ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আব্দুর রহমান নামের এক যুবককে গ্রেফতার করিয়াছে, পুলিশের ডায়েরিতে তাহার নাম লেখা আছে ‘বোমা রহমান’। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বলিয়া দাবি করিলেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে পুরাতন ঢাকায় বোমা বিস্ফোরণ এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগের জন্য লোক ভাড়া করা তাহার জীবন ও জীবিকার পাথেয়- আব্দুর রহমান অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক দলগুলির প্রয়োজন মোতাবেক ঢাকা শহরে ‘বোমা প্যাকেজ’ সরবরাহ করে। পাঠক হয়তো অবাক হইবেন না, গত বত্সরের তুলনায় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই বত্সর বোমা প্যাকেজের মূল্য দ্বিগুণ হইয়াছে, এখন সফল বোমা প্যাকেজ কিনিতে খরচ হয় ১০-১৫ লক্ষ টাকা। রাজধানীতে বোমা তৈরি হইতে বিস্ফোরণ পর্যন্ত পুরা প্রক্রিয়াটি সম্পাদন করে বেশ কয়েকটি গ্রুপ। হরতাল বা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তাহাদের ডাক পড়ে। অতঃপর, সকল গ্রুপ একত্রিত হইয়া বোমা তৈরি, বহন ও বিস্ফোরণের কাজটি সম্পাদন করে। বেশি পরিমাণ ও ভয়ঙ্কর মাত্রায় সহিংসতা ঘটাইবার পারদর্শিতা দেখাইতে পারিলে এবং মিডিয়াতে ফলাও করিয়া তাহা প্রচারিত হইলে দলটির ‘মূল্য’ও বাড়িয়া যায়। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের আগে এই সকল বোমা প্যাকেজ সরবরাহকারী একশ্রেণীর মিডিয়া কর্মীকে মোবাইল ফোনে অবহিত করেন। ক্যামেরা লইয়া মিডিয়া কর্মীরা অকুস্থলে পৌঁছাইলেই বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে মিডিয়া মারফত ত্রাসের বিস্তার এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে জনগণের জানমালের ক্ষতি করিয়া তাহারা সটকাইয়া পড়ে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বোমাবাজিকে লোভনীয় পেশাদারিত্বের পর্যায়ে লইয়া গিয়াছে! আগে যাহারা পেশাগতভাবে বোমা তৈরিতে নিয়োজিত ছিল তাহাদের অধিকাংশই ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী বা ডাকাত গ্রুপগুলির কাছে সরবরাহ করিতো, কিন্তু সমপ্রতি বোমা তৈরি ও বিস্ফোরণের জন্য মোটা অংকের টাকা পাওয়া যাইতেছে বলিয়া অনেকেই এই কাজে উদ্বুদ্ধ হইতেছে। কিন্তু সমাজের জন্য ইহার ফল হইয়াছে বিষম। হরতালকে কেন্দ্র করিয়া সম্প্রতি মুড়ি-মুড়কির মতো ককটেল ফাটানো হইতেছে। পথে-ঘাটে ককটেল হামলার শিকার হইতেছে নিরীহ মানুষ। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাসভবন ও রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনেও ককটেল হামলা চালানো হইতেছে। গত এক মাসে হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় রাজধানীসহ সারাদেশে অন্তত ১০ হাজার ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়াছে বলিয়া পুলিশ সদর দফতর জানাইয়াছে। পুলিশ সরবরাহকৃত এই সংবাদ অতিরঞ্জিত বলিয়া ধরিলেও অন্তত এইটুকু নিশ্চিত করিয়া বলা যায় যে, ‘নির্দলীয়’ বনাম ‘সর্বদলীয়’ সরকারের বিতর্কের মীমাংসা না হইবার কারণে গত ২৬ শে অক্টোবরের পর হইতে দেশে কয়েক সহস্র ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়াছে। যাহা ব্যবহূত হইয়াছে গত ১৯ দিনের মধ্যে ১২ দিনের সর্বাত্মক হরতাল পালন করিতে। তিন দফার হরতালের সহিংসতায় সমগ্র দেশে মোট ২৬ জন নিহত হইয়াছেন। আহত হইয়াছেন দেড় সহস্রাধিক মানুষ। গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করায় দগ্ধ হইয়াছেন ৭৬ জন যাত্রী ও পরিবহনকর্মী। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে ৪৯০টির বেশি যানবাহনে। সহিংসতার মধ্য দিয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের দেশব্যাপী টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতাল গত বুধবার সন্ধ্যা ছয়টায় শেষ হইয়াছে। আগামীতে বিরোধীদলীয় এই জোট আবারও হরতাল দিতে যাইতেছে।
বর্তমান বিরোধীদলীয় জোট সকল সন্ত্রাসের হোতা- এইরূপ বলা আমাদের উদ্দেশ্য নহে। আমরা বলিতে চাহিতেছি: সৃজনশীলতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধের অভাবে আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিতেছি যেইখানে সহিংসতাই হইয়া উঠিয়াছে ভাবপ্রকাশের একমাত্র মাধ্যম। আর ইহার ফল ভোগ করিতে হইতেছে পেশাজীবী, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সর্বস্তরের মানুষকে। সর্বস্তরের মানুষের ভোগান্তিই কেবল বাড়িতেছে না, আতঙ্কিত এইসকল মানুষ ভাষিক বা শরীরিক সন্ত্রাসের আশ্রয় ব্যতীত রাস্তাঘাটে ও অফিসে-আদালতে ভাবপ্রকাশেও অক্ষম হইয়া উঠিতেছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন বর্বরদশায় নামিয়া যাইতেছে যেইখানে হাতাহাতি, লাঠালাঠি, গালাগালি এবং সর্বোপরি আদর্শের বদলে অর্থ, সম্প্রীতির বদলে সন্ত্রাস এবং দূরদর্শিতার বদলে দস্যুতা ও দুঃশাসন আমাদের জীবন ও জবানকে নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। ইহার অবসান হওয়া জরুরি।
