মানুষ কেন বাঁচে, কী নিয়ে বাঁচে! এ এক কঠিন প্রশ্ন। সবাই কি আসলে বাঁচে? চালু একটা কথা আছে— বাঁচার মত বাঁচা। এরই বা মানে কী? এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে অস্কার ওয়াইল্ডের বাণী। তিনি বলেন; বেঁচে থাকার বিষয়টি খুবই বিরল। অর্থাত্ খুব কম লোকই সেরকমভাবে বাঁচতে পারেন, বাঁচা যাকে বলে। বেশিরভাগই কেবল অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেন। আর রবীন্দ্র নাথের বিবেচনায় এ ধরনের বেঁচে থাকা মানে, শুধু দিন যাপনের শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি বৈ নয়। এর বিপরীত মতও অবশ্য আছে। রবার্ট ফ্রস্টের মনে প্রশ্ন জেগে ছিল, জীবন মানে কি? অনেক ভেবেচিন্তে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, এ আর কিছু নয়, কেবলই বয়ে চলা। সত্যিই কি তাই! যদি তাই হয়, তাহলে বেনো জলে ভেসে আসা কচুরিপানার সাথে মানব জীবনের পার্থক্য কোথায়! মানুষ কী স্রোতের টানে ভাটির দেশে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে পারে! সত্যিকার অর্থে যিনি বাঁচেন বা বাঁচতে চান, তিনি কখনই ভেসে যেতে পারেন না গড্ডলিকা প্রবাহে। তাঁর জীবন কাণ্ডারি বিহীন নৌকা নয়। জীবনের নৌকা একাত ওকাত হয়, হতেই পারে। তাই বলে ডুবে যাওয়া! সে তো জীবনবাদের কথা নয়। দিগন্তবিসারী মানুষ যারা, কখনও কখনও তারা ভাবেন, কত কাজ বাকী। তবে এত ছোট কেন জীবন! তবে কেন জীবন আসে কেবল একবারই। কিন্তু জীবনবাদীরা বলেন, মানুষের জীবন একটাই বটে। কিন্তু নীতির জন্য ঠিক কাজটি ঠিক সময়ে সঠিকভাবে করতে পারলে ছোট একটা জীবনই যথেষ্ট। আইনস্টাইন জীবনের তুলনা করেন বাইসাইকেলের সাথে। ভারসাম্য হারালে বাইসাইকেল ভূপতিত হয়। জীবনও তাই। অতঃপর প্রশ্ন জীবন সাইকেলের ভারসাম্য কিসে সুরক্ষিত হয়? জীবনতরির কাণ্ডারি বলবো আমরা কাকে? এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে না পেলে কেউ কোনো দিন সেই জীবন পাবে না, যে জীবন মানে সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকা, যে বাঁচার মধ্যে কোনো গ্লানি নেই। নিকুলাই অস্তোভস্কির সেই অসাধারণ কথাটি স্মরণযোগ্য এই প্রসঙ্গে। স্বল্পায়ু এই কথাশিল্পী বলেন, জীবন একটাই। কাজেই এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে কখনও অনুশোচনা করতে না হয়।
স্কুলের পাঠ্য বইয়ে পড়েছি, পড়েছেন অনেকেই নিশ্চয়ই। মানুষের যখন অর্থ-সম্পদ হারায় তখন আসলে কিছুই হারায় না, যখন স্বাস্থ্যহানি ঘটে তখন সামান্য কিছু হারায়। কিন্তু যখন মানুষ চরিত্র বা আত্মপরিচয় হারায় তখন সে নিঃস্ব হয়ে যায়। আর, কিসে তৈরি হয় ব্যক্তির সেই আত্মপরিচয়। সে তো আদর্শ ছাড়া আর কিছুই নয়। আদর্শ আর নীতির মধ্যে সামান্য পার্থক্য বোধহয় আছে। তবে আদর্শ আছে যার, নীতি তো তারই জন্য। যে আদর্শহীন তিনি কখনই নীতিবান হতে পারেন না।আর আদর্শ বা নীতিই হচ্ছে জীবন সাইকেলের ভারসাম্যের মূলমন্ত্র যা গন্তব্যে নিয়ে যায়। একে জীবনতরির কাণ্ডারিও বলা চলে। এই জায়গাটায় আদ্রেঁ জিদের একটা কোটেবল কোটেশন দিলে মন্দ হয় না। তিনি বলেন, তুমি যা নও তার জন্য প্রশংসিত হওয়ার চাইতে তুমি যা বিশ্বাস করো তার জন্য ঘৃণিত হওয়া ঢের ভালো।
বাস্তবিক অর্থেই নীতিহীন, আদর্শহীন জীবন অসম্পূর্ণ। সেইসব মানুষের কাছে পৃথিবীর খুব যে কিছু চাওয়ার আছে, তাও নয়। পক্ষান্তরে সভ্যতা তাদের জন্যই প্রহর গণনায় রত যারা মনেপ্রাণে কোনো না কোনো আদর্শ ধারণ করেন। তারাই দেশকালের নেতৃত্ব দেন। তারাই মানুষকে পথ দেখান। তারাই মানেন, ডু অর ডাই— মন্ত্রের সাধন না হয় শরীর পতন। যারা নেতৃত্ব দেন, তারা নীতির প্রশ্নে আপস করেন না। উপসংহারে আমরা স্মরণ করতে পারি মহাত্মা গান্ধীর সেই নিবিড় পর্যবেক্ষণ। তিনি মানব জীবনে সাতটি মহাপাপ সনাক্ত করেছেন। আর সেই সাত পাপের অন্যতম পাপটি হলো নীতিহীন রাজনীতি। পুনশ্চ: রাজনীতি জীবনেরই অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
লেখক :সাংবাদিক
