃষ্ট বহ্নিশিখা তাহাদের চামড়া শুধু ছাই করে নাই, তছথছ করিয়া দিয়াছে তাহাদের পরিবারকেও। এই সকল শিশুর বাহিরে খেটে খাওয়া অনেক মানুষ এই ইউনিটে ভর্তি রহিয়াছে, যাহাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের মানুষটি ছিল সে। এখন সেই পরিবারে আয় নাই, খাবার নাই, তাহার সহিত আগুনে পোড়া শরীর নিরাময়ের পর্যাপ্ত চিকিত্সাও নাই। ড্রেসিংয়ের গজসহ প্রায় সবকিছুই নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করিয়া ক্রয় করিতে হয়। কারণ হাসপাতাল হইতে প্রয়োজনীয় সব ঔষধপত্র সরবরাহ করা কখনও সম্ভব নয় বলিয়া অবহিত করিয়াছেন সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকরা। কেননা, পুড়িয়া যাওয়া আহতদের বেশির ভাগ ঔষধই বাহির হইতে কিনিয়া আনিতে হয়। অথচ তাহাদের এই চিকিত্সা যুগপত্ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। অধিক বিপদের কথা হইল, সমপ্রতি অগ্নিদগ্ধ অধিকাংশ মানুষের শরীর পুড়িয়াছে ৩০ হইতে ৪০ শতাংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও অধিক, এমন কি ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। সেই সময় মৃত্যুযন্ত্রণা এতটাই তীব্র হয় যে, নিষ্ঠুর বাস্তবতা হইল—একমাত্র মৃত্যুই তাহাদের যন্ত্রণার অবসান ঘটাইতে পারে, যেমনটি ঘটিয়াছিল গাজীপুরের মনিরের ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা গিয়াছে নাসিমা বেগম, আবুল কাশেম, মোস্তাফিজুর রহমান, মুকুল মিয়া, মন্টু পাল, আসাদ গাজীসহ অসংখ্য মানুষ। এক্ষণে রুবিনা বেগম ও ছোট্ট সুমি মৃত্যুযন্ত্রণায় কাঁদিতেছে হাসপাতের শয্যাশায়ী হইয়া। তাহাদের বিদেশে নিয়া যথাযথ চিকিত্সা করানো সম্ভব হইলেই আরোগ্য আসিতে পারে দ্রুত। তাহার বিপরীতে দিন দিন ক্ষতগুলি শরীরে দাবিয়া যাইতেছে, পুঁজ-রক্ত ঝরিতেছে। কোনোমতে ক্ষতস্থানের ড্রেসিংই তাহাদের চিকিত্সার ভবিতব্য এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া। আগুন আবিষ্কার মানব সভ্যতাকে এক লাফে বহু দূর আগাইয়া দিয়াছিল। বিদ্যুত্ কিংবা বারুদের আবিষ্কারও সভ্যতার জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। এইগুলির ব্যবহার ইতর প্রাণীরা কল্পনাও করিতে পারে না। কিন্তু ইহার অপব্যবহারও আমাদের ইতর প্রাণীর স্তরে নামাইয়া দেয়। তবে সকলের জন্য শিক্ষার হইল, আগুন লইয়া খেলা কাহারও জন্য শুভ নহে। কেননা আগুনের উত্তাপ ভালো মন্দ চেনে না। তাহাকে নিয়মমতো ব্যবহার না করিলে সে শুধু ধ্বংসই করিতে জানে। ২০১০ সালে নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর সরকার বার্ন ইউনিট উন্নয়নের পরিকল্পনা করিয়াছিলেন। আরও পূর্বে পরিকল্পনা ছিল, ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটকে রাজস্ব খাতের অন্তর্ভুক্ত করিয়া একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, যাহা একদিন হইয়া উঠিবে পোড়া রোগীদের চিকিত্সা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একটি সেন্টার অব এক্সেলেন্স। কিন্তু ১০ বত্সরেও ইহাকে রাজস্ব খাতে নেওয়া হয় নাই। গুরুত্ব বিবেচনায় এক্ষণে তাহা পুনরায় ভাবিয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন