উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি। এতে নির্বাচনমুখি মানুষ ভোট দিয়েছে এবং রায়েও ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে। এর একদিন পর জোটনেত্রী এক জনসভায় নির্বাচনের পর সরকার পতনের আন্দোলনের কথা বলেছেন। উপজেলা নির্বাচন এখনও শেষ হয়নি। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে বেশ উত্সবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ভোট গ্রহণকালে বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন সংহিংসতাও ঘটেছে। দুই দফা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি জয়ী হয়েছে ৯৪ টিতে। আওয়ামী লীগ ৭৮টিতে। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে জামায়াত কিছু এলাকায় জনসমর্থন ধরে রাখতে সামর্থ্য হয়েছে। ইতিমধ্যেই আন্দোলনের নামে হাঁকডাক শুরু হয়েছে। এবং এতে মানুষের মনে একপ্রকার আশঙ্কা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ভোটের ফলাফল পাবার পর বিএনপির নেতৃবৃন্দ আন্দোলন নিয়ে যেমন নানা রকম ইঙ্গিত করছেন তেমনি ভোটকারচুপি বা সরকারের আচরণ নিয়ে মন্তব্য করে চলেছেন। এসবের কারণ কী?
সর্বদা একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, প্রধান দুই দলের মধ্যে কোনো সমঝোতা নেই। পাঁচ বছর পর জাতীয় নির্বাচন এলেই একদল মেনে নেয় অন্য দল তা প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচন নিয়ে পরস্পরের মধ্যে ভয়ঙ্কর রকম বিষোদ্গার চলতে থাকে। নির্বিচারে রক্তপাত, খুনোখুনি এমনকি হত্যাযজ্ঞও ঘটে। এগুলো প্রতি নির্বাচনেই একপ্রকার ‘নির্বাচনী অভ্যাসে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ সহিংসতার শেষ কোথায়? এমনটা কী চলতেই থাকবে। সমস্যার মূলে আসলে কী? নিশ্চয়ই আদর্শগত দ্বন্দ্ব। আর এর ফলে সমঝোতা হচ্ছে না। যে দলই ক্ষমতায় থাকবে তারটা মানা যাবে না, মানলেই রাজনীতি শেষ! অন্য দল এতে করে বিপরীতটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন— এই হলো প্রাত্যহিক চিত্র। এমন মানসিকতা ক্রমাগত জটিল ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। ক্ষমতায় যেই থাক, তার ভাবনাচিন্তা যতোই সঠিক ও স্বচ্ছ হোক, বিরোধীরা তা মানবে না। জাতীয় স্বার্থ অনুসারী হলেও তা মানা যাবে না, বিরোধিতা করতেই হবে। এ যেন বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা। নিজের নাক কেটে এক প্রকার পরের যাত্রা ভঙ্গ করা। কিন্তু এর নিষ্পত্তিটা কোথায়? সমাধানের পথই বা কী? এক্ষেত্রে রক্ষাকবজ হতে পারে সংবিধান। কিন্তু সংবিধানও তো ক্ষতবিক্ষত। বিরোধীদের মতে, সংবিধান সংশোধন করা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের জোরে। সংবিধানকে ‘দলীয়’ করা হচ্ছে। যে সংবিধানের কথা বলে তাও তো প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু সমাধানের পথটি একমাত্র সাংবিধানিক বিধির মধ্যেই করতে হবে। নইলে তার বিকল্প কিছু নেই। কারণ, আইন প্রণয়নের কাজটি জনপ্রতিনিধিদের দ্বারাই হয়। সেটি একটি ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া। আদর্শগত বিরোধ যতোই থাক সংবিধানই আমাদের একমাত্র রক্ষাকবজ। সংবিধান বহির্ভূত সমাধান সম্ভব নয়।
