ইউক্রেনে রুশ সেনা :সার্বভৌমত্ব বনাম জাতিগত বৈরিতা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৪, ২১:১৪
অবশেষে ইউক্রেনে ঢুকিয়া পড়িয়াছে রুশ সেনাবাহিনী। ইউক্রেনের ক্ষমতাসীনরা স্বাভাবিকভাবেই ইহাকে ‘সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন” হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে। যদিও রাশিয়া জানাইয়াছে যে, ইউক্রেনের রুশভাষী জনগোষ্ঠীকে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হাত হইতে রক্ষা করিবার একান্ত প্রয়োজনীয়তার কারণেই সেনা প্রেরণ করা হইয়াছে। এইদিকে ইউক্রেনের মাটিতে রুশ সেনার উপস্থিতিকে দেশটির সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসাবে চিহ্নিত করিয়া রাশিয়ার প্রতি কঠোর পরিণাম ভোগের হুমকি দিয়াছে প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন চিহ্নিত উদারনীতিক গণতন্ত্রের “তৃতীয় ঢেউ’’ চলিবার কালে এক দেশ কর্তৃক অপর দেশ দখল কিংবা এক দেশ কর্তৃক অপরের দেশে সেনা পাঠাইবার মত বিষয়গুলিকে অতীতের বিষয় মনে হইতে শুরু হইয়াছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই অতীত ফিরিয়া আসিল নিদারুণভাবে। প্রধান শক্তিগুলি কর্তৃক ইরাক ও আফগানিস্তানের মত দেশে হামলা, বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে রক্তপাত তথা যুদ্ধ বাধিয়া যাইবার বিভীষিকাময় সময়গুলি আবার যেন ফিরিয়া আসিল। জাতিগত কিংবা ধর্মগত জাতীয়তাবাদের তোড়ে গত এক-দেড় দশকের পৃথিবী কি বীভত্সতাই না প্রত্যক্ষ করিতেছে। ইউক্রেন জাতীয়তাবাদী হানাহানির সর্বশেষ শিকার। সন্দেহ নাই যে, ইউক্রেনে সেনা প্রেরণের মধ্য দিয়া রাশিয়া তাহার পররাজ্য লিপ্সা জানান দিয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, গত দুই-এক বত্সরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু সাফল্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে নূতন করিয়া রাশিয়ার সাম্রাজ্যিক অতীতের দিকে টানিতেছে। অন্যদিক হইতে দেখিলে ইহাও মনে হইতে পারে যে, রাশিয়া যেন নিজের শক্তিমত্তার বিষয়ে নিজেই কিছুটা আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগিতেছে। আর এই কারণেই দুর্বল প্রতিবেশী দেশে সেনা ঢুকাইয়া নিজের শক্তি বিশ্বকে জানান একটি চেষ্টা করিতেছে। ঘটনা যাহাই হউক, রাশিয়া যে কাণ্ডটি করিয়াছে তাহা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নহে। রাশিয়া সেনা প্রেরণের বিষয়ে যে বক্তব্যটি দিয়াছে, তাহা দ্বারা সেনা প্রেরণের যৌক্তিকতা প্রমাণিত না হইলেও, এই বক্তব্যটি গভীরভাবে ভাবিবার বিষয় বটে। মস্কো জানাইয়াছে যে, ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়াতে রুশভাষীদের জীবন বিপন্ন হইবার কারণেই তদস্থলে রুশী সেনা প্রেরণ করা হইয়াছে। উল্লেখ্য, ক্রিমিয়ার প্রধানমন্ত্রী সার্গেই আকসেনভ সেনা প্রেরণের জন্য সরাসরি রুশ প্রেসিডেন্টের বরাবরে আহবান জানাইয়াছিলেন। আকসেনভ জানাইয়াছেন যে, “নিজ জনগণের জীবন ও নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব অনুধাবনকরত” তিনি এই আহবান জানাইয়াছেন। খোলা চোখে দেখিলে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রধানমন্ত্রী অন্য কোন দেশের প্রতি এহেন আহবান জানাইতেই পারেন না। তবে এইখানেই ভাবনার রশি বাঁধিয়া ফেলিলে চলিবে না। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা যে বেআইনী তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু রাষ্ট্র যদি তাহার জনগণের কোন একটি অংশের প্রতি জাত কিংবা ধর্ম কিংবা বর্ণ কিংবা অন্য কোন কারণে বিরূপ ও সহিংস হইয়া উঠে তাহা হইলে কি হইবে? বর্তমান সময়ে অনেক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই জনগণের কোন এক বা একাধিক অংশের প্রতি হিংস্র হইয়া উঠিবার অভিযোগ কিন্তু অনায়াসেই উঠানো যায়। ইউক্রেনের রুশভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্র কিংবা সংখ্যাগুরু ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা কতখানি চড়াও হইয়াছে তাহা লইয়া বিতর্ক অবশ্যই থাকিবে। ঘটনার পিছনে ঘটনা যাহাই থাকুক না কেন, এক্ষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কর্তব্য হইতেছে ইউক্রেন হইতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রুশী সেনা সরাইয়া লইবার উদ্যোগ গ্রহণ। তবে একই সাথে ইহাও খেয়ালে রাখিতে হইবে যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যদি সংখ্যালঘুর উপরে আঘাত হানিতে উদ্যোগী হয়, ইউক্রেন রাষ্ট্র যেন তাহা দেখিয়াও না দেখিবার ভান করিতে পারে। একই সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যেন শেষাবধি যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্মকাণ্ডে পরিণত না হয় সেইদিকেও সজাগ থাকিবার প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। স্নায়ুযুদ্ধ যুগের কথা স্মরণে রাখিলে সজাগ থাকিবার এই প্রয়োজনীয়তাকে বাড়াবাড়ি মনে হইতেই পারে না।