[ রা জ নী তি ]

দেশকে অচল করা বা জ্বালিয়ে দেয়ার নাম গণতন্ত্র নয়

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০৫
দেশের রাজনীতিতে একদিকে চলছে নাটকীয়তা, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে অনিশ্চয়তা। নাটকীয়তা ও অনিশ্চয়তার পরিণতি সফল নির্বাচন নাকি অন্য কিছু তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সংলাপ ও সমঝোতার কথা যত শোনা যাচ্ছে বাস্তবে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এর মধ্যেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যে বৈঠকের খবর (২৩ নভেম্বর রাতে) গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর কেউ কেউ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন এই ভেবে যে সংঘর্ষের রাজনীতি থেকে বিএনপি হয়তো সরে আসবে। কিন্তু মির্জা আলমগীর সাংবাদিকদের কাছে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা স্বীকার না করায় এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, আশার বেলুনও ফুটো হয়েছে। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ নিয়ে বিএনপি কিছুটা দোটানায় আছে। নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে দলের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপি যোগদান করেনি। করবে বলেও মনে হয় না। শেখ হাসিনা সরকার প্রধান থাকলে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার যে কথা বিএনপি বলে আসছে, তা থেকেও হয়তো তারা সরে আসবে না। আবার শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার হওয়ারও যে আর কোনো সম্ভাবনা নেই, এটাও এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। সংবিধান অনুযায়ী আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। দু’একদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে। সে হিসেবে বলা যায়, নির্বাচনের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ না নিলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন হবে কি-না, সে নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে কি-না, বিএনপিকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের কারণে দেশের রাজনৈতিক সংকট আরো গভীরতর হবে কি-না, সেসব প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিএনপি এবং তার অনুসারী আরো কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ না নেয়াটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। এটা আমাদের ভবিষ্যত্ রাজনীতির জন্য বড় ক্ষত সৃষ্টি করবে। কিন্তু বিএনপির দাবি অনুযায়ী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম। কারণ পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই নির্বাচনের সময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া হয় না। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারই নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। যেসব দেশে গণতন্ত্র সংকটগ্রস্ত কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নবযাত্রা শুরু হয়েছে, সেসব দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে দেখা গেলেও কোথাও এটাকে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করার কথা ভাবা হয় না। বাংলাদেশে নব্বইয়ের পর বেশ কয়েকটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছে। এবার উচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে এই ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি এবং তার সঙ্গী-সাথীরা আন্দোলন করলেও সেটা সফলতার মুখ দেখেনি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গত তিন সপ্তাহে বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট দেশে মোট ১০ দিন হরতাল পালন করেছে। এই দীর্ঘ হরতালে মানুষের সমর্থন খুব বেশি পাওয়া গেছে এমন দাবি কেউ করতে পারবেন না। গাড়ি পুড়িয়ে, ভাঙচুর করে, ককটেল পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে মানুষ মেরে কিংবা পুড়িয়ে গুরুতর আহত করে দেশের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা গেলেও আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়নি। বিরোধী দলের আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ নেই। সহিংস এবং সন্ত্রাসী মানুষ পছন্দ করে না। ফলে বিরোধী দলের দাবির প্রতিপক্ষের নৈতিক সমর্থন আছে, তারাও আন্দোলনের নামে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সমর্থন করে না। বিরোধী দলের কর্মসূচিতে এমন কি দলের নেতাকর্মীদের পর্যন্ত মাঠে দেখা যায় না। এই অবস্থায় বিএনপির পক্ষ থেকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলেই দেশ অচল করে দেয়া হবে। গত ২২ নভেম্বর রাজধানীর সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানের এক সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘নির্দলীয় সরকারের দাবি না মেনে একতরফা নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলে ওই দিন থেকেই দেশ অচল করে দেয়া হবে।’ একই সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা হুংকার ছেড়ে বলেছেন, ‘আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হলে বাংলাদেশের ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকা জ্বালিয়ে দেয়া হবে। