মাত্র এগার দিনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী দুইজনে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান গত বছর মার্চ মাসে। তাদের বিয়ের পর থেকেই সব সময় দুইজনে একসাথে থাকার চেষ্টা করতেন। পরিণত বয়সে তাদের কোন একজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে, কি দেশে বা বিদেশে, দেখা যেত একজন নিজের সব কাজ বাদ দিয়ে অপরের পাশে থেকে সেবা করার চেষ্টায় থাকতেন । তার স্ত্রী জেব উন নিসা মজিদ মারা যান ১৪ মার্চ ২০১৩ এবং মজিদ উল হক ২৫ মার্চ ২০১৩ তারিখে। বনানী সামরিক কবরস্থানে একই সারিতে দুইজনে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। মন্ত্রী মেজর জেনারেল মজিদ উল হক সেনা কর্মকর্তা থেকে রাজনীতিতে আসেন। তিনি বিএনপি-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। অমায়িক, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, স্পষ্ট ভাষী ও সাহসী একজন মানুষ ছিলেন। অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করেননি। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার মতামতকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। পরবর্তীতে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে মিল না হওয়ায় নির্দ্বিধায় প্রিয় দল থেকে পদত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি আমাদের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ক্রিয়াকলাপে খুব হতাশ ছিলেন। দেশের প্রতি তার প্রচণ্ড মমত্ববোধ ছিল। মন্ত্রী ছিলেন। নিজ জেলা মাগুরার উন্নয়নে তিনি ব্যাপক অবদান রাখেন। ২০১২ সালে রাইটার ইঙ্ক থেকে তার স্মৃতিকথার প্রথম অংশ unknown, unhonoured and unsung নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। এই বই ছিল তার রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত সকল ঘটনাবলী নিয়ে। দ্বিতীয় খণ্ড ছিল তার রাজনীতি জীবন নিয়ে যা মৃত্যুর আগে তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। জেনারেল মজিদ উল হক সাহেবের হার্ট এর সমস্যা ছিল । ১৯৭৫ সালে প্রথম তার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং তিন মাস বিছানায় শুয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজে সামরিক হাসপাতালের তিনজন ডাক্তার ও একজন নার্স নিয়োগ দিয়েছিলেন মজিদ উল হকের বাসায় সার্বক্ষণিক সেবা-যত্ন করার জন্য। পরবর্তীতে তার অনেক বার হার্ট এর প্রবলেম হয় এবং শেষ দশ বছর তিনি বুকে মেশিন লাগিয়ে বেঁচে ছিলেন । অথচ তার মৃত্যু হার্ট অ্যাটাকে হয়নি, হয়েছে ঠান্ডাজনিত কারণে। আরও একটা কারণ ছিল। তিনি তার স্ত্রীকে অসম্ভব ভালবাসতেন। শোকে স্ত্রীর মৃত্যুর ১১ দিনের মাথায় তিনিও চলে যান এবং মৃত্যুর সময়ে তার অবচেতন মন থেকে হাসপাতালে নিজ স্ত্রীর ডাক নাম বারবার বিড়বিড় করছিলেন। সেটাই ছিল তার জীবনের শেষ কথা। তার স্ত্রীর অসুস্থতার দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজের অসুস্থতাকে তুচ্ছ করে সবসময় স্ত্রীর পাশে ছিলেন। তার স্ত্রী অত্যন্ত সম্মানিত, আন্তরিক, দানশীল ও বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। তিনি বেগম রোকেয়ার স্কুলে পড়েছেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। সমাজ সেবায় বেগম মজিদ উদার ছিলেন। দান করতেন গোপনে। তার প্রতিষ্ঠিত মাগুরা সমাজ কল্যাণ সংঘ অনেক গরীব মহিলাদের কর্মসংস্থান করেছে।
সেনা কর্মকর্তা হিসাবে মজিদ উল হকের কর্মদক্ষতা অনুকরণীয়, কিন্তু রাজনীতিতে এসে তিনি অতোটা সফল হতে পারেননি। যে বিএনপিকে তিনি নিজ হাতে গড়েছিলেন সেই বিএনপির অধঃপতন তাকে খুব কষ্ট দিতো। পরিণত বয়সে তিনি রাজনীতি থেকে সরে আসার পর পারিবারিক কোন অনুষ্ঠান ছাড়া কোন সভা সেমিনারেও যোগ দেননি। পরবর্তীতে দু’তিনটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাত্কার দেয়া ছাড়া তিনি জনসম্মুখে তেমনভাবে আসেননি। স্ত্রীর মৃত্যুর চারদিন পর শোকসভায় তিনি খুব আবেগঘন কিছু কথা বলেছিলেন। স্ত্রীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার জীবনে সরকারি সেনা হিসেবে, আমলা হিসেবে, রাজনৈতিক অঙ্গনে চলাফেরার কারণে বহু বক্তব্য বহু বক্তৃতা দিয়েছি। যে কোনো মানুষের পক্ষে তার স্ত্রীর সম্পর্কে কিছু বলা বেশ কঠিন ব্যাপার। ঊনষাট বছর আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি, সুখে দুঃখে, উপরে উঠেছি, নিচে নেমেছি, আনন্দ পেয়েছি, দুঃখ পেয়েছি, আঘাত পেয়েছি, কিন্তু তিনি আমাকে কখনো কাউকে আঘাত করতে দেন নাই।”
অসাধারণ এই দুই মানুষের আত্মার শান্তি কামনা করি।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