বর্তমান সরকার সংবিধানিক বিধি মেনে পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। আর ক্ষমতায় থাকলে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিছু ভুলত্রুটিও হয়— যা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে অসামর্থ্য হয়। অনেক সিদ্ধান্ত হয় প্রশ্নবিদ্ধ। তাতে স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। চাওয়া-পাওয়ার হিসেব-নিকেশে তাদেরও প্রত্যাশা পাল্টে যায়। এতে দলের অবস্থান, ত্যাগী কর্মীর মূল্যায়ন, বাদ পড়াদের ক্রোধ-হতাশা নানা রকম ঘটনা ঘটতে থাকে। আর এসব ঘটান হয় সরকারি দলেই বেশি । উপজেলা নির্বাচনে এবার প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি হয়েছে সর্বাত্মক দলীয়ভাবে। বিএনপি তো জোটবদ্ধভাবে অনেক হিসেব কষেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনটিকে তারা শুধু মনোবল চাঙ্গা করার বিষয় হিসেবেই নেয়নি, একইভাবে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের ভিত তথা জনমুখি আন্দোলনের টেস্টকেস হিসেবেও গ্রহণ করেছে। তাইতো নির্বাচন শেষ না হতেই জোটনেত্রী আন্দোলনের ডাক দিয়ে প্রস্তুতির কথা বলেছেন। সংবিধানের তোয়াক্কা না করে মাঠের রাজনীতির পথে জনগণের সমর্থন চেয়েছেন। এতে দলটির স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের বাইরে কোনো কৌশলগত রাজনীতির প্রকাশ ঘটেনি। এটি গণতান্ত্রিক মনোভাবও নয়, বরং উগ্রতারই প্রকাশ। গত অবরোধ-নৃশংসতার বিপরীতে বর্তমানে বিরাজমান সুস্থ পরিবেশটুকু আবার নস্যাতের চেষ্টা চলছে আর এ নিয়ে জনমনে আশঙ্কাও দেখা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রশ্ন, কোন প্রক্রিয়ায় জঙ্গি নির্মূল হবে বা তার সংশ্রব ত্যাগ করবে সে সব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। সংবিধানকে অস্বীকার করে নির্দলীয় সরকার আর পুনঃনির্বাচনের ডাক গণচেতনার পরিপন্থী। এতে করে আশঙ্কা শুধু বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত, শিক্ষা-দীক্ষায় বা অন্যান্য মহলে অস্বস্তি— যে ছয় মাস পরে এই পরিবেশ আদৌ থাকবে কি-না! উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে উনিশ-বিশ হতেই পারে কিন্তু সাংবিধানিক পথ এড়িয়ে সমাধানের পথ পাওয়া যাবে না। জয়-পরাজয়ে দুই দলেরই প্রতিক্রিয়া আছে কিন্তু তার মানে এই নয় জনসমর্থনের নামে আবার সেই পুরনো সহিংসতা ফিরে আসবে, কায়েম হবে অসাংবিধানিক কোন পথ। মতে-আদর্শে অমিল হলে শক্তি প্রয়োগে নয় সংবিধান স্বীকৃত পথেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। নইলে রাষ্ট্রেরই অভিভাবকত্ব তো হুমকির মুখে পড়ে।
বৃহত্ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির কর্মকাণ্ডে অতীতমুখিতা বা স্ববিরোধী ভ্রান্তপন্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মতাদর্শগত গরমিল থাকলেও সাংবিধানিক পন্থায় তাদের এগুতে হবে। সহিংসতার বদলে উদার ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। নির্বাচনে তাদের জয় হয়ে থাকলে সেখানে সমঝোতা ও সহায়তামূলক রাজনীতি সৃষ্টিই কাম্য। বড় দল হিসেবে উদার ও সহনশীলতার চর্চা জরুরি। গত সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নেয়নি, এর বদলে যে সহিংসতার পথ বেছে নেয়—তা ছিল দায়িত্বহীন ও বিধ্বংসী। এটি কেউ মেনে নেয়নি। বরং এর বিপরীতে যে সাংবিধানিক সরকার গঠিত হয়েছে—তাই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এর প্রমাণ এখন পর্যন্ত বিরোধীদের কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি। সরকারি ভাষায়, ‘তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে।’ নৃশংসতার বিরুদ্ধে থাকার কারণে এখন পর্যন্ত জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান ব্যক্ত করেনি। সরকারি দলের সঙ্গে মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিবেচনামূলক মনোভাব নিয়ে জনগণের পক্ষে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসের বদলে সুশিক্ষা দেয়া জরুরি। চৌকস যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করাটা এখন সময়ের দাবি। আশির দশকের গোড়ায় বিএনপির অঙ্গ ছাত্রসংগঠনে যে নেতৃত্ব ছিল তার যুগ শেষ হয়ে গেছে, বৃহত্ দল হিসেবে— দায়িত্ব নিয়ে অছাত্রদের বদলে মেধাবী ও তরুণ নেতৃত্ব কায়েম করতে হবে, নইলে সম্মুখে চলার পথ থেকে তারা বিচ্যুত হবে। গত আন্দোলন যেভাবে ভেস্তে গেছে, উপজেলা নির্বাচনের ফল দেখে আবার সেই আন্দোলনের কথা বললেই কেউ মাঠে নেমে আসবে না। সংবিধানকে বাইরে রেখে শুধু ক্ষমতার লোভ, আর মসনদের আকর্ষণকে কেউ স্বীকৃতি দেবে না। জনগণের এ অভিজ্ঞতা পূর্ব-নির্ধারিত, ক্ষমতার এরূপ পালাবদলে জনগণের কোনো আগ্রহ কখনোই ছিল না। স্বস্তিকর, নিরাপদ-নিরুপদ্রব জীবনই তাদের কাম্য। সে কারণে, ক্ষমতায় কে থাকল না থাকল তাতে যায়-আসে না। এজন্য গত্বাঁধা আন্দোলনের কথা বলে মানুষের মাঝে ভীতি ছড়ালে হিতেবিপরীত হবে। নির্ধারিত কোনো ফলও বয়ে আনবে না।
রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষ যেমন কামনা করে না, তেমনি উন্নততর জীবনের জন্য মানুষ সুশাসন ও নিরাপত্তা চায়। এর জন্য সর্বত্র দরকার অভয় ও নিরাপদ গণতান্ত্রিক পরিবেশ। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার কথা আমরা বলি কিন্তু এ লক্ষ্যে যে পরিকল্পনা নির্ধারণ ও তার যথাযথ প্রয়োগ করার নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা— তা আমরা কায়েম করতে পারছি কই! সম্মুখে চলার জন্য বিভিন্ন সময় পাশ্চাত্যের অনেক দেশের উদাহরণ টানি কিন্তু কার্যকর তার প্রয়োগ কোথায়। তরুণ ও মেধাবী ছাত্ররা দেশের বাইরে গিয়ে ভালো ফল করছে কিন্তু এদেশে তাদের কর্ম ও বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারিনি। একবিংশ শতাব্দীর যে চ্যালেঞ্জ সেটি শুধু রাজনৈতিক কোন্দল আর কুত্সার মধ্যে আটকে রাখলে আমাদের অন্ধকার ছাড়বে না। এজন্য সরকারের উন্নয়নের পরিকল্পনা ও প্রয়োগ দরকার। কারণ, প্রচুর মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, তারা কাজ চায়, দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধকে লালন করে। সংবিধানের অভিভাবকত্বকে বিশ্বাস করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। এজন্য দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে এগুতে হবে। সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য পরিশুদ্ধ রাজনীতি অত্যাবশ্যক। যেটি স্থানীয় পর্যায় থেকে দৃশ্যমান হওয়া দরকার। সংবিধান প্রদত্ত জনগণের শাসন সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল সুশাসন কায়েম হবে। তবে এমনটা অবশ্যই, সম্পূর্ণরূপে বা তাত্ক্ষণিক পাওয়া যাবে না, অন্তত প্রক্রিয়াটুকু দৃশ্যমান হলেও তো মানুষ সন্তুষ্ট হবে। সরকারের এ চ্যালেঞ্জটুকু এখনই বুঝতে হবে।
লেখক:অধ্যাপক , বাংলা বিভাগ \ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
