পেঁয়াজ এবং রাজনীতির ঝাঁঝ!

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১১
পেঁয়াজ এবং রাজনীতি। দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একটির সঙ্গে অন্যটির আপাত কোনো সম্পর্ক নেই। পারস্পরিক সম্পর্কহীন এই দু’টি জিনিসেরই ঝাঁঝ হঠাত্ ভীষণ বেড়ে গিয়েছিল। অবশ্য একটির ঝাঁঝ এখনো বলবত্ আছে। একটির ঝাঁঝে দেশবাসীর চোখের পানি নাকের পানি এক হওয়ার উপক্রম। রাজনীতি প্রসঙ্গে পরে আসছি, প্রথমেই আসা যাক পেঁয়াজের কথায়। পেঁয়াজ জিনিসটা একটা আজব চিড়িয়া। পেঁয়াজ একদিকে মসলা, অন্যদিকে সবজি। কাঁচাও খাওয়া যায়, আবার রান্না করেও খাওয়া যায়। ভাজি-ভর্তা-ঝোল সবখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সব দলের কাছে ব্যবসায়ীরা যেমন বিশেষ মর্যাদা পায়, ঠিক তেমনি ধনী-গরিব সবার কাছেই পেঁয়াজ বিশেষ মর্যাদা পায়। পেঁয়াজের চেহারা সাইজ-স্বাদ—সবকিছুই আলাদা রকম। এর কাণ্ড,পাতা-ফুল-ফল সবটাই প্রায় প্রকাশিত। এর শিকড় পর্যন্ত দেখা যায়। ঠিক বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মত, যতটা না জ্ঞানের গভীরতা, তার চেয়ে বকবকানি অনেক বেশি। সব বাঙালির যেমন মোটামুটি একই রকম চেহারা-চরিত্র, সব দেশি পেঁয়াজেরই ঠিক একই রকম কোয়া এবং ঝাঁঝ! সব ঋতুতেই পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। তবে রমজান মাসে এবং ঈদুল আযহার সময় এর চাহিদাটা একটু বেশি হয়। রমজানে পেঁয়াজু এবং ঈদুল আযহায় গরুর মাংসের সঙ্গে পেঁয়াজ বেশি লাগে বলে এই দুই সময়ে এর চাহিদা বাড়ে। আমাদের দেশে নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা হলেও গুরুত্বপূর্ণ খাবার-উপাদান পেঁয়াজ নিয়ে তেমন কোনো গবেষণাকর্ম নেই। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পেঁয়াজের উত্পত্তি পাকিস্তানের কোনো এক এলাকায়। তবে কারো কারো মতে- ইরান কিংবা মেক্সিকো পেঁয়াজের উত্পত্তিস্থল। মিসরের পিরামিডের আশপাশে পেঁয়াজের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এছাড়া মিসরের পৌরাণিক কাহিনীতে পেঁয়াজের উল্লেখ আছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ এবং ডাচরাই আমাদের দেশে পেঁয়াজ নিয়ে আসে বলে অনেকে অনুমান করেন। ১৪০০-১৫০০ সালে আমাদের দেশে পেঁয়াজ আসে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পেঁয়াজ পাওয়া যায়। তবে এদের মধ্যে তুরস্ক, মিসর, স্পেন, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের নাম উল্লেখযোগ্য। বাঙালি সমাজে কবে প্রথম পেঁয়াজ খাওয়া শুরু হয়—এ ব্যাপারেও বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ভাসা ভাসা যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, বৈষ্ণব ও ব্রাহ্মণরা সাধারণত পেঁয়াজ খেত না। পেঁয়াজ খেলে মানুষের ‘তেজ’ বাড়ে—এমন একটা ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। তাইতো হিন্দু বিধবা কিংবা সন্ন্যাসীরা নিরামিষ খায়। নিরামিষে পেঁয়াজ নিষিদ্ধ। পেঁয়াজকে আমিষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের বিকাশ ঘটেছে বলে অনেক পেঁয়াজবিদ মনে করেন। ব্যাপারটিকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। মাংসপ্রিয় মুসলিম শাসকদের হাত ধরে এই বাংলামুলুক এমন পেঁয়াজময় হওয়াটা মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। এখন দুঃখ-দারিদ্র্য-অভাব-অনটন-কলহের মতো বাঙালির জীবনে পেঁয়াজ অনিবার্য হয়ে উঠছে। পেঁয়াজ ছাড়া রান্নাঘর চিন্তা করা যায় না। পেঁয়াজ খাওয়া এখন বাঙালির অভ্যাস হয়ে গেছে। যে পদে না দিলেও চলে, সেখানেও পেঁয়াজ দেয়া হয়, আর যেখানে পেঁয়াজের