মূল্যবোধ সেকাল ও একাল

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৫৫
আমরা ছোটবেলায় যখন নানা ধরনের বায়না ধরতাম তখন অভিভাবকের যুক্তি শুনে চুপ করে যেতাম, প্রশ্ন করার সাহস হতো না। কিন্তু আজকালের ছেলেমেয়েরা তা করে না। তাদের কিছু করতে বারণ করলেই তারা উত্তর দেয়—‘আমার ভালো লাগে বলে করি।’ অথচ আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে আজকালের ছেলেমেয়ে যা ভালো লাগে বলে করছে তার মধ্যে অনেক কর্মই তার অভিভাবকের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই তাদের যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে কোন্টা ভালো, কোন্টা খারাপ। জোর গলায় শাসন করলে তারা আজ আর মেনে নেবে না, যা আমরা নিয়েছি। তাই সঠিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। এই সঠিক মূল্যবোধ শেখানোটাই আজকের অভিভাবকদের কাছে এক বিরাট সমস্যা। কারণ তারা নিজেরাই জানেন না কী মূল্যবোধ শেখাবেন। কোন্ মূল্যবোধ সঠিক—মেনে নেয়া না বিদ্রোহ করা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য না সামাজিক শৃঙ্খলা, সামাজিক রীতি-নীতির অবমাননা বা মানবাত্মার অপমান? কারণ আজকের অভিভাবকরা যারা জীবন সংগ্রামে বার বার মার খেয়েছেন বা খাচ্ছেন তারা কখনও সন্তানদের বলার সাহস পাবেন না, ‘আমার মতন হও’,‘ আমাকে দেখে শেখো’। তাদের বলতে হবে, প্রফেসর ওসমান গণির মত হও, বেগম রোকেয়ার মত হও, অধ্যাপক আব্দুল ফজলের মত হও। এ সব বললেই কি আর হয়, সে তো কথার কথা মাত্র। ক’জন অভিভাবক প্রকৃত ক্ষমতা রাখেন তার সন্তানকে মহামানব করে গড়ে তোলার। আমরা বা অভিভাবকরা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে আছি যে ভালোর ছদ্মবেশে খারাপ কাজ এমন ভাবে এক হয়ে মিলেমিশে আছে আমরা নিজেরাই চিনতে পারছি না, সন্তানদের বা অন্যদের চেনানো তো দূরের কথা। ‘গুরুজনের সকল আদেশ পালন কর, ‘সদা সত্য কথা বলবে, ‘দৃষ্টি সব সময় উপরের দিকে রাখবে’ ইত্যাদি উপদেশ আজকের অভিভাবকরা দিতে পারেন না বা যারা দেন তাদের উপদেশ পালন করা হয় না। কারণ আমরা বা অভিভাবকরা নিজেরাই এ সব উপদেশ মানি না নিজের জীবনে। এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, আমরা দেখতে লক্ষ্য করছি এ সব উপদেশ যা সত্যযুগের আদর্শ ছিল তার কলিযুগে সাফল্য এনে দিতে পারে না। আজকের সমাজে টাকা, নাম, যশ, সাফল্য এ সব কিছুতেই দাম দেয়া হয়। যে সব লোকের কাছে অর্থ আছে , নাম-ডাক আছে, তারাই ‘মানুষ’ নামে পরিচিত। আজকের অভিভাবকরা সেই মন্ত্রেই বিশ্বাসী। মুখে যে যত কিছুই বলুন না কেন মুষ্টিমেয় ক’জন ছাড়া, সবাই সন্তানদের বস্তুবাদী করে তুলেছেন যাতে তারা সাফল্যমণ্ডিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমরা আজ জোর কণ্ঠে বলতে পারছি না ‘ভাল হও’, ‘সত্ হও’। কারণ আমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সত্ ও ভালো হলে তাকে সংসারের চোখে বোকা হতে হবে, দারিদ্র্য হতে হবে-যা কোনও অভিভাবকই চান না। তাই অভিভাবকরা আজ দোটনা নীতিবাক্য সন্তানদের সামনে তুলে ধরছেন, যেমন—‘মিথ্যা বলা পাপ তবে প্রয়োজনবোধে মিথ্যা বলতে হয় ততটুকু যাতে অন্যের ক্ষতি না হয়, টাকার প্রয়োজন আছে তবে টাকার জন্য খারাপ কিছু করা উচিত নয়।’ আজকের সমাজ থেকে যৌথ পরিবার উঠে গেছে , চালু হয়েছে মা-বাবা, ভাই-বোনকে নিয়ে নিউক্লিয়ার পরিবার। এর ফলে ছেলেমেয়ের মধ্যে গড়ে উঠছে না সহনশীলতা, মানিয়ে নেয়া বা ভাগ করার মানসিকতা। দু’ কামরার ঘরে ছেলেমেয়ে দেখছে মা-বাবার ঝগড়া, লুকোচুরি , বড়দের পরচর্চা, পরনিন্দা। ছেলেরা দেখছে বাবা মাকে গৃহিণীর সম্মান বা নারীর মর্যাদা দিচ্ছেন না। মেয়েরা দেখছে ও শিখছে পতিকে কী করে হাতের মুঠোয় রাখতে হয়, পতিকে সেবা করার প্রয়োজন নেই, শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি দায়-দায়িত্ব পালনের কোনও প্রয়োজন নেই বর্তমান যুগে। ছেলেমেয়ে দেখতে পারছে কী করে অভিভাবকরা এত অর্থের মালিক হচ্ছেন। আর অপর্যাপ্ত অর্থ মানেই দু’হাতে খরচ করা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, ভোগ-বিলাসীর জীবনযাপন করা। তাই বাবা-মায়েরা কী করে বোঝাবেন টাকা ছাড়া এই পৃথিবীতে কিছু হয় না? আমরা ছোটবেলা শুনেছি পড়াশোনায় ভালো যে হয় সেই জীবনে সফল হয় এবং এ দিয়ে প্রচলিত কথা আছে, ‘পড়াশোনা করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।’ আজ আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, ডিপ্লোমার সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়ে তন্ন তন্ন করে ঘুরে বেড়াচ্ছি এ দ্বারে ও দ্বারে চাকরির জন্য , অন্ন-বস্ত্রের তাগিদে, যা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দেশের তাবড় তাবড় নেতারা, যাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল এক সোনার বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব। ছেলেমেয়েরা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে—‘পড়াশোনা করে যে গাড়ি চাপা পড়ে সে, অনাহারে মরে সে।’ আমরা বুঝতে পারছি আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের খিচুড়ি হলে মানুষের কী অবস্থা হয়। যারা রঙিন স্বপ্ন দিয়ে নিজেদের জীবনের ছক গড়ে ছিলেন তাদের এই স্বপ্ন রূঢ় সত্যের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, সে বুঝিয়ে দিয়েছে আত্মনির্ভরতাই একমাত্র পথ। আমরা যারা আদর্শকে কেন্দ্র করে জীবনের পথে পা বাড়িয়েছি, আজ দেখছি সেই সব আদর্শ জীবন সংগ্রামের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বা অভিভাবকরা ছেলেমেয়েকে ভালো করে তুলতে চাই, কিন্তু চাই না ভালো করতে বর্তমান সামাজিক অর্থে। আমরা ক্ষণে ক্ষণে আশা তো জাগাচ্ছি এই ঘুণে ধরা সামাজিক কাঠামোটা যদি একদিন ধসে পড়ে তা হলে নতুন কিছু গড়বার মতো জমি অন্তত ছেড়ে দেবে পরবর্তী বংশধরের জন্য। অভিভাবকরা যদি মনস্থির করে নিতে পারেন যে পরের প্রজন্মের কোন্ জয়ে তারা আনন্দিত হবেন ও গর্ববোধ করবেন—সবার চোখে জয়ী না নিজের চোখে জয়ী, তা হলে তারা বেছে নিতে পারবেন সঠিক মূল্যবোধকে। লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন