বিজ্ঞাপন দৈনন্দিন জীবনে দেখা, শোনা একটি বিষয়। ঘরে, বাইরে স্যাটেলাইট চ্যানেল, পত্র-পত্রিকা, রেডিও, বিলবোর্ড ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা দেখি আর শুনি। মোদ্দাকথা বিজ্ঞাপন অপরিচিত কোন বিষয় নয়। স্বল্প বা ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসায়িক তথ্যকে ভোক্তারের কাছে, জনগণের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম মাধ্যম এই বিজ্ঞাপন। উত্পাদিত পণ্যকে ভোক্তার বা জনগণের কাছে বর্ণময়, অর্থবহ করে তোলার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপনে তৈরিতে মনোযোগী হন। তত্পর হন। বিষয়টি এখন আরও বেশি সৃজনশীল হয়ে উঠেছে। এইক্ষেত্রে পেশাদারিত্বেরও প্রসার ঘটেছে। বিজ্ঞাপনী সংস্থার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই সেক্টরে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য তরুণরাও বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা করছে। দক্ষতা বাড়াচ্ছে। প্রতিষ্ঠাও পাচ্ছে। দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে, কোন পণ্যকে ব্যবহার উপযোগী করে উপস্থাপনের সাফল্য পূর্বের তুলনায় বর্তমানে বেশি। প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। ঘরে বসে, দূরে থেকে মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য, দ্রব্য, বিষয় ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করে তা ক্রয় করতে, ভোগ করতে উদ্ভূত হয়, সচেষ্ট হয়। সুতরাং বিজ্ঞাপন ব্যবসার প্রসার, লাভের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি পণ্য সম্পর্কে জনগণের তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। কিন্তু পুরো বিষয়টি ফিকে হয়ে যায় যখন বিজ্ঞাপনের ভাষা, বিজ্ঞাপনের উপস্থাপনা জীবনবোধ থেকে সরে আসে। অর্থাত্ বিজ্ঞাপনে যখন ব্যবসা, জীবন থেকে অধিকতর গুরুত্ব পায় তখন বোধকরি সেই বিজ্ঞাপন জীবনের উপযোগিতা হারায়। বলতে চাইছি যে জীবনকে পরিপূর্ণ, অর্থবহ, প্রাচুর্যময়, সহজতর করতে বিজ্ঞাপনের সৃষ্টি, সেই বিজ্ঞাপন যখন জীবনের করুণ পরিণতিকে অবলম্বন বা ভিত্তি করে ব্যবসায়িক ফায়দা লুটবার সুপ্ত পাঁয়তারা করে তখন হতাশ হতেই হয়। ব্যথিত হতে হয়।
প্রাণীমাত্রই জন্ম-মৃত্যুর দোলায় ভাসমান এক সত্তা। সভ্যতার মোড়কে বেঁচে থাকবার আকুলতা তার মাঝে একমাত্র মানবজাতিরই। নিজেকে টিকিয়ে রাখতে, গড়ে তুলতে যে পিয়াস মানুষের তা সঙ্গত কারণে অন্য প্রাণীর নেই। সুখ, স্বপ্নের পাশাপাশি রোগ, ব্যাধির সহযাত্রা তাও মানুষের। দুঃখ, কষ্ট থেকে পরিত্রাণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সেটাও মানুষের।
সম্ভবত মানুষের জীবনের করুণ পরিণতি যতটা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করা যায়, তা অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে যায় না। হতে পারে মানুষ মানুষকে যতটা গভীরভাবে, নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারে, অন্য প্রাণীকে তা পারে না। এমন কিছু রোগ মানুষের জীবনে আসে, যা মরণকে আলিঙ্গন করে থাকে। মরণব্যাধি ব্যক্তিকে যেমন করুণ পরিণতিতে ঠেলে দেয়, তেমনি তার পারিপার্শ্বিকতাকেও বিপর্যস্ত করে। আবার রোগীর যে শারীরিক দুর্দশা, করুণ পরিণতি হয় তা সহ্য করার মত থাকে না। সহ্য করা যায় না। এ রকম একটি বিষয়কে বিজ্ঞাপনে কোন পণ্যের সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নেয়া কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে অন্ততঃ সেটা ভেবে দেখা উচিত। নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিষয় যদি বিজ্ঞাপনে আনতে আমাদের মাঝে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে, তাহলে জীবনের রোগ, ব্যাধির করুণ নির্মমতা কেন বিজ্ঞাপনের সাবজেক্ট হবে পণ্যকে বাজারজাত করে ব্যবসাকে প্রসারিত করবার জন্য ? মানুষ দৃশ্যমান অর্থে সুস্থ, সুন্দর, সহজ বিষয় দেখতে চায়। জীবনের কোন দুরাবস্থা যেন বিনোদন কিংবা ব্যবস ার উপকরণ হোক এমনটি প্রত্যাশিত নয়।
কিছু বিজ্ঞাপন দেখি যে, যেখানে পুরুষের ব্যবহার্য পণ্য উপস্থাপনের জন্য সুন্দর নারীকে বাধ্যতামূলক বেশ রঙ্গময়ভাবে উপস্থাপন করা হয়। অনেকটা উত্পাদিত পণ্যের সাথে নারীকেও যেন পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিজ্ঞাপনগুলোতে। বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয়তা, কাটতি বা বিজ্ঞাপনকে অধিক আকর্ষণীয় করে তুলবার এই প্রচেষ্টা নারীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা বা নারীর অবস্থানকে কতটা মর্যাদা সম্পন্ন করে তোলে সে প্রশ্নও থেকে যায়। আর যারা মডেলিং-এর পেশায় আছেন, তারাও কতটুকু এ বিষয়গুলো বুঝে কাজ করেন সে প্রশ্ন আর নাই বা করি। ব্যক্তির নিজেকে নিজের উপস্থাপন যদি অর্থবহ না হয়, মর্যাদাকর না হয় তাহলে সমাজের কি আর করার থাকে। নারী পুরুষ, কে কতটা পরিপূরক একে অপরের জন্য তা মর্যাদা, শ্রদ্ধা আর সম্মানের সাথে অনুধাবনের জন্য উপস্থাপনের দায়িত্বটা বোধহয় ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের।
মানুষের ভেতর সুস্থ মূল্যবোধ গড়ে তোলার জন্য মিডিয়ার ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যারা মিডিয়ার জন্য বিভিন্ন আইটেম তৈরি করেন, তাদেরকে বিষয়বস্তু নির্বাচনে সজাগ না হলে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বৈকি। দুগ্ধজাত খাবারের বিজ্ঞাপন দেখাতে গিয়ে যদি মারামারিতে প্রথম হওয়া দেখানো হয়, তাহলে সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে উঠার চাইতে পেশীশক্তির মহিমাই প্রকাশ পাবে। আবার অবাস্তব, কাল্পনিক বিষয় যখন বিজ্ঞাপনে ঠাঁই পায়, তখন বাস্তববিবর্জিত ধ্যান-ধারনায় মানুষ আসক্ত হয়ে পড়ে। আমাদের সমাজে একটি শিশু স্কুলে পা দেবার আগেই বিজ্ঞাপনের সাথে পরিচিত হয়। বিজ্ঞাপন প্রিয় হয়, বিজ্ঞাপনমুখী হয়। বিজ্ঞাপনের ভাষা, বিজ্ঞাপনের ছন্দ, গতি, সুর শিশুকে খুব সহজেই আকৃষ্ট করে। অধিকতর সেসব বিজ্ঞাপনের প্রতি আসক্তি বাড়ে, যেসব বিজ্ঞাপনে ফ্যান্টাসী থাকে, গতি থাকে। শিশুরা অবোধ, অবুঝ বিধায় বিজ্ঞাপন তাদেরকে জড়িয়ে থাকে অবলীলায়। দেখা গেছে অনেক অভিভাবক শিশু সন্তানকে খাওয়ানো, শান্ত রাখবার জন্য বিজ্ঞাপনের আয়ত্তে সন্তানকে লালন-পালন করেন। ফলে টিভি সেটের সামনেই শিশু সন্তানের কল্পনার জগত্, ভাবনার জগত্ গড়ে ওঠে। বিজ্ঞাপনে শিশুটি যা পায় তাই ধারণ করে রাখে বহুদিন। এই চর্চা রোধ করা জরুরি।
সবশেষে বলি, ব্যবসা জীবনের জন্য, জীবনের প্রয়োজনে। কিন্তু ব্যবসার জন্য জীবন, এই মানসিকতা জীবনের সৌন্দর্য, মর্যাদাকর অবস্থানকে ধূলিসাত্ করে, উন্নত অবস্থানে নেয় না। এতে মুষ্টিমেয় মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল হয় মাত্র। সমাