অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছে

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৫৯
ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। শক্তিশালী হচ্ছে অর্থনীতির ভিত্তি। প্রাতিষ্ঠানিকীকরণও ত্বরান্বিত হচ্ছে। পাশাপাশি খানাভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আঞ্চলিক বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। বিভাগীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেক পার্থক্য রয়েছে। রাতারাতি এ বৈষম্য দূর হয়ে যাবে তা নয়। তবে ধীরে ধীরে এ বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে কম অর্থনৈতিক ইউনিট (অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একক) সিলেট বিভাগে। আর এদিক থেকে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ। তবে অর্থনৈতিক ইউনিট কম বলে সিলেট বিভাগ উন্নয়নের বাইরে বা এ অঞ্চলে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছে না, তেমনটি ভাবা যাবে না। কারণ অর্থনৈতিক ইউনিটের ক্ষেত্রে ওই বিভাগের জনসংখ্যাও বিবেচনা করতে হবে। সেদিক থেকে ঢাকা এগিয়ে গেছে জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে। ১৯৮৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকায় স্থায়ীভাবে অর্থনৈতিক ইউনিটও বেড়েছে। এসব তথ্য পাওয়া গেছে অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ থেকে। তথ্যে দেখা যায়, গত দশকে অর্থনৈতিক ইউনিট দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান শুমারিকালীন সময়ে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ৭০৪টি, যা ২০০১ ও ২০০৩ এর শুমারিতে ছিল ৩৭ লাখ ৮ হাজার ১৪৪টি এবং ১৯৮৬ সালের শুমারিতে ছিল ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৪১৯টি। ১৯৮৬ সাল হতে ২০০১ ও ২০০৩ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক ইউনিটের বৃদ্ধির হার ছিল ৭১ শতাংশ এবং ২০০১ ও ২০০৩ সাল হতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক ইউনিটের বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ। নতুন নতুন খাত যুক্ত হওয়ায় এবার শতকরা হার অনেক বেড়েছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ইউনিট বাড়ার হার যে বেড়েছে এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। আঞ্চলিক বৈষম্য: বিভাগীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ইউনিট পরিলক্ষিত হয়েছে ঢাকা বিভাগে (২৫,৯৯,৩৭২), তারপর চট্টগ্রাম বিভাগ (১৩,৮৪,৭৫৭), রাজশাহী বিভাগ (১২,১৭,৬৩৩), রংপুর বিভাগ (১০,৮৮,২৫৫), খুলনা বিভাগ (১০,৩৪,৫৮১) এবং বরিশাল বিভাগ (৩,৮৫,২৩৩)। আর সবচেয়ে কম ইউনিট পরিলক্ষিত হয়েছে সিলেট বিভাগে (৩,৬৫,৮৭৩)। আঞ্চলিক পর্যায়ে ব্যবসা ও শিল্পায়ন: শুমারিতে ব্যবসা ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৯৮৬ সাল হতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ইউনিট বেড়েছে শক্তিশালী প্রবণতায়। সেই সঙ্গে স্থায়ীভাবে অর্থনৈতিক ইউনিটও সর্বোচ্চ সংখ্যায় দাঁড়িয়েছে। এ সংখ্যা ১৯৮৬ সালে ছিল ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৭৯৯ টি, যা ২০০১ ও ২০০৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩৮। আর ২০১৩ সালে দাঁড়িয়েছে ২৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৩। উল্লেখ্য, বিভাগওয়ারি অঞ্চল ভেদে অর্থনৈতিক ইউনিটের বৃদ্ধির হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। যেমন, ঢাকা বিভাগে ১৯৮৬ সালে ৩১ শতাংশ এবং ২০০১ ও ২০০৩ এবং ২০১৩ সালে উভয় ক্ষেত্রেই ৩২ শতাংশ বেড়েছে ইউনিটের সংখ্যা। অন্যদিকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সময়ের ব্যবধানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮৬ সালে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৬১ হাজার ৯৪৯ টি যা ২০০১ ও ২০০৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৯ লাখ ৯১ হাজার ২৩৮টি এবং ২০১৩ সালে হয়েছে ৪৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬১৬ টি। খানাভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার: খানাভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গত দশকে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসম্পন্ন খানার সংখ্যা ২০১৩ সালে ৩০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৮, যা ২০০১ ও ২০০৩ সালে ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৫ এবং ১৯৮৬ সালে ছিল ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪২৯। ২০০১ ও ২০০৩ সালের চেয়ে ২০১৩ সালে পল্লী এলাকায় শহর এলাকার তুলনায় খানাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ হার পল্লী এলাকায় ১৫০ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ৬২ দশমিক ৯০ শতাংশ। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, পল্লী এলাকায় খানাভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই দশকে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮৬ সালে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৬১ হাজার ৯৪৯। যা ২০১১ ও ২০০৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ২৯ লাখ ৯১ হাজার ২৩৮টি এবং ২০১৩ সালে ৪৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬১৬ হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, গত দশ বছরে (২০০৩ থেকে ২০১৩) স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭৮। যা গত সতের (১৯৮৬ থেকে ২০০৩) বছরের তুলনায় বেশি। সতের বছরে বৃদ্ধি পেয়েছিল ১৪ লাখ ২৯ হাজার ২৮৯। অর্থাত্ বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি স্থায়ী রূপ পেতে চলেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিকশিত করেছে: অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩-এর প্রাথমিক ফলাফল হতে দেখা যায় যে, ২০০১ ও ২০০৩ সালে চেয়ে ২০১৩ সালে পল্লী এলাকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শহর এলাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এ হার পল্লী এলাকায় দেড়শ’ ভাগ। আর শহর এলাকায় ৬৩ শতাংশ। এটা উত্সাহব্যঞ্জক যে, এক সময়ের দারিদ্র্যপীড়িত রংপুর বিভাগ এখন ব্যাষ্টিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বাস্তব প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এ বিভাগে ১৯৮৬ সালে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ১৩৫। যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০১ ও ২০০৩ সালে ৪ লাখ ৫ হাজার ৮৫৩ তে দাঁড়িয়েছে। আর ২০১৩ সালে হয়েছে ১০ লাখ ৮৮ হাজার ২৫৫। অর্থনৈতিক ইউনিটের বৃদ্ধিতে সেবা খাতের ভূমিকা: অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ এর প্রাথমিক ফলাফল হতে দেখা যায় যে, সেবা খাতের কার্যক্রম যেমন মোটর গাড়ি এবং মোটর সাইকেল মেরামতসহ খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা সর্বোচ্চ ৪৬ শতাংশ স্থান দখল করে আছে। পরিবহন এবং মজুদ ১৩.৬৫ শতাংশ। আর উত্পাদন ১১.৭৬ শতাংশ এবং অন্যান্য সেবা কার্যক্রম ৮.৪৮ শতাংশ। অধিকাংশ উপখাতের অংশ ৫ শতাংশের নিচে। এবং কিছু উপখাত শতকরা ১ ভাগেরও নিচে।