উপজেলা নির্বাচন:তারপর?

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৪০
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বিস্তর আলোচনা, বিতর্ক এবং বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। এবিষয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও কম নয়। প্রতিনিয়ত চায়ের কাপে ঝড় উঠছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অপেক্ষা বিএনপি ভাল ফলাফল করছে, জামায়াতের সাফল্য অভাবনীয়, জাতীয় পার্টির শোচনীয় পরাজয় ইত্যাদি আলোচনার প্রধান বিষয়। স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় এই নির্বাচনকে আরো নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ আছে। জয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে বিএনপি-জামায়াত কি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনে ফিরে আসবে নাকি বিগত সময়ের মত সন্ত্রাসনির্ভর সহিংস কর্মসূচি পালন করবে? নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে মন্ত্রী-এমপিরা কি সুশাসন ও জনকল্যাণে আরো বেশি মনোযোগী হবেন নাকি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও লুটপাটের গতানুগতিক ধারা অব্যাহত রাখবেন? ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দ দলকে সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে আরো শক্তিশালী এবং গণমুখী করার উদ্যোগ নেবেন নাকি বিভেদ, অনৈক্য, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে আরো জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন? এসব নানা প্রশ্নও নির্বাচনের ফলাফলের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি নিঃসন্দেহে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা যে ভুল ছিল দলটির বর্তমান অবস্থানে তাও প্রতীয়মান হচ্ছে। আমরা অনেকবার বলেছি, জনগণ ভোট দিলে এখন আর ফলাফল উল্টে দেয়া সম্ভব নয়। এর আগে সিটি নির্বাচন এবং চলমান উপজেলা নির্বাচনে বিষয়টি আবারো প্রমাণিত হলো। এক্ষেত্রে সরকারকেও ধন্যবাদ জানাতে হয়। তারা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার উত্কট অপচেষ্টা করেনি। জনমতের প্রতি এই শ্রদ্ধা নিঃসন্দেহে আমাদের গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ। বিএনপি বার বার বর্তমান সরকারকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক আখ্যায়িত করছে। নির্বাচন কমিশনকেও তারা কম গালিগালাজ করেনি। কিন্তু ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’ সরকার এবং ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ নির্বাচন কমিশনের অধীনে তারা নির্বাচনে গেছে। এটিও আমাদের গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হচ্ছে নির্বাচন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিএনপি গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। অথচ ওই নির্বাচনে তাদের জয়লাভের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল জামায়াতের খপ্পরে পড়ে দলটি নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে। উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি গণতন্ত্রকেও শক্তিশালী করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কতদিন এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে? বেগম জিয়া ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, উপজেলা নির্বাচন শেষ হলেই সরকার পতনের কঠোর আন্দোলনের ডাক দেবেন। তার এই কঠোর আন্দোলন কতটা নিয়মতান্ত্রিক হবে? নাকি আগের মত সন্ত্রাস, সহিংসতা, নাশকতা ইত্যাদি ফিরে আসবে। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। ২০১৩ সালে আন্দোলনের নামে যে তাণ্ডব আমরা দেখেছি নতুন করে আমরা কি আবার সেদিকে ধাবিত হচ্ছি? মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও রায় কার্যকর হওয়ার পরে জামায়াত-শিবির দেশে যে তাণ্ডব চালিয়েছে তা তাদের একাত্তরের ভূমিকারই পুনরাবৃত্তি। শিবির তাদের কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে আল-কায়েদাকে পিছনে ফেলে বিশ্বের তিন নম্বর সন্ত্রাসী সংগঠনের ‘মর্যাদা’ লাভ করেছে। এই জামায়াত-শিবির বিএনপির প্রধান মিত্র। সুতরাং বিএনপি যখন আন্দোলনের হুমকি দেয়, সংগত কারণে শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। আবার সরকারি দলের নেতৃবৃন্দও নানাভাবে উস্কানি দিয়ে চলেছেন। আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস করলে তারা আন্দোলনকারীদের হাত-পা কেটে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। সুতরাং উপজেলা নির্বাচনের পরে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে অনেকের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। গত দু’বছরের টালমাটাল রাজনৈতিক অঙ্গন এত তাড়াতাড়ি অস্থির হয়ে উঠুক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। উপজেলা নির্বাচনের পরে জামায়াতকে সাথে নিয়ে বিএনপি যদি নতুন উদ্যমে সন্ত্রাস ও সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু করে তবে তাদেরকে খুব একটা দোষ দেয়া যায় না। গত দু’বছর তারা আন্দোলনের নামে যা কিছু করেছে তার উপর ভিত্তি করেই জনমত তৈরি হওয়ার কথা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ফলে সেই জনমত যাচাই হয়নি। কিন্তু সিটি এবং উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, জনমত বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে। সুতরাং জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাস, সহিংসতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ হত্যা, রেল, বিদ্যুত্, সরকারি অফিস ও সম্পদে নাশকতা যা-ই করুক জনগণ তাতে ‘মাইন্ড’ করেনি। বরং ভোটের হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ২০০৮ সালের তুলনায় দলটি আরো বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। এমতাবস্থায় মানবতাবিরোধী রাজাকারদের রক্ষার আন্দোলনের নামে যাত্রীবোঝাই চলন্ত বাস-ট্রেনে পেট্রোল বোমা হামলা আবার ফিরে এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ বিরোধী দল