দেশি-বিদেশি আইনজীবীদের বক্তব্য উপস্থাপনের ভেতর দিয়ে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম। এর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বিতীয় আসরে ঘটে যাওয়া ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত নয় খেলোয়াড়-কর্মকর্তার চূড়ান্ত বিচারপর্ব শুরু হল গতকাল।
প্রাথমিক শুনানিতে গতকাল মোহাম্মদ আশরাফুল ও কৌশল লোকুয়ারুচ্চির পক্ষ থেকে যথারীতি অপরাধ স্বীকার করে আইনজীবীরা বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। আর যার যার অপরাধীকে নির্দোষ দাবি করে ঢাকা গ্লাডিয়েটর্সের তিন কর্মকর্তার আইনজীবী এবং মাহবুবুল আলম রবিন ও মোশাররফ রুবেলের আইনজীবী বক্তব্য রেখেছেন। তবে তাদের বক্তব্যের সিংহভাগ জুড়ে ছিল, এই ট্রাইব্যুনালের আইনগত ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তোলা। এই দুই পক্ষের আইনজীবীরাই ট্রাইব্যুনাল যে নোটিস তাদের সর্বশেষ পাঠিয়েছেন, তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছেন আদালতে।
এদিকে একই মামলায় অভিযুক্ত ড্যারেন স্টিভেন্সের আইনজীবী তার মক্কেলকে নিরপরাধ বলে দাবি করেছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রাথমিক এই শুনানিতে আরেক অভিযুক্ত মোহাম্মদ রফিক নিজে বা তার পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত হয়েছেন বলেই জানা যায়নি।
বিসিবির আমন্ত্রণে গত বিপিএল আসরের সব ম্যাচে চোখ রাখতে গিয়ে আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিট (আকসু) কমপক্ষে দুটি ম্যাচ সন্দেহজনক বলে রায় দেয়। এরপর অধিকতর তদন্ত শেষে চাঞ্চল্যকরভাবে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও দেশের অন্যতম সেরা তারকা মোহাম্মদ আশরাফুলসহ কয়েক জন ক্রিকেটারের নাম বেরিয়ে আসে। গতকাল শুনানিতে ঢাকা গ্লাডিয়েটর্সের তিন কর্মকর্তা; মালিক সেলিম চৌধুরী, তার ছেলে শিহাব চৌধুরী এবং প্রধান নির্বাহী গৌরব রাওয়াতের পক্ষে ব্যারিস্টার ব্যারিস্টার নওরোজ চৌধুরী তার শুনানিতে আকসুর এই তদন্ত করার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বলে সূত্র দাবি করেছে।
আকসুর সেই তদন্ত গত সেপ্টেম্বরে আইসিসি ও বিসিবি যৌথ সংবাদ সম্মেল করে বলে ৯ জন খেলোয়াড় বা কর্মকর্তা এই কেলেঙ্কারিতে জড়িত; তবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কারো নাম প্রকাশ করেনি। সেই অভিযুক্তদের বিচারের দায় পড়ে বিসিবির গঠিত ডিসিপ্লিনারি কমিটির ওপর।
বিসিবি পরপরই একটি ডিসিপ্লিনারি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলেও সেটি নানা কারণে বাস্তবে রূপ নেয়নি। অবশেষে গত ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ও আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রশীদকে ডিসিপ্লিনারি কমিটির প্রধান হিসেবে মনোনীত করে বিসিবি। পরে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেন কমিটির বাকী ১০ সদস্যকে। এরপর ১০ নভেম্বর ওই ডিসিপ্লিনারি কমিটি আবার সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ট্রাইব্যুনালের বাকী দুই সদস্য হলেন আজমালুল হোসেন কিউসি এবং সাবেক ক্রিকেটার শাকিল কাশেম।
আইসিসি ও বিসিবির সেই সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছিল, ৪০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করবে। আর সেটা না করাতেই ইতিমধ্যে দেশের প্রচলিত আদালতের স্মরণাপন্ন হয়েছেন ঢাক গ্লাডিয়েটর্সের তিন কর্মকর্তা এবং রুবেল-রবিন। শুনানিতে অংশগ্রহণ শেষে সেটাই বলছিলেন রুবেল-রবিনের আইনজীবী ব্যারিস্টার নূর-ই সাদিক, ‘বিসিবির কোর্ডে (দুর্নীতি বিরোধী কোড) বলা আছে, ৪০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করবেন। তা না হওয়ায় আমার মক্কেলরা অনিশ্চিত সময় ধরে নিষেধাজ্ঞায় ভুগছিলেন। তাই আমরা ৪০ দিন অপেক্ষা করে প্রতিকার পেতে আদালতে গেছি। এখন ব্যাপারটি আদালতের বিবেচ্য থাকায় আমরা বলেছি যে, আগে প্রচলিত আদালতে মীমাংসা হলে তবেই এই ট্রাইব্যুনাল মীমাংসা করবেন।’
নূর-ই সাদিক জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনাল তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন। সেই সঙ্গে আইসিসি ও বিসিবির কৌঁসুলীদের বলেছেন এর লিখিত জবাব দিতে। এই জবাব প্রাপ্তিসাপেক্ষে আবার অভিযুক্তদের আইনজীবীরা আরেক তরফা লিখিত জবাব দেবেন। আর তারপর চূড়ান্ত শুনানি হবে বলে জানা গেল।
গতকাল শুনানি পর্বের শুরুতেই আইসিসির আইন কর্মকর্তারা আকসুর অনুসন্ধান ও উদঘাটন তুলে ধরেন এবং তাদের আইনজীবীরা এর পক্ষে কথা বলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে ঢাকা গ্লাডিয়েটর্সের তিন কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্ব করা ব্যারিস্টার নওরোজ চৌধুরী, দুই ক্রিকেটারের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার নূর-ই সাদিক এবং কৌশল লোকুয়ারুচ্চির শ্রীলঙ্কান আইনজীবী দিলান বক্তব্য রাখেন। এরই আগে স্কাইপির মাধ্যমে ড্যারেন স্টিভেন্স ও মোহাম্মদ আশরাফুলের হয়ে বক্তব্য জানান ব্রিটিশ আইনজীবী ইয়াসিন প্যাটেল।
