নারীর জন্য নির্যাতনমুক্ত পরিবার ও কর্মক্ষেত্র

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৫০
গতকাল ২৫ নভেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবস। জাতিসংঘের আহ্বানে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল দেশে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ পক্ষ এবং ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবস উদযাপিত হয়। আর এই ১৬ দিনে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচির সমন্বয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়, যা বিশ্বজুড়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ১৬-দিনের প্রচারাভিযান (16-days campaign against violence against women) হিসেবে পরিচিত। অবশ্য গত বছর জুলাই মাস থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব প্রত্যেক মাসের ২৫ তারিখকে ‘অরেঞ্জ ডে’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন, যে দিনে নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালিত হবে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত কয়েক বছরে নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারী নির্যাতনের ঘটনা বিস্তার লাভ করছে ভয়াবহ এক ব্যাধির মতো। পারিবারিক নির্যাতন, অপহরণ, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, রাস্তাঘাটে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, সাইবার ক্রাইম ইত্যাদি নানামুখী হয়রানি, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে যে কোনো বয়স, পেশা, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থানের নারী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর অধস্তন অবস্থান ও কম মর্যাদাই নারী নির্যাতনের মূল কারণ। অথচ জাতীয় উন্নয়নে নারীর রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান এবং তা পুরুষের তুলনায় মোটেই কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানব উন্নয়নসহ অর্থনীতিতে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। বলা বাহুল্য যে এই অভাবনীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছে এ দেশের নারী। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি তথা রফতানিখাতের প্রাণকেন্দ্র গার্মেন্টস শিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকই নারী, বলা যায় এদেশের সস্তা নারী শ্রমের কল্যাণেই এই খাতের এতো শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। নারীরা পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই দেশের উন্নয়নে মূল্যবান অবদান রেখে চলেছে। এই নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতি মানেই দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি। তাই নারীর উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধক নারী নির্যাতন নির্মূলে আন্তরিক ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। অনেক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও প্রবল পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল থেকে নারীরা মুক্ত হতে পারছেন না। সামপ্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের অনেক বিস্তৃতি এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও আশংকাজনকভাবে বেড়েই চলেছে নারী নির্যাতনের ঘটনা - সাথে সাথে ঘটনার ভয়াবহতাও। পুলিশ সদর দফতরের নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৮ হাজার ২৭৭টি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মতে, প্রতিদিন দেশে গড়ে ২৫ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সহিংসতা নারী ও শিশুর জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। পরিবার ও সমাজে নিরাপত্তার অভাব, নির্যাতনের আশংকা কিংবা তিক্ত অভিজ্ঞতা নারীর স্বাভাবিক গতিময়তা ও কর্মক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে, নারীকে তার কর্মক্ষেত্র থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এর ফলাফল কারো জন্য সুখকর হবে না। নারী শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস অথবা তাদের অনুপস্থিতিতে শ্রমবাজারে যে ঘাটতি হবে তার ফলে পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের আয় কমে যাবে, জীবনমানের অবনতি হবে, সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ন করবে। দেশ বঞ্চিত হবে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মূল্যবান অবদান থেকে। বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক অসমতার মধ্যে থেকেও আমাদের দেশের নারীরা এগিয়ে চলেছে, তাদের জীবনে ঘটেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। তারা শুধু নিজেরা এগিয়ে চলছে তা নয়, বরং নিজের দেশকেও টেনে নিয়ে চলেছে। জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থেই তাই নারী নির্যাতন বন্ধে সবারই আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা গ্রহণ করা দরকার। পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ নারী-বান্ধব হলে নারীর অগ্রগতি আরো ত্বরান্বিত হবে এবং অনুকূল পরিবেশে তারা দেশ ও সমাজের জন্য আরো বেশি অবদান রাখতে পারবে। তাই আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন বিলোপ দিবসকে সামনে রেখে আমাদের সকলের অঙ্গীকার হোক: নারীর জন্য নির্যাতনমুক্ত ও নিরাপদ পরিবার ও কর্মক্ষেত্র গড়ে তুলবো।  লেখক: সমন্বয়ক, স্টেপস্ টুয়ার্ডস্ ডেভেলপমেন্ট