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হলে সারাদেশ ওলট-পালট হয়ে যাবে।’ বিএনপি-জামায়াত নেতাদের এসব হুমকি নিঃসন্দেহে দেশের মানুষকে শঙ্কিত করে তুলছে। দেশ অচল করা, জ্বালিয়ে দেয়া, ওলট-পালট করা- এসব গণতন্ত্রের ভাষা নয়। মারামারি, কাটকাটি করে হিংসার আশ্রয় নিয়ে দেশের মধ্যে বড় ধরনের গোলযোগ সৃষ্টি করলে তাতে করে লাভ হবে? এতে কি গণতন্ত্র রক্ষা পাবে, নাকি বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম হবে? বিএনপি নেতাদের উচিত, ভাবাবেগ ও জেদ পরিহার করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ অনুসরণ করা। বিএনপি যদি মনে করে, দেশের মানুষ তাদের পক্ষে আছে তাহলে তাদের অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত। ভোট কারচুপি বা ভোট ডাকাতি করে নির্বাচিত হওয়ার দিন এখন আর নেই। দেশকে যারা ভালোবাসেন, যারা দেশে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকুক সেটা চান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দেশ এগিয়ে যাক- এটা যারা দেখতে চান, তাদের সবার উচিত শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা। অহেতুক তর্ক-বিতর্ক করে গণতন্ত্রের যারা শত্রু তাদের সুযোগ করে দেয়ার কোনো মানে হয় না। নন-ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে বিভেদের পথ প্রশস্ত না করে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি আজ নানা ফ্রন্টে সক্রিয়। তারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু হওয়ায় এরা বুঝে নিয়েছে যে তাদের দিন শেষ। সেজন্যই তারা মরণ কামড় দেয়ার জন্য ফণা তুলে উদ্যত। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের জন্য যাদের অন্তরে ভালোবাসার শেষ নেই, পাকিস্তান ভাঙার বেদনায় যারা মুহ্যমান তারা এবার এক হয়েছে। তারা বুঝেছে, এবার যদি তারা হেরে যায় তাহলে আর তারা এদেশে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তাই তারা শেষ আঘাত হেনে এস্পার-ওস্পার করতে চায়। নির্দলীয় সরকারের আন্দোলনকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বিএনপি নেতৃত্ব বুঝে কিংবা না বুঝে এদের মদদ দিচ্ছে। শুধু বিএনপি না, নিজেদের গণতান্ত্রিক কিংবা প্রগতিশীল বলে দাবি করেন, এমন অনেককেই দেখা যাচ্ছে তথাকথিত বিশুদ্ধ নির্বাচনের নামে বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করছেন। যারা আজ বিএনপি ছাড়া দেশে নির্বাচন হলে সর্বনাশ হবে বলে চিত্কার করছেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন, জামায়াত-হেফাজতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দেশের কি পরিণতি হবে? জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি। এখনও চায় না। দেশটি ধ্বংস হলে তাদের কিছু যায় আসে না। তাই তারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলীয় নেতাদের বাঁচাতে দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চায়। নির্বাচন তারা চায় না। তারা গণতন্ত্র চায় না। বর্তমান সরকার একটি নির্বাচন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হোক এটা জামায়াতের কাম্য নয়। যত বেশি রাজনৈতিক দল বা শক্তিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে পারবে জামায়াতের তত বেশি লাভ। বর্তমান সরকারকে বিচ্ছিন্ন করাই তাদের লক্ষ্য। জামায়াতের খপ্পরে পড়েছে বিএনপি। কিন্তু বিএনপি ছাড়া অন্য যারা নির্বাচন না করার কথা বলছেন, তারা আসলে কোন রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করছেন? আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াতের উদ্দেশ্য পূরণের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছেন নাকি? দেশবাসীর অনেকেই হয়তো নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। একইসঙ্গে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুদ্ধাপরাধের বিচারও চায়, জামায়াতের রাজনীতিও তারা পছন্দ করে না। এখন জনমতের কথা বলে নির্দলীয় সরকারের জন্য যারা সরকারকে চাপ দিচ্ছেন, তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেয়ার জন্য বিএনপির ওপর চাপ দিচ্ছেন না কেন? জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য সবাই একসঙ্গে কেন বিএনপিকে চেপে ধরছেন না? আওয়ামী লীগকে দুর্বল করার যে চক্রব্যুহ রচনা করা হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য কি গণতন্ত্র রক্ষা করা? নাকি গণতন্ত্রবিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা? আওয়ামী লীগ দুর্বল হলে যে দেশের গণতন্ত্র বলবান হবে না- এটা বুঝতে না পারলে আসলে দেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে কি? নির্বাচন বানচাল বা প্রতিহত করে নয়, নির্বাচনে অংশ নিয়েই দেশকে রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত করা যাবে। তাই বিএনপির উচিত হবে দেশ অচল করার মতো অগণতান্ত্রিক-অনিয়মতান্ত্রিক-অসাংবিধানিক রাজনীতির পথে হেঁটে শক্তি ক্ষয় না করে নির্বাচনে অংশ নেয়া। দেশ ও জনগণ যদি ক্ষমতার চেয়ে বড় হয়ে থাকে তাহলে দেশ ও জনগণের স্বার্থে নির্বাচনে অংশ নেয়াই হলো এখন সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্তব্য। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট [email protected]