দাবি আছে, সেখানে তো দেয়া হবেই। অভ্যাস বশেই এখন রান্নায় কম-বেশি পেঁয়াজ দেয়া হয়। এ কারণে পেঁয়াজের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে। পেঁয়াজের প্রতি এই আকর্ষণ যদি অব্যাহত থাকে, আর দাম যদি না কমে, তা হলে পেঁয়াজ কিনতে কিনতেই গোটা জাতি ফতুর হয়ে যাবে। পেঁয়াজ আকস্মিকই হিট-নায়িকাদের মতো আলোচিত হয়ে উঠেছে। কারণ এর দাম। দশ-বিশ টাকার পেঁয়াজ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে দৃঢ়পদে আরও সামনে এগিয়ে গিয়েছিল, অবশ্যই এখন আবার নিম্নে চলে গেছে। গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক সংঘাতের পাল্লা দিয়ে পেঁয়াজ নিয়েও অনেক কাহিনী সৃষ্টি হয়েছিল। কখনও সরবরাহ ঘাটতি, কখনও চাহিদা বৃদ্ধি, আবার কখনও আমদানি-মূল্য বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম দফায় দফায় বেড়েছিল। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও অনেক ঘাম ঝরিয়েছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে পেঁয়াজের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে। ফলে আবার হঠাত্ তার ঝাঁঝ কমে গেছে। বিষয়টি রাজনৈতিক সংঘাতের মতো। এই কমে আবার বাড়ে। তবে পিঁয়াজের দাম কমলেও রাজনৈতিক সংঘাত কিন্তু কমেনি বরং দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই পেঁয়াজের গুণের কথা লেখা হয়। তার মধ্যে রয়েছে—ঠাণ্ডা লেগে মাথাব্যথা হলে ১ চামচ পেঁয়াজের রসের সাথে দ্বিগুণ পানি মিশিয়ে একবার খেলে ব্যথা কমে যাবে। জ্বর জ্বর ভাব হলে পেঁয়াজের রস নাক দিয়ে টেনে নিলে জ্বর জ্বর ভাব চলে যাবে। বার বার বমি হলে চার-পাঁচ ফোঁটা পেঁয়াজের রস পানিতে মিশিয়ে সেই পানি খেলে বমি হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। হেঁচকি উঠলে পেঁয়াজের রস মিশানো পানি খেলে হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে। পেঁয়াজ খেলে শরীরের অতিরিক্ত ইউরিক এসিড বের হয়ে যায়। পেঁয়াজের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বা ব্যাকটেরিয়া নামক গুণাগুণ রয়েছে। তাই ফোঁড়া বা ঘা হলে তা পেঁয়াজের রস দিয়ে ধুলে তাড়াতাড়ি সেরে যায়। চুল ধোবার আগে মাথায় আধঘন্টা পেঁয়াজের রস মেখে রাখলে চুলের গোড়া শক্ত হয় এবং নতুন চুল গজাতে সহায়তা করে। বাত-ব্যথার রোগীরা নিয়মিত পেঁয়াজ খেলে ব্যথা কম থাকে। এমনি পেঁয়াজের আরও নানা গুণের কথা শোনা যায়। এত যার গুণ সেই পেঁয়াজের দাম বাড়বে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে—এ আর বিচিত্র কী! পেঁয়াজের দাম বাড়ুক বা কমুক, এর ঝাঁঝ জাতির চোখকে যতই আচ্ছন্ন করুক, তাতে আমাদের অবশ্য তেমন কিছু যায় আসে না। কারণ মানুষ পেঁয়াজ ছাড়াও বাঁচে, বাঁচতে পারে। কিন্তু আমরা বর্তমানে রাজনীতির সীমাহীন ‘ঝাঁঝে’ দিশেহারা। রাজনীতি আমাদের ভাগ্য-নিয়ন্তা। এই রাজনীতিতে যদি স্থিতি না আসে, সংঘাত-সংঘর্ষ যদি বন্ধ না হয়, তাহলে কে কখন কোথায় বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকবে, কে জানে? কাজেই পেঁয়াজের ঝাঁঝের চেয়ে দেশের মানুষ আপাতত বেশি বিচলিত রাজনীতির ভবিষ্যত্ নিয়ে। প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সংঘাতে জর্জরিত দেশে আসলে কী হতে যাচ্ছে, আর কী হবে—তা কেউ ঠাহর করতে পারছে না। আমাদের নিজস্ব ঝগড়া-কলহ আমরা নিজেরা মিটমাট করতে পারছি না। ফলে বাইরের অতিথিরা উড়ে আসছেন ঝগড়া মেটাতে। কিন্তু তারাও খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না। পারবেন কী করে, আমাদের ঝগড়াটে নেতানেত্রীরা তো শপথ করেছেন, দেশ উচ্ছন্নে যাক, কিন্তু তারা