ম্যাগনাস কার্লসেন দাবার নতুন রাজা

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৫
দাবা অনেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকেই পেয়েছে। কিন্তু শারাপোভা বেকহ্যামদের মতো ক্যারিসমা ওয়ালা কাউকে বোধ হয় পেল এই প্রথম। তিনি নরওয়ের ম্যাগনাস কার্লসেন, ভারতের বিশ্বনাথন আনন্দকে হারিয়ে মাত্রই বিশ্বই চ্যাম্পিয়ন হলেন দাবায়। ভারতের চেন্নাইয়ে অনুুষ্ঠিত ১২ গেমের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্বাগতিক আনন্দকে ৬.৫-৩.৫ পয়েন্টে হারিয়ে এ কৃতিত্ব দেখান তিনি। তাও আবার দুটি গেম হাতে রেখেই। মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য তিনি সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়তে পারলেন না কার্লসেন। এটি এখনো কাসপারভের দখলে। কাসপারভ ১৯৮৫ সালে এ রেকর্ডটি গড়েছিলেন। কাসপারভ ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। এই কাসপারভেরই ১৯৯৯ সালে গড়া ২৮৫১ পয়েন্টের রেটিংকে ছাড়িয়ে গিয়ে নতুন উচ্চতায় (২৮৭০) ওঠেন কার্লসেন। আমেরিকান ববি ফিশার ১৯৭৫ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কার্লসেনই হলেন প্রথম কোন পশ্চিমা দেশের খেলোয়াড় যিনি ৬৪ ঘরের খেলা দাবার সর্বোচ্চ শিরোপাটি জিতলেন। তার সম্পর্কে কাসপারভ এ মাসের শুরুতে বিজনেস ইনসাইডারে লেখেন,‘ম্যাগনাস রকেট গতিতে কোন বিরতি ছাড়াও রেটিংয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে। তার মধ্যে ছিল ধারাবাহিকতা এবং দৃঢ়তা যা একজন তরুণ খেলোয়াড়ের তুলনায় ব্যতিক্রম হলেও তার সীমাহীন মেধার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। কার্লসেনের উঠে আসাটা হঠাত্ কুড়িয়ে পাওয়া কিছু নয়। মাত্র ১৩ বছর ১৪৮ দিন বয়সে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন, ১৯ বছর পার হতে না হতেই বনে যান বিশ্বের এক নম্বর। তারপর বিশ্ব দাবার ইতিহাসে সর্বাধিক ২৮৭২ রেটিংয়ের খেলোয়াড় হলেন। পিছনে ফেললেন গ্যারি কাসপারভকে। ঠাঁই পান কসমোপলিটানের প্রচ্ছদে, টাইম ম্যাগাজিনের চলতি বছরের জন্য করা বিশ্বের একশ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকাতেও ঠাঁই হয় তার। এমনি আরো কত কি? গ্যারি কাসপারভের মতো কিংবদন্তির চোখে তিনি ববি ফিশার ও আনাতোলি কারপভের মিশেল। কাসপারভ নিজে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তার কোচ ছিলেন। আমেরিকান গ্র্যান্ড মাস্টার ও সাবেক অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন সুসান পোলগার এএফপিকে বলেন,‘ম্যাগনাস খুবই ভিন্ন ধরনের খেলোয়াড় এবং তার ধরন একেবারেই নতুন। আনন্দের সাথে তো সে আগ্রাসী কৌশল নিয়েই খেলেছে। শুধু দাবাড়ুই নন কার্লসেন। অসলোয় এক ফুটবল ক্লাবে লেফট ব্যাক হিসেবে খেলেন তিনি। মডেলিং করেন নিয়মিত। হলিউড পরিচালক জেজে আব্রামস তাকে অভিনয়ে নামাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিট পাননি বলে তা আর হয়ে ওঠেনি তার। আনন্দ আবার কখনো বিশ্ব শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন কিনা সেটা সময়েই বলে দেবে। তার আগে জেনে রাখা ভাল চেন্নাইয়ের কাছাকাছি থেকে উঠে আসা এক সাধারণ রেলকর্মীর ছেলে আনন্দ পাঁচবার বিশ্ব খেতাব জিতেছিলেন। তার আগে মেধার স্বাক্ষর রেখে ১৮ বছর বয়সেই গ্র্যান্ড মাস্টার হন। আনন্দের আগে ২৭ বছর দাবাবিশ্ব শাসন করা ইমানুয়েল লাসকারও এরকম বাজেভাবে খেতাব হারিয়েছিলেন (০-৪) হোসে রাউল ক্যাপাব্লাঙ্কার কাছে। পরাজিত লাসকারের বয়স তখন ৫৭। আনন্দের বয়স অবশ্য ৪৩। সেটাও হয়তো সমস্যা নয়। সমস্যা এই যে কার্লসেনের বয়স মাত্র ২২। আর এটাও সত্যি যে ২০০৮ সালের অক্টোবরের পর থেকেই ২৮০ রেটিং থেকে ছিটকে যাওয়া এই ভারতীয় ধীরে ধীরেই জমি হারাচ্ছিলেন। তারপরও আনন্দ ভেবেছিলেন লম্বা গেমগুলোতে কার্লসেনকে ভয় না পেয়ে বরং নরওয়েজিয়টির সাথে পাল্লা দেবেন। কিন্তু কার্লসেন এতটাই ভাল খেললেন যে, আনন্দ আর কুলিয়ে উঠতেই পারলেন না। নিজেকে কার্লসেন তুলনা দেন কুমিরের সাথে। আপাতদৃষ্টিতে অলস, ঘাপটি মেরে থাকা কুমিরের মতোই শিকারকে তিনি নাকাল করে ছাড়েন। আনন্দ তার বড় প্রমাণ। বাবার কাছ থেকে দাবায় হাতেখড়ি হওয়ার পর আট বছর বয়সেই প্রথম শিরোপা জেতেন এই নরওয়েজীয়। এরপর ২০০৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন রাশিয়ার আনাতলি কার্পভকে হারিয়ে, কাসপারভকে ড্রয়ে বাধ্য করে গ্র্যান্ড মাস্টার হয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসেন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে রাশিয়ার দাবা ম্যাগাজিন ‘৬৪’ এর প্রচলিত পুরস্কার চেস অস্কার জেতেন তিনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার দাপটের পরও কার্লসেন প্রতিদ্বন্দ্বীদের জানিয়ে রেখেছেন তার সেরাটা এখনো দেখা যায়নি।