বাহুল্য বর্জিত বিশ্ব :আবেগ ও দেশপ্রেম

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৪, ২১:৩০
উন্নত বা অগ্রসর দেশগুলোর মানুষ অতি আবেগ বর্জিত। মাঝে মাঝে মনে হবে এদের বোধকরি কোন অনুভূতি নেই। নিস্পৃহ নির্লিপ্ত প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে বাহুল্য বর্জিত এরা কি দেশপ্রেমী নয়? এদের কি মন ও মগজে দেশাত্ম বোধ নেই? থাকলে এরা আমাদের মত হৈ চৈ করে না কেন? কেন মাঠ কাঁপিয়ে দেশ কাঁপিয়ে জাতির বিবেক কাঁপিয়ে দাপাদাপি করে না? সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের উন্মাদনাতেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলেছে কিছুটা। গোড়াতে বলে রাখি এশিয়া কাপ অনুষ্ঠানের কৃতিত্ব ও এ পর্যন্ত তার সার্থকতায় সরকারের সাথে আমরাও গর্বিত। মাঝখানে এমন সময় এসেছিল মনে হচ্ছিল এ দেশে আর কোনদিন কোন সুস্থ হাওয়া বইবে না, চারদিকে সন্ত্রাস আগুন আর ধ্বংসলীলা দেখে জন্মভূমিকে চেনাও দায় হয়ে পড়েছিল মাঝে মাঝে। ধর্মান্ধ উগ্র জঙ্গিবাদ, জাতীয়তাবাদ আর সন্ত্রাস মিলে সমাজকে প্রায় ভঙ্গুর অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার উল্লাসে মনে হচ্ছিল মাঠে যদি কোনদিন ফুটবল বা ক্রিকেট হয়ও বলের পরিবর্তে একে অপরের মুন্ডু ব্যবহারেও পিছিয়ে থাকবে না। কিন্তু সে অভিশাপ বাংলার মানুষ ব্যর্থ প্রমাণ করে দিয়েছে। শুধু বাংলার মানুষ কেন এশিয়া কাপে খেলতে আসা সমস্যা জর্জরিত দেশগুলোর বেলায়ও এ কথা সত্য। আফগানিস্তানের কথাই ভাবুন। মাঠ জুড়ে এদের দাপট, কৌশল, হেয়ারস্টাইল, টিম স্পিরিট দেখে কি বলবে এখনো আফগানিস্তানে তালেবানের আছর আছে? ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে আসা দেশের তরুণদের দেখে পুলকিত হয়েছি, বোমা গ্রেনেড বা অস্ত্রের পরিবর্তে আফগানিদের হাতে আজ ব্যাট বল। বাদশাহ জহির, বাদশাহ দাউদ হয়ে সমাজতান্ত্রিক পথে যাত্রা, যাত্রা ভঙ্গ করে বা আন্তর্জাতিক চক্রান্তে তালেবানি রাজত্বে অথবা খপ্পরে পড়া আফগানিস্তানও আজ রুখে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। একেই বলে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতার শক্তি। শ্রীলঙ্কার বেলায়ও বাস্তবতা মসৃণ কিছু নয়। তামিলদের সাথে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের অবসান হবার পরও এখনো পুরোপুরি ক্ষান্ত হয়নি বা নিভে যায়নি আগুনের শেষ আঁচ, এদেশের ক্রিকেটারদেরও আছে নিরাপত্তাজনিত ভয়। পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশের সমস্যাও কম কিছু নয়, পাকিস্তানে প্রায় প্রতিদিন মানুষ মরছে, জঙ্গিবাদ, সীমান্ত সংঘর্ষ আর দীর্ঘকালের সেনা শাসনে গণতন্ত্রবিহীন পাকিস্তানের বাস্তবতাও ভয়াবহ। বিশ্বের যে কোন দেশ, যে কোন জাতির মনে আতঙ্ক তৈরি করা এই দেশটির ক্রিকেট কিন্তু থেমে থাকেনি। সত্য বলতে গেলে মানতেই হবে হারতে হারতে জিততে পারার রেকর্ডে এদের ধারে কাছে কেউ নেই। শূন্য থেকে খেলাকে নিজেদের করতে পারা আর অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যে তুলনাহীন পাকিস্তানের ক্রিকেট চিরকালই উপভোগ্য। সে তুলনায় ভারতীয় ক্রিকেটের শান শওকত বা প্রচার বেশি হলেও বাস্তবে ম্যাড়মেড়ে। তারা যে খেলাটি জিতবে সেটির শুরুতেই এ বিজয়ের আভাস পাওয়া যায়। যেটি হারবে সেটিও আঁচ করা বা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। ফলে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা তেমন নেই। প্রশ্ন হচ্ছে অতি আবেগ বা অন্ধ সমর্থন থাকলে এ জাতীয় ভালোমন্দ কিংবা বাছ-বিচার বাদ দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠে জেদি ও একরোখা। একটা সময় ছিল যখন আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলাম। আমাদের যৌবনে ইংল্যান্ডের চৌদ্দ নাম্বার বা আঞ্চলিক দলগুলো ক্রিকেট খেলতেই আসলেই ধন্য হয়ে যেতাম আমরা। যেকোন ক্রিকেট ক্লাবের সদস্য ইংরেজ খেলোয়াড়দের মাথায় তুলে ম্যাচ দেখার জন্য ছুটতাম। পাক-ভারত, শ্রীলঙ্কার মূল দল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকার মূল দল আসলে বা আসতে পারে সে ছিল স্বপ্ন বিলাস। আজকের তারুণ্য সে দিক থেকে অনেক অগ্রগামী, ভাগ্য তাদের বিড়ম্বনায় রাখেনি। ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া বাংলাদেশের মাটিতে ব্রায়ান লারা, সচীন টেন্ডুলকার বা ওয়াসিম আকরাম এখন দুষ্প্র্রাপ্য কিছু নয়, দুর্লভও নয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সাকিব আল হাসানই এখন বিশ্বের শিরোনাম, অস্ট্রেলিয়ার মত রক্ষণশীল দেশের আমদানি করা খেলোয়াড়। এই অর্জন বা বিশ্ব দরবারে নিজেদের মত করে নিজেদের দল নিয়ে জাতীয় প্রতীক হয়ে লড়াই করতে পারার পরও হীনমন্যতা কি আমাদের মানায়? অথচ কি জানি কোন অজ্ঞতা বা অজানা কারণে আজো আমরা প্রতিবেশী ভারত কিংবা একদা অভিন্ন পাকিস্তানের নামে উন্মাদ। বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের বলি তোমরাইতো রাত-দিন ইলেকট্রনিক বাহনে দুনিয়ার সাথে যুক্ত থাকো। তোমরা যে কোন দেশের যৌবনের সাথে পাল্লা দিয়ে রয়েছো, তোমাদের ভুবন আজ বঙ্গোপসাগর থেকে আটলান্টিক, বাল্টিক বা প্রশান্ত পাড়ে বিস্তৃত। তোমরাই বল এক দেশের মানুষ কি আরেক দেশের পতাকা মুখে এঁকে উন্মাদ হয়ে নিজের দেশের স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যায়? সমর্থন বিষয়টা অবশ্যই মানবিক, এই যেমন বিশ্বকাপ ফুটবলে চেনা নেই জানা নেই ভালো করে উচ্চারণ করতে পারা যায় না এমন দুটো দেশ ও খেলোয়াড়দের জন্য আকুল হয়ে উঠি আমরা, সে ক্ষেত্রে একটা ছাড় আছে। না খেলা হয় আমাদের দেশে, না আমরা খেলি বিশ্বমানের। খেলি না বলেই বিশ্বমানের দুটো দেশ আমাদের লুকায়িত ইচ্ছা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ক্রিকেটে তো সে বাস্তবতা নেই। তাছাড়া ভারত পাকিস্তান উভয় দেশের সাথে আমাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের কারণে পাকিস্তানের প্রতি অন্ধ সমর্থন বা দানবীয় অতি উল্লাস না জায়েজও বটে। এই ক’মাস আগেও আমরা এসব ইস্যুতে নিজেদের ক্ষত-বিক্ষত করেছি। উন্নতি, অগ্রগতি ভুলে দেশের সম্পদ ধ্বংস করেছি, প্রমাণ করেছি এতে নিজের পায়ে কুড়াল মারা ছাড়া আর কোন লাভ-ক্ষতি নেই। এজন্যেই বলছিলাম, উন্নত নামে পরিচিত বিশ্বে আবেগ মানুষকে উগ্র ও তাড়িত করতে পারে না। যুক্তি ব্যাখ্যা আর শিক্ষা দিয়ে লাগাম টেনে ধরে তারা। নিজেদের দেশ ছাড়া অন্য কারো জন্য উদগ্রীব বা লম্ফ-ঝম্প দেয়ার মধ্যে উল্লাস নেই, আছে নিজেকে ছোট করার প্রবণতা। যে কোন খেলা বা আয়োজনে এটা মনে রাখার নামও কিন্তু দেশপ্রেম। (সিডনি থেকে) [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন