ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সাবেক সোভিয়েতভুক্ত রাষ্ট্র ইউক্রেনের সরকার বিরোধী আন্দোলনের রাজনীতি ও রাজনীতির স্থান রাজধানী কিয়েভ দুটোই ইউটার্ন নিয়ে দেশটির স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়া কেন্দ্রিক রাজনীতি এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আগামীদিনে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অধীনে থাকবে না তার আপন নীড় রাশিয়ার সাথে একাকার হয়ে যাবে তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় ক্রমেই দানা বাঁধছে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে রাশিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাবে ইউক্রেনের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে একটি অর্থনৈতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার ফলে দেশটিতে সরকার বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। আন্দোলনে ইউক্রেনের অর্ধেকেরও বেশি জনগণ প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে এসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য জোর দাবি জানান। কিন্তু রাশিয়ার আশীর্বাদে দেশটির ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দাবি উপেক্ষা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে অর্থনৈতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। জেদি ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের অধিক রুশপ্রীতি ও একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তের ফলে জনগণের মাঝে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভের ডালপালা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এদিকে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে ইয়ানুকোভিচ আন্দোলনকারীদের ওপর বল প্রয়োগ করেন যাতে প্রায় ১০০ জনের মত মানুষ নিহত হয়। জনগণের এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টপন্থী আন্দোলনকারীদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। প্রেসিডেন্টের শক্তি ছিল তার প্রতি রাশিয়ার ক্রমাগত সমর্থন। কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে অবশেষে ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ইউক্রেন থেকে রাশিয়ায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। প্রেসিডেন্ট শূন্য ইউক্রেনের অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন দেশটির স্পিকার ওলেকসান্দ্রো তুরচেনভ। ওলেকসান্দ্রো তুরচেনভ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইউক্রেনে আগামী ২৫ মে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। বর্তমানে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণায় ইউক্রেনের রাজনীতি একটি শান্তিপূর্ণ পথ খুঁজে পেতো এই ভেবে যে, আগামীদিনে যিনিই দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন তিনি জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রের সকল প্রকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ রাশিয়ার কারণে ইউক্রেনের রাজনীতি এখন আর সহসায় শান্তির পথ খুঁজে পাচ্ছে না। নিজেদের আশীর্বাদের সরকারকে ইউক্রেনের মাটিতে টিকিয়ে রাখতে না পেরে ইউক্রেনের প্রতি ক্ষুব্ধ রাশিয়া এখন দেশটির স্বায়ত্তশাসিত উপদ্বীপ ক্রিমিয়া নিয়ে পুরানো খেলায় মেতে উঠেছে। ক্রিমিয়া কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থতি একটি উপদ্বীপ। এটির রয়েছে প্রায় ২শ’ বছরের ইতিহাস। সর্বশেষ উপদ্বীপটি রাশিয়ার দখলে আসে ১৭৮৩ সালে এবং তখন থেকে ১৯৫৪ সালে ইউক্রেনকে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটি রাশিয়ার দখলেই ছিল। সাম্প্রতিক করা একটি জরিপে দেখা যায়, ইউক্রেনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়ন যাদের ৬০% রাশিয়ান, ২৫% ইউক্রেনিয়ান এবং ১২% ক্রিমিয়ান তাতার। ২৬.১০০ বর্গ কিলোমিটারের ক্রিমিয়ার সরকার পরিচালিত হয় কিয়েভ কর্তৃক অনুমোদিত একজন প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে। প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার পর ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার পক্ষে-বিপক্ষে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখানকার রুশপন্থীরা রাশিয়ার সাথে একাকার হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন বলে কোন কোন সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়। এরই মধ্যে রাশিয়া ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরে অবস্থিত তার নৌ-ঘাঁটিতে সামরিক মহড়া চালালে গুঞ্জন ওঠে যে, রাশিয়া ক্রিমিয়ায় তার সামরিক হামলা চালাবে। অবশেষে ক্রিমিয়ার নবনির্বাচিত রুশপন্থী প্রধানমন্ত্রী আকসিওনভ (যিনি এখনো কিয়েভ কর্তৃক অনুমোদন পাননি) ক্রিমিয়ার জনগণের শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখার জন্য রুশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানান। ঠিক এই আহবানের পরপরই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রুশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ফেডারেশন কাউন্সিলে ক্রিমিয়ায় সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে সেটি পাস হয় এবং ঠিক তার পরই প্রকাশ্যে ক্রিমিয়ায় রুশ সৈন্য ও সাঁজোয়া যান পাঠানো শুরু হয়।
এদিকে কিয়েভ কর্তৃক ক্রিমিয়ায় রুশ আগ্রাসনের বিষয়ে অভিযোগ তোলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ ঘটনায় রাশিয়ার প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এর জন্য রাশিয়াকে চরম মূল্য দিতে হবে। সর্বশেষ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ৯০ মিনিটের টেলিফোনালাপে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্রিমিয়ায় মোতায়েনকৃত সৈন্য উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে রাশিয়া ক্রিমিয়ায় সৈন্য পাঠানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ লংঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বারাক ওবামা। বিশ্লেষকগণের অনেকে মনে করেন, রাশিয়া ক্রিমিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালানোর মাধ্যমে এবার ক্রিমিয়াকে নিজেদের হস্তগত করতে চায়। কারণ এখন রাশিয়ার নিকট ইউক্রেনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে সামরিক কৌশলগত কারণে ক্রিমিয়াকে হস্তগত করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: গবেষক, সিআইডিএসএস, ঢাকা।