হিসেবে এগুলো করেই বেশি জনপ্রিয় হওয়া যায়। নির্বাচিত হওয়ার পর বিরোধী দল সংসদ বর্জন করবে এটাই আশা করি আমরা। তাই জ্বালাও-পোড়াও না করে নিয়মিত সংসদে যাওয়া আমাদের পছন্দ নয়। উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় পার্টির করুণ দশা দেখে তাই মনে হচ্ছে। জাতীয় পার্টি মন্ত্রিসভায়ও রয়েছে। যারা মন্ত্রী হয়েছেন এখনো পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো অভিযোগ বা সমালোচনা চোখে পড়েনি। কিন্তু উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল বিবেচনায় দলটির জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। অথচ বাংলাদেশে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে এই জাতীয় পার্টি। তুলনামূলক বিচারে একটি অহিংস দলকে পিছনে ফেলে স্বাধীনতাবিরোধী সন্ত্রাসী দল তৃতীয় অবস্থান করে নিয়েছে। এটি আমাদের রাজনীতির জন্যও অশনিসংকেত। ইতোমধ্যে টিভি টক-শো এবং পত্র-পত্রিকায় উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের নানা ব্যাখা-বিশ্লেষণ হয়েছে, হচ্ছে। বিভিন্ন উপজেলায় পরাজয়ের একটি বড় কারণ একাধিক প্রার্থী। আমি কয়েকটি উপজেলার তথ্য জানি যেখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে। সেখানে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। কারণ আওয়ামী লীগের ওই একাধিক প্রার্থী। অনেক উপজেলায় প্রার্থী সমর্থনেও ত্রুটি ছিল। তৃণমূলের সাথে সম্পৃক্ততা, জনপ্রিয়তা, ইতিবাচক ভাবমূর্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো অনেক জায়গায় উপেক্ষিত ছিল। মন্ত্রী-এমপিদের জনবিচ্ছিন্নতা, অযাচিত হস্তক্ষেপও পরাজয়ের অন্যতম কারণ। অতি আত্মবিশ্বাস, দম্ভও কাল হয়েছে কোথাও কোথাও। বিপরীতে উপজেলা নির্বাচনকে বিএনপি নিয়েছে তাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে। জাতীয় নির্বাচনে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণে আগ্রহী এবং প্রস্তুত ছিলেন। সেখানে অংশগ্রহণ না করায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ এবং হতাশা ছিল। বিশেষ করে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের ক্ষমতায় ফিরে আসাকে প্রতিরোধ করতে না পারার ব্যর্থতা দলটির সামর্থ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এর থেকে উত্তরণ এবং স্থানীয় নেতা-কর্মীদেরকে চাঙ্গা করতে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিকল্প ছিল না। তাই জয়ের ব্যাপারেও তারা অনেক বেশি মরিয়া ছিল। অনেক জায়গায় বিএনপিতেও একাধিক প্রার্থী ছিল। কিন্তু তা আওয়ামী লীগের মত তীব্র সঙ্কট তৈরি করেনি। পাশাপাশি ১৯ দলীয় জোটের ঐক্য বেশ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে জামায়াত-বিএনপির পারস্পরিক ভোট বিনিময় উভয় দলকেই সুবিধা দিয়েছে। তা না হলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত এতগুলো উপজেলায় বিজয়ী হতে পারত না। কেবল স্বাধীনতার বিরোধিতা নয়, সাম্প্রতিককালেও তারা যে সন্ত্রাস ও সহিংসতা চালিয়েছে, ধর্মের নামে মিথ্যাচার করেছে তাতে দলটির জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসার কথা। উপজেলাসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত্ একটি তামাশা চলে আসছে। এটি ‘নির্দলীয়’ নির্বাচন! কিন্তু সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দলীয় প্রভাব অনস্বীকার্য। নির্বাচন শেষে কতটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের, কতটি বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির প্রার্থী চেয়ারম্যান হয়েছেন তা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়। বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন এবং উপজেলা নির্বাচনে দলীয় সমর্থন, প্রভাব, পরিচিতি ইত্যাদি সক্রিয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু সবই হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে। ভাসুরের নাম সবাই জানে, কেবল মুখে উচ্চারণ করে না। এ অবস্থার অবসান হওয়া উচিত। দলগুলো থেকে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও হয়েছে। কিন্তু এটি কি বিধিসম্মত? কারণ ‘নির্দলীয়’ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে প্রার্থীরা তো দলের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করেননি। আমরা চাই বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং উত্সবমুখর পরিবেশে হোক। জনগণ সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করুক এবং ফলাফলে জনমতের যথার্থ প্রতিফলন ঘটুক। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি রাজনীতিবিদদের অধীনেই পরিচালিত হতে হবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হয়েছে। এটি অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকেই এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেও বিএনপি তাদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করতে পারত। সরকার ভোটের ফলাফলকে উল্টে দিয়ে তা হজম করতে পারত বলে মনে হয় না। নির্বাচন প্রক্রিয়ার কোথায় ত্রুটি ও দুর্বলতা আছে তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা ও বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু বিএনপি এখানো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে মগ্ন হয়ে আছে। মনে হয় না এই ‘মৃতহস্তি’কে আবার জাগানো যাবে। সরকারেরও উচিত প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী করা। এসব বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য না হলে ‘উপজেলা নির্বাচনের পরেই’ হোক কিংবা ‘পাঁচ বছর’ শেষে সাধারণ নির্বাচনের আগেই হোক আমাদের আবার সেই তিমিরেই ফিরে যেতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবন যাবে, সম্পদ ধ্বংস হবে, অর্থনীতি পিছিয়ে পড়বে। এ আশঙ্কার স্থায়ী অবসান হওয়া প্রয়োজন। বস্তুত বৃহত্ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা এবং সহযোগিতা ব্যতীত আগামী দিনগুলো কারো জন্যই স্বস্তির হবে না, সুখের তো নয়ই। লেখক:সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন