আলোকপাত

মাদক কী পারে আর আমরা কী পারি

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৫৫
মাদকের বিস্তার বর্তমানে ভয়াবহ। বহু সময় নিয়েই ধীরে ধীরে সে এই আকার ধারণ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই আমরা ঘটনা ঘটার পর সচেতন হই। টেলিভিশন দেখে বাবা-মায়েরা এখন দোষারোপ করছেন তাদের সন্তানদের; বকাঝকা করছেন, সমালোচনা করছেন—‘আজকালকার ছেলে-মেয়েরা এমনই হয়...এই ছেলে-মেয়ে মানুষ করে কী হবে...?’ ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। এ ধরনের সমালোচনা বাচ্চাদের সামনে তারা অনবরত করছেন। যে সব ছেলে-মেয়েরা ইতোমধ্যেই নেশাগ্রস্ত, তাদের তো কথাই নেই। দিনরাত সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। বাবা-মায়ের মনে এতোটুকুও প্রশ্ন জাগছে না, এসব নেতিবাচক মন্তব্য আমাদের সন্তানদের রুখতে পারছে কি-না! মাদকের অধিকাংশ কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, পারিবারিক অশান্তি, বাবা-মায়ের মধ্যে অনবরত ঝগড়া, অতিরিক্ত সমালোচনা, পরিবারের অতিরক্ষণশীল বাধ্যবাধকতা বা কঠোর মনোভাব, নিজেদের কাজে অসফলতা, মাদকের প্রতি ঔত্সুক্য বা আগ্রহ ইত্যাদি নানা কারণে ভুক্তভোগীরা মাদক নিয়ে থাকেন। আবার একাকীত্বের যাতনা থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় হিসেবেও অনেকে মাদক নেয়া শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠে এসেছে অনেক কেস স্টাডিতে। দেখা গেছে, নগর জীবনে বাবা-মা নিজেরা পরিবারের গণ্ডির বাইরে অবসর যাপন, সামাজিক কর্মকাণ্ড বা আনন্দদায়ক বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থেকে বিনোদন লাভ করেন। তারা হয়তো ভাবেন, ‘আমাদের সন্তানকে আমরা একা ফেলে রাখিনি। বাসায় তো কাজের লোক আছে। অথবা ওর সাথে ওর বড় ভাই বা বোন তো আছে।’ কিন্তু দেখা গেছে, যে বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গটাই একটি সন্তানের বড় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে, সেই বয়সে বাবা-মায়ের ন্যূনতম সঙ্গ জোটেনি অনেকের। বাবা-মায়ের মতো সবচেয়ে আপনজনের সঙ্গ হারিয়ে অনেকে সেই বিশ্বস্ত কাজের লোক এমনকি নিকট পরিজনের কাছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। ফলে বাবা-মায়ের বিশ্বস্তজনদের কাছে থেকেও একাকীত্বের প্রকট যাতনা নিয়েই নগরজীবনে তাকে বেড়ে উঠতে হয়। আর বয়ঃসন্ধিকালে পা রাখার পর তারাই ভালমন্দ না বুঝে জড়িয়ে পড়ছে অসত্ সঙ্গে। দিনে দিনে মাদকের করাল গ্রাসে তলিয়ে যায় বাবা-মায়ের বন্ধুত্ব হারানো সন্তানরা। হারিয়ে যায় তাদের সুন্দর মুহূর্তগুলোও। আবার অনেক সময় দেখা গেছে, স্কুল-কলেজ, হল বা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেও মাদকে জড়িয়ে পড়ছে কেউ কেউ। তাহলে কি আমরা আমাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবো না? উচ্চশিক্ষার জন্য আবাসিক হলে থাকার অনুমতি দিব না? নিমেষেই মুছে যেতে দিব? যদি আমরা মাদকের ভয়ে সন্তানকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করি, তা আসলে চোর-ডাকাতের ভয়ে ঘর থেকে বের না হওয়ার মতোই হবে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ব্যক্তি তখন বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে ভালমন্দ যাচাই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মাদকের নেশায় বুদ হলে ব্যক্তি তার স্ত্রী, সন্তান বা মা-বাবার সাথে স্বাভাবিক বনিবনার সম্পর্ক রাখতে পারে না। ঊর্ধ্বতনদের সাথেও মিশতে পারে না সে। কুরুচিপূর্ণ কথা বা ভাষা ব্যবহারের মাত্রা বেড়ে যায়, এমনকি বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও মাদকের ফলে আলসার, ক্যান্সার বা লিভার জটিলতাসহ গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা যায়, যা বিভিন্ন লেখনীতে বহুবার উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে যাদের ছেলে-মেয়েরা মাদকাসক্ত, সেই সব অভিভাবকদের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। তারা পরিবারের সবার জন্য কিছু বিধি-নিষেধ তৈরি করবেন এবং এর সুফল সম্পর্কে সবাইকে পরিষ্কার ধারণা দিবেন। মাদকাসক্ত টিনেজারদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখবেন। মাদক নেয়ার ফলে বর্তমান ও ভবিষ্যতে তার জীবনে কি কি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে এবং কি কি সমস্যায় সে পড়তে পারে, সে বিষয়ে ধারণা দিতে হবে। নেশা এমন জটিল সমস্যা, যা আমাদের জীবনে পদে পদে সমস্যা বয়ে আনতে পারে। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির সচেতনতাই পারে এই সমস্যা থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করতে। তাদের সমালোচনার কুঠুরিতে বন্দী না করে বরং নিজে সচেতন হই এবং তাদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলি। এভাবেই মাদককে আমরা সামাজিকভাবে রুখতে পারি। লেখক : চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানে এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন