মানব সভ্যতার ইতিহাসে এইরূপ অনেক এলাকার কথা জানা যায় যেইখানে যাহা ইচ্ছা তাহা করা যাইত। ‘মগের মুল্লুক’ কথাটি এখনও এই অর্থে জনপ্রিয়। পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বে জগতের কোনো কিছুরই ধ্বংস নাই, শুধু অবস্থার রূপান্তর ঘটে মাত্র। এই তত্ত্বের প্রতীকীরূপ আমরা কোথায় না দেখি! মহাকালের সামান্য ব্যবধানে, কিংবা বলা যায় টিকিয়া থাকিবার প্রকৃতিগত প্রক্রিয়ায়, বিভিন্ন ‘মগের মুল্লুক’-জাতীয় এলাকা এক্ষণে রূপান্তর ঘটাইয়া আইন-কানুনের নিয়মের মধ্যে মনুষ্য বসবাসযোগ্য হইয়া উঠিয়াছে। ধরা যাক উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কথা। সেইখানে এই সময় একজন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ব্যক্তিটির গাড়িও চলতিপথে আইন লংঘন করিলে নিস্তার পায় না। সামান্য ট্রাফিক সার্জনও আইনের বাধ্যগত নিয়মে আইনভঙ্গকারী যেকোনো প্রভাবপ্রতিপত্তিপূর্ণ কিংবা খ্যাতিচূড়ামণি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করিতে পারেন। কারণ, সেইখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়মে ‘আইনের চোখে সকলেই সমান’। কিন্তু এই কথাটি যদি কোনো দেশে শুধুমাত্র কাজীর গরুর মতো হইয়া থাকে, যাহা শুধুই কেতাবে মেলে, বাস্তবে যাহার অস্তিত্ব নাই—তাহা হইলে সেই সকল জনপদ ‘ভয়াবহ বিপদ বিশেষ’ বলিলেও খুব বেশি বলা হয় না।
এই উপমহাদেশের অনেক জায়গাতেই ‘আইন-কানুন’ বা ‘নিয়ম’ শব্দটি অনেকটাই কাগুজে মাত্র। কাগুজে বাঘের মতোই তাহার নখ নাই, দন্ত নাই, হালুম করা দূর অস্ত। কিছু কিছু মানুষ এই একবিংশ শতকেও ‘মগের মুল্লুক’-এর ছায়া বহাল রাখিয়াছে তাহাদের ঔদ্ধত্যের শামিয়ানা পাতিয়া। অর্থাত্ ‘মগের মুল্লুক’ পুরোপুরি নি:শেষিত হয় নাই এইখানে, তাহাদের শিকড়ে জলসিঞ্চন করিতেছে ঔদ্ধত্যের শিখরে আসীন ব্যক্তিবর্গ, যাহারা মনে করেন—রাষ্ট্রশক্তি কিংবা প্রশাসনযন্ত্র ব্যাঘ্র নহে, নেহাত্ ভেড়া মাত্র। কিংবা এমনও হইতে পারে, তাহাদের শক্তির আস্ফাালন দেখিয়া প্রশাসনযন্ত্র হয়তো নিজেদের ‘ভেড়া’তুল্য ভাবিয়া বিভ্রান্ত হয়। ধরা যাক—কিছু কুচক্রী মানুষ পথচলতি এক ব্যক্তির ছাগল দখল করিতে চাহে। তাহারা নানা ভাবে বিভক্ত হইয়া পথের বাঁকে বাঁকে ওই ব্যক্তির সহিত দেখা দেয়, বলে—‘কুক্কুট লইয়া কোথায় যাও?’ ব্যক্তিটি প্রথম প্রথম প্রতিবাদ করে যে, তাহার সঙ্গী পশুটি কুকুর নহে। কিন্তু একই কথা প্রতি বাঁকে শুনিতে শুনিতে ব্যক্তিটি বিভ্রান্ত হইয়া ভাবে—সকলের কথা মিথ্যা হইতে পারে না, নিশ্চয়ই সে ছাগলের পরিবর্তে কুকুর লইয়াই যাইতেছে, সুতরাং তাহা ত্যাগ করাই শ্রেয়। আমাদের আইন-কানুন বাস্তবায়নের প্রশাসনযন্ত্রও কি কিছু কুচক্রী ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানুষের চক্রান্তে বিভ্রান্ত হইয়া ভাবিতেছে—তাহারা প্রকৃতপক্ষে ব্যাঘ্র নহে, ভেড়া মাত্র?
বিজ্ঞান বলে, এই পৃথিবী বাসযোগ্য হইত না, যদি সূর্য ও পৃথিবীর জমিনের মাঝখানে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকক্ষেত্র না থাকিত। সামাজিক বিজ্ঞানে আমরা আইন-কানুনকেও এই চৌম্বকক্ষেত্রের সহিত কল্পনা করিতে পারি। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র যেইরূপ মহাকাশ বা সূর্য হইতে ছুটিয়া আসা ক্ষতিকর কণিকাগুচ্ছকে প্রতিহত করিয়া দেয়, বসবাসের উপযুক্ত করিয়া তোলে পৃথিবীর জমিনকে; তেমনি যথাযথ আইন-কানুন ও তাহার প্রকৃত প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি এলাকা মনুষ্য বসবাসের উপযুক্ত হয়। এইরূপ আমরা তুলনা টানিতেই পারি। এখন কথা হইল, যাহাদের ঔদ্ধত্যে নিষ্ক্রিয় হয় এই চৌম্বকবলয়, অর্থাত্ ফ্যাকাশে হয় আইনের আরশী, তাহারাই যদি ডাইনোসরবত্ দাপিয়ে বেড়ায় বত্সরের পর বত্সর, তবে উপসংহারও আসিবে অন্যভাবে। ঔদ্ধত্যের বিষবৃক্ষের নীচে দিনাতিপাত করিতে করিতে সাধারণ মানুষ একটি সময় নিজেদের আর অসহায় মনে করিবে না নিশ্চয়ই। কেননা, অস্তিত্বের প্রশ্ন সম্মুখে ঝুলিতে থাকিলে তখন আর হারাইবার কিছু থাকে না। থাকে না অসহায়ত্বও।
কিংবা সেই শেষ কথা বলিবার পূর্বে আরও কিছু ঘটিতেও পারে। প্রকৃত উপলব্ধি জাগিতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাস্তবায়নকারী প্রশাসনযন্ত্রের। এক্ষণে উল্লেখ করা যাইতে পারে ঈশপের একটি গল্প, যে গল্পে একটি ব্যাঘ্রশাবক ঘটনক্রমে শৈশব পার করিতেছিল একদল ভেড়ার সহিত। স্বভাবতই সেই ব্যাঘ্রশাবক সকল প্রকার আচার আচরণ করিত ভেড়ার ন্যায়। এমনকি ডাক পারিতও ভেড়াদের মতো। ব্যাঘ্রশাবক এইভাবে বড় হইল। বাঘ হইয়াও সে ভেড়া রহিয়া গেল। একবার এক ঋষি তাহা বুঝিয়া ওই ব্যাঘ্রকে স্বচ্ছ জলপাত্রে মুখ দেখাইয়া বলিল—দেখো তুমি আসলে কী? বিভ্রান্তি কাটিলে সেই ব্যাঘ্রও দেখিল সে হুংকার দিতে পারে ব্যাঘ্রের ন্যায়ই। আমাদের প্রশাসনযন্ত্র কি দর্পণে মুখ দেখিয়া নিজেকে চিনিবে না কখনও?