কিছুতেই ঝগড়া মেটাবেন না! সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের সঙ্গে বসলেন। কথা বললেন। সংবাদ সম্মেলন করে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলকে অবিলম্বে আলোচনায় বসার তাগিদ দিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি মেহমানদের কাছ থেকে এ ধরনের তাগিদ জাতির জন্য গৌরবজনক না হলেও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তা-ই সাদরে বরণ করে নিচ্ছেন, যদিও তা করছেন নিজেদের সুবিধামতো। আমাদের সরকার পক্ষ বিরোধীদের টুঁটি চেপে ধরার সাধনায় মশগুল। আর বিরোধী পক্ষ সরকারি দলের কাছা খুলে ফেলতে সদাতত্পর। মুখে অবশ্য কেউই নিজেদের প্রকৃত চেহারা তুলে ধরতে নারাজ। তারপরও মাঝে মাঝে মুখ ফসকে সত্যি বেরিয়ে যায়। যেমন মুখ ফসকে নির্মম এক সত্য কথা বলে ফেলেছেন বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি ছাত্রদলের এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, দু’তিনটি বাস ভাঙলেই হবে না, ছাত্রদলকে বিক্ষোভে ফেটে পড়তে হবে, রাস্তায় নেমে আসতে হবে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, হরতালে গাড়ি ভাংচুর করেছে, পুড়িয়ে মানুষ মেরেছে সরকারের এজেন্টরা। এখন ফখরুল সাহেব স্বীকার করে নিলেন যে, ছাত্রদলের ছেলেরাই গাড়ি ভাঙচুর করেছে। মির্জা ফখরুলের এমন বক্তব্য কি নৃশংসভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পরোক্ষ ইঙ্গিত নয়? এর আগে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, হরতালকারীরা হচ্ছে সন্ত্রাসী। মির্জা ফখরুল সরকার পক্ষের সেই দাবিটিকেই যেন সত্যতা দিলেন। এমন দুই দলের মধ্যে সখ্য-মৈত্রী-সহাবস্থান কী আদৌ সম্ভব? বর্তমানে সরকার পক্ষ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। বিরোধী পক্ষ নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে আন্দোলনের পথে রয়েছে। টান টান উত্তেজনা, সংঘাত। সাধারণ মানুষ মহাফাঁপর নিয়ে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করছে। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন নেই। সেই থোড়-বড়ি-খাড়া, আর খাড়া-বড়ি-থোড়! এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে পেঁয়াজসংক্রান্ত একটি পুরনো গল্প। গ্রামে একটা চোর ধরা পড়লো। গ্রামের সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিকে ডাকা হলো চোরের বিচার করার জন্য। সালিশীতে ঠিক হলো, হয় চোরকে দশটা জুতার বাড়ি খেতে হবে না হলে দশটা পেঁয়াজ খেতে হবে। তখন চোরটা বলল, জনাব, জুতা মারলে আমাকে লাগবে, আপনারা আমাকে পেঁয়াজ দেন, আমি দশটা পেঁয়াজই খাব। তখন চোরটিকে দশটা পেঁয়াজ দেয়া হলো। চোরটা সেখান থেকে একটা পেঁয়াজ নিয়ে অর্ধেক খেয়ে বলল, কী ঝাঁঝরে বাবা! আগে যদি জানতাম পেয়াজে এত ঝাঁঝ তাহলে জুতার বাড়ি বেছে নিতাম। জনাব, আমাকে জুতার বাড়ি দেন, আমি পেঁয়াজ খাবো না। তারপর চোরটিকে জুতার বাড়ি দেওয়া শুরু হলো! কিন্তু একটা জুতার বাড়ি খেয়েই চোরটা বলল, না না জুতার বাড়ি অনেক ব্যথা, আমি পেঁয়াজই খাবো। আমাকে পেঁয়াজ দেন। তখন চোরটিকে আবারও পেঁয়াজ দেওয়া হলো! পেঁয়াজ খেয়ে চোরটা বলল, না না আমাকে জুতার বাড়িই দেন, আমি পেঁয়াজ খাবো না! এরকম করতে করতে চোরটা দশটা জুতার বাড়িও খেলো আবার দশটা পেঁয়াজও শেষ করে ফেললো! আমাদের বাঙালিরও হয়েছে একই দশা। না জানি আমাদের পূর্বপুরুষেরা কি পাপ করেছিলো— যার শাস্তিস্বরূপ আমরা একবার এদলকে ক্ষমতায় এনে জুতার বাড়ি খাচ্ছি; আরেকবার ওদলকে এনে পেঁয়াজ খেয়ে যাচ্ছি! [ লেখক:কলামিষ্ট]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন