স্বাধীন দেশে কেন এই পরাধীন মানসিকতা

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৫৪
সীতাকুণ্ডে অব্যাহত তাণ্ডবের ভয়াবহতা বিস্মৃত হইবার পূর্বেই গত রবিবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া রাজশাহী কলেজে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত হইয়াছেন কমপক্ষে ২০ জন। সংঘর্ষের জের ধরিয়া কলেজে ভাঙচুর এবং হোস্টেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে। লাঞ্ছিত করা হইয়াছে উপাধ্যক্ষকে। সাভারের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নহে। দমকলকর্মীদের সহিত কথা কাটাকাটিকে কেন্দ্র করিয়া সৃষ্ট সংঘর্ষে পুলিশ, শ্রমিক ও দমকল কর্মীসহ আহত হইয়াছেন অর্ধশতাধিক। ভাঙচুরের শিকার হইয়াছে অসংখ্য যানবাহন। অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটে লণ্ডভণ্ড হইয়া গিয়াছে গুরুত্বপূর্ণ সাভার ফায়ার স্টেশনটি। রক্ষা পায় নাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবনও। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে উভয়পক্ষের শতাধিক ব্যক্তি আহত হইয়াছেন। ঘটিয়াছে ব্যাপক ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও। অনুরূপ সংঘর্ষে বরিশালে ২০ জন এবং টাঙ্গাইলে ১৫ জন আহত হইয়াছেন। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে পারস্পরিক বিরোধের জের ধরিয়া গুলিবিদ্ধ হইয়াছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের পুত্রসহ ২২ জন। লক্ষণীয় যে চিত্রটি মাত্র একদিনের এবং শুধু যে রাজনৈতিক কারণে সংঘর্ষ বাধিতেছে তাহাও নহে। অতএব, অসহিষ্ণুতা কোন্ পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে তাহা সহজেই অনুমেয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে কোনো সুপরামর্শই কাজে আসিতেছে না। পরিলক্ষিত হইতেছে না বিবেক ও দেশাত্মবোধের বিন্দুমাত্র স্ফূরণও। বরং বহ্নিমুখ পতঙ্গের মতো সকলেই যেন সজ্ঞানে সহিংসতার আত্মঘাতী পথেই ধাবিত হইতেছে। ফলে একটি স্বাধীন দেশে যাহা এককথায় অকল্পনীয়— ঠিক তাহাই ঘটিয়া চলিয়াছে দিনের পর দিন। কথায় কথায় রক্ত ঝরিতেছে। ধ্বংস হইতেছে মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ। ভস্মীভূত হইতেছে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যবাহী যানবাহন। অচল হইয়া পড়িতেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্থবির হইয়া পড়িতেছে অর্থনীতি। ক্ষুণ্ন হইতেছে দেশের ভাবমূর্তি। ইহার সর্বশেষ উদাহরণ হিসাবে স্পেনের কয়েকজন পোশাক ক্রেতার আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা যায়। বড়ো অংকের কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য ঢাকা হইতে নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার পথে গত শনিবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় গাড়ি ভাঙচুরের কবলে পড়িয়া তাহারা ইতোমধ্যেই দেশত্যাগ করিয়াছেন। ন্যক্কারজনক এই ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে অন্য ক্রেতাদের উপরও। ক্রমবর্ধমান সহিংসতার ঘটনায় ব্যবসায়ী-শিল্পপতি হইতে শুরু করিয়া দিনমজুর পর্যন্ত সকলেই উদ্বিগ্ন। কিন্তু ঘটনার লাগাম যাহাদের হাতে তাহারা নির্বিকার। স্বাধীন দেশে কেন এই পরাধীন মানসিকতা— তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে আমরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াছি। মরণপণ সংগ্রাম করিয়াছি পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধাঁচের দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও। অতএব, আমরা জানি যে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে এমন অনেক কিছুই করা যায়— যাহা স্বাধীন দেশে কখনও প্রযোজ্য বা গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। স্বাধীন দেশেও নাগরিকদের ক্ষোভ-অসন্তোষের একশত একটি কারণ থাকিতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে সেই ক্ষোভ-অসন্তোষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর অধিকারও সকলেরই আছে। তবে সংবিধানস্বীকৃত সেই অধিকারও শর্তহীন বা অসীম নহে। গণতন্ত্রই বলি আর প্রচলিত নীতিনৈতিকতাই বলি, বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘন সর্বত্রই ধিকৃত। সহিংসতা আর গণতন্ত্র কখনও এক সাথে যায় না। আমরা বিশ্বাস করি যে গণতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী দেশাত্মবোধসম্পন্ন কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষে কোনোভাবেই ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হানাহানির মতো আত্মঘাতী তত্পরতাকে সমর্থন করা সম্ভব নহে। পাশাপাশি ইহাও সত্য যে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে মদদ দেওয়ার মতো উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী লোকেরও অভাব নাই আমাদের সমাজে। গণতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বকে অবশ্যই তাহাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন