স্মৃতিতে ভাস্বর আবদুল জলিল

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৪, ২১:২৩
উত্তরবাংলার ঐতিহ্যবাহী নওগাঁ কে ডি উচ্চ বিদ্যালয় (স্থাপিত ১৮৮৪ খৃ.)। ১৯৫১ সাল। পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে এক কিশোর। নওগাঁর দক্ষিণে অনতিদূরের গ্রাম চকপ্রাণ থেকে এসেছে। বৃত্তি পাওয়া মেধাবী ছাত্র। ছেলেটি নম্র স্বভাবের। সুদর্শন। আচার-আচরণ মার্জিত। কে ডি স্কুলে আমি তার এক বছরের সিনিয়র। বাড়ি নওগাঁ শহরে। বিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থা থেকেই আমাকে সে বড় ভাইয়ের মত সম্মান করত। কালক্ষেপণ না করে তার নামটি বলি ছেলেটির নাম মো. আবদুল জলিল। কে জানত আমাদের ‘জলিল’ জুনিয়রদের ‘জলিল ভাই’ একদিন বংলাদেশ সরকারের মর্যাদাপূর্ণ বাণিজ্যমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করবে। আজ ৬ মার্চ। অনুজপ্রতিম আবদুল জলিলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তার রাজনীতিক জীবনের গভীরে প্রবেশ না করে এখানে তাকে নিয়ে স্মৃতিপটে আঁকা দু-চার কথা বলার আমার এ প্রয়াস। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্ষেত্র আমাদের অভিন্ন রইল না। জলিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হল। ফজলুল হক হল তার আবাসস্থল। ঢাকায় এলে জলিলের সাথে দেখা করতাম। ঢাকার কাজকর্মে সে আমাদের অকুণ্ঠ সাহায্য-সহযোগিতা করত। ১৯৬৫ সাল। আবদুল জলিল লন্ডন চলে গেল ব্যারিস্টারি পড়তে। পরের বছর কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে আমিও পাড়ি দিলাম ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। ১৯৬৬-এর ১৪ সেপ্টেম্বর, আজও মনে পড়ে, লন্ডন হিথরো বিমানবন্দরে তার সাথে আমার সাক্ষাত্। পরের দিন কিছু কেনাকাটায় জলিল লন্ডনের দোকানপাটে আমাকে নিয়ে যায়। দু’দিন বাদেই আমি চলে গেলাম আমার গবেষণা কর্মস্থল লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে। জলিল যথারীতি লন্ডনে থেকে গেল। মাঝেমধ্যে তার লন্ডনের বাসায় এসেছি। ১৯৬৮-এর ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাত ‘৬৯-এর ১ জানুয়ারি ভোর অবধি নতুন খৃষ্টীয় বছরকে স্বাগত জানিয়ে আমরা হই-হুল্লোড় করেছি। সঙ্গে ছিল আমারই স্কুল সহপাঠি ও বাল্যবন্ধু (বর্তমানে নওগাঁয় বসবাসরত) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পাকিস্তানের তত্কালীন একমাত্র স্নাতকোত্তর ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপনার পাট চুকিয়ে ‘৭০-এর ডিসেম্বরের শেষভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগে যোগ দেই। ‘৭১-এর দীর্ঘ নয় মাস উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় ঢাকাতেই কাটালাম। সে সময়ের কিছু ঘটনাপ্রবাহ পত্র-পত্রিকায় তুলে ধরতাম। আবদুল জলিল তখন ওপার বাংলায় মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার। আমার অনুজ মো. শাহিদুর রহমান (বর্তমানে নওগাঁ তুলাপট্টি জনতা ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসার) তার অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েই ঢাকায় আবদুল জলিলের ফিরে আসা এবং বৃহত্তর রাজনীতিতে প্রবেশ। তিনি হলেন- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। সংসদ সদস্য। সাধারণ সম্পাদক। প্রেসিডিয়াম সদস্য। বাণিজ্যমন্ত্রী। কালক্রমে হলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এই সঙ্গে যুক্ত করতেই হয়, বক্তৃতা-বিবুতিতেও আবদুল জলিল ছিলেন পারঙ্গম। ঢাকার গ্রীণ রোড, ধানমন্ডি, গুলশানে তার বাসায় যেতাম। মতিঝিলে চেয়ারম্যানের চেম্বারে, মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও আমরা কিছু সময় কাটাই। নওগাঁর নানা উন্নয়ন কর্মে আবদুল জলিলের অবদান অপরিমেয়। ব্যাংকের ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতেও তিনি নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। সমস্যাপীড়িত মানুষের প্রতি নিরন্তর তিনি তার অকৃপণ সাহায্যহস্ত বাড়িয়ে দিতেন। বার্ধক্যজনিত রোগ ক্রমেই এ নেতাকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে পৃথিবীর ধূলিধূসরিত রৌদ্রকরোজ্জ্বল সংসারের মায়া ত্যাগ করে আবদুল জলিল চলে গেলেন অনন্তের কল্যাণলোকে। তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছলে সর্বস্তরের মানুষ এই প্রবীণ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নওগাঁ নওজোয়ান মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেখানে জানাজা শেষে তার গ্রামের বাড়ি চকপ্রাণে পিতা-মাতার কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আবদুল জলিল দীর্ঘজীবন লাভ করেন। জীবনযুদ্ধে জয়ী হন। জয়ী হয়েছেন দেশের জন্য উজ্জীবিত কর্মের সাধনায়। দেশপ্রেমের মহানব্রতে উত্সর্গীকৃত আবদুল জলিলের বর্ণাঢ্য ও কৃতিত্বপূর্ণ বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে রইবে। বেদনাবিধুর এই দিনে শোকার্ত পরিবারের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা। রাজনীতি অঙ্গনের এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে, এই বড় মাপের মানুষটিকে আমরা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করছি। নিবেদন করছি তার প্রতি অশেষ ভালবাসা, প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। আমাদের স্মৃতিতে সর্বজন প্রিয় আবদুল জলিল রইবেন চিরভাস্বর। লেখক: সাবেক প্রফেসর জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন