ব্যক্তিগত তথ্য এবং গোপনীয়তার প্রশ্ন

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৯
জীবনে মানুষ কিছু কিছু জিনিস গোপনীয় রাখতে চায়। তার মধ্যে প্রধানত অবৈধ সম্পদের উত্স ও পরিমাণ, নিজের জীবন বা স্বার্থের জন্য হানিকর তথ্য, অবৈধ কাজ-কর্ম এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিরাপত্তা ও যেসকল তথ্য গোপনীয় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে সেগুলো। গোপনীয়তার সঙ্গে মিথ্যার একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। কারণ, স্বাভাবিক পথে গোপনীয়তা রক্ষা করা না গেলে মিথ্যার আশ্রয়ে যেতে হয়। জীবনে এমন কিছু সাংঘাতিক কাজ কখনো কখনো মানুষের দ্বারা সংঘটিত হয়ে যায় তখন মানুষ সত্য কথা বলার চেয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জনকেই শ্রেয় মনে করে। মাঝে মাঝে মানুষ এমন কিছু কাজ করে বসে যখন সে সত্যকে আড়াল করার জন্য কিংবা নিজের স্বরূপ সমাজের কাছে লুকিয়ে রাখার জন্য অন্যের জীবন ধ্বংস অর্থাত্ প্রত্যক্ষদর্শীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। এমনকি নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানকেও মানুষ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়। একটি পাপ কার্যকে ঢাকা দেবার জন্য তখন একাধিক পাপ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। যেমন একটি অপরাধের পর পালিয়ে যাবার পথে কোন গাড়ির চালক কিংবা ডাকাত দল সামনের যেকোন বাধা অতিক্রমে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অথচ বাস্তবতা হলো সার্বিক ঘটনা যার দেখার বিষয় তিনি ঠিকই দেখে নিচ্ছেন। সেখানে লুকানোর কিছু নেই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধান প্রত্যক্ষ সাক্ষী হলো ঘটনা সংঘটনকারী নিজেই। বিধাতা শুধু আমাদের কৃতকর্ম নয় বরং আমাদের অন্তরে লালিত স্বপ্নগুলো সম্পর্কেও জ্ঞাত রয়েছেন। তাই বলা যায়, ইহকাল-পরকালে মানুষের লুকানোর কিছু নেই। সুতরাং লুকিয়ে রাখা বা গোপন রাখার মতো কাজে অংশগ্রহণ না করাই আমাদের জন্য উত্তম ও মঙ্গলজনক। প্রাইভেসি (Privacy) এবং সিক্রেসি (Secrecy) শব্দ দুটির মাঝে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান থাকলেও বাংলা ভাষায় আমরা শব্দ দুটিকেই গোপনীয়তা হিসাবে ব্যবহার করে থাকি। তবে প্রাইভেসি ব্যক্তিগত এবং সিক্রেসি প্রশাসন, রাষ্ট্র বা উচ্চপর্যায়ের চিন্তা-চেতনার সাথে সম্পর্কিত। উন্নত ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তির কারণে আধুনিককালে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষা করা সম্ভব নয়। একথা জানার পরেও মানুষ সময়ে সময়ে উটপাখির মতো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়াস পায়। বৈধ বা সমাজ স্বীকৃত কর্ম ও তথ্য প্রকাশে মানুষের দ্বিধা নেই, ভয় নেই। মানুষ তখনই ব্যক্তিগত তথ্য গোপন করতে চায়, যখন সে নিজেও তাকে অবৈধ, অনৈতিক বলে জানে। অনেক সময়ে মানুষ বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের কথাও গোপন রাখতে চায়, প্রথমত সে ভেবে নেয় সম্পদের তথ্য জানা হয়ে গেলে কেউ হয়তো ধার চাইতে পারে অথবা যথানিয়মে কর কিংবা যাকাত দিতে হতে পারে । তাই সে লুকোচুরির আশ্রয় নেয়। অতীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল না। তাই মানুষ ধাতব কিংবা মজবুত মৃতপাত্রে ভরে টাকা-পয়সা, সোনা, রূপা ইত্যাদি মূল্যবান সম্পদ মাটির নিচে লুকিয়ে রাখতো। পরবর্তী সময়ে এগুলো গুপ্তধন হিসাবে অন্যের হাতে চলে যেত। বর্তমান যুগেও আমাদের অনেক সম্পদ ব্যাংকে অলসভাবে জমা পড়ে আছে। শুধু নিজের দেশে নয়, বিদেশের নির্ভরযোগ্য ব্যাংকেও আমরা সম্পদ বছরের পর বছর গোপনীয়তার সাথে সঞ্চয় করে রাখি। সম্পদ সঞ্চয়ের প্রধান কারণ, মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা বোধ। অবসর জীবনে কি হবে, কয়েক বছর পর কি হবে, বিপদের দিনে কি হবে, সন্তানেরা না দেখলে কি হবে, বড় ধরনের অসুখ হলে কি হবে, এতিম নাবালক সন্তানদের কি হবে ইত্যাদি অনিশ্চয়তা বোধ থেকে নিজের ভবিষ্যত্ জীবনে সুরক্ষা লাভের প্রত্যাশায় কিছ ু লোক বৈধ-অবৈধ উপায়ে সম্পদ আহরণ ও পুঞ্জীভূত করার পথ বেছে নেয়। এই প্রবণতা কারো কারো ক্ষেত্রে ব্যাধির আকার ধারণ করে। তাদের ক্ষেত্রে সম্পদ লুণ্ঠন, আহরণ ও সঞ্চয় করা একটি প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। তাই রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা যদি কল্যাণকামী হয় এবং তা যদি নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিত্সার স্বাভাবিক আশ্বাস ও নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে তাহলে মানুষ অন্তত ভবিষ্যত্ অনিশ্চয়তার কথা ভেবে সম্পদের গোপন ভাণ্ডার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ততোটা আগ্রহী হবে না। তাই সরকারের একটি জনহিতকর রাষ্ট্রীয় দর্শন থাকা দরকার যার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় পরিচয় বিকশিত হবে। সত্ভাবে বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা একটি প্রশংসনীয় ব্যাপার। ঐ সম্পদ অর্জন আরও প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে যখন তা মানবকল্যাণে ব্যয়িত হয়। বিশ্বসেরা ধনী ব্যক্তিদের তালিকা প্রতিবছর প্রকাশিত হয়। তারা সম্পদের পরিমাণ গোপন না করে বরং আত্মবিশ্বাসের সাথে তা বিশ্বসমাজে প্রকাশিত করে সম্মানিত বোধ করেন। যদি একই চেতনা সামনে রেখে প্রতিবছর প্রতিদেশে সেরা করদাতা, যাকাতদাতা ও দানবীরদের তালিকা প্রকাশিত হয় তাহলে সমাজ উন্নয়নে বা মানবসেবায় সম্পদশালী মানুষেরা আরো উত্সাহী হয়ে উঠবে। গোপনীয়তা কোন কোন সময়ে সমাজের প্রতি একটি হুমকিস্বরূপ। কারণ এর বাতাবরণে প্রশাসন বা কর্তাব্যক্তিদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নটি চাপা পড়ে যায়। এমন কি তা কোন একনায়কের স্বৈরতান্ত্রিক অভিসন্ধিকে ঢাকা রাখতেও সহায়তা করে। জননিন্দিত স্বৈরশাসক কিংবা কোন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্পোরেট অফিসের অপকর্ম ঢাকা দিতে কখনো গোপনীয়তাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। মুক্ত সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি একজন মানুষের নিরাপত্তা, সুখ, শান্তি, আরাম, আয়েশ নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাধীন, ঝামেলামুক্ত জীবন যাপনের পথ সুগম হয়। অন্যপক্ষে রাষ্ট্রীয় বা অফিসিয়াল গোপনীয়তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতিকে আড়াল করার জন্য ব্যবহূত হয় । সময়ে সময়ে বিরাট দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে ঢাকা দেয়ার জন্য ‘স্পর্শকাতর ’ ও ‘ অতিগোপনীয় ’ শব্দগুলো বর্ম হিসাবে ব্যবহার করা হয়। তবে, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত পর্যায়িত গোপনীয় বিষয়গুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবশ্যই গোপন রাখা অনস্বীকার্য। অন্যপক্ষে, যে প্রাইভেসির নামে সমাজবিরোধী, অবৈধ, অনৈতিক সম্পর্ক, কার্যকলাপ, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, গুম, মাদকের বিধ্বংসী বিস্তার আড়াল করা হয়, সেই ধরনের প্রাইভেসি কখনোই কোন সমাজ বা দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না। সমাজকে অস্বীকার করে আমরা জীবনযাপন করতে পারি না। তাই সমাজ, রাষ্ট্র বা ধর্ম অনুমোদিত পথ ও পন্থা অবলম্বন করাই প্রতিটি মানুষের জন্য উত্তম। তখন আর জীবনের কোন কিছু লুকোবার কিংবা গোপনীয় রাখার প্রয়োজন পড়ে না। পৃথিবীর অনেক জিনিসই মানুষকে আকর্ষণ করে। কেউ সহজে পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্দিষ্ট সময়ের পর আমাদের বিদায় নিতে হবে। এই বোধ সহজে মানুষের মনে আসে না। তাই এই সময়ের মধ্যে জীবনটা কিরূপ হওয়া দরকার? কি পরিমাণ তথ্য গোপন রাখা দরকার? অতৃপ্ত ইন্দ্রিয়কে কতোটা পরিমাণে তৃপ্তি বা প্রশ্রয় দেয়া সমীচীন? এসকল প্রশ্ন আমরা নিজেকেই করতে পারি। নিজেকে জানতে পারলে আমরা এই নশ্বর পৃথিবীর লুকোচুরি খেলা থেকে দূরে থাকতে পারবো। যেহেতু অনন্তকাল এখানে থাকা যাবে না, তাহলে গোপনীয়তার প্রয়োজন কি? কারণ, মৃত্যুর পরে এসকল গোপনীয়তার কোন মূল্য থাকবে না। তাই সীমিত এই জীবনে অসীম সম্পদ ও লোভ-লালসার পেছনে না ছুটে আমাদের উচিত পরিকল্পিতভাবে জীবনযাপন করা। সৃষ্টি জগতের সবকিছুরই একটা পরিমিতি আছে। শেষ আছে। সঠিক সরল পথে জীবনকে পরিচালিত করা গেলে প্রাইভেসি কিংবা সিক্রেসি নিয়ে ততোটা ভাবনার প্রয়োজন পড়ে না। লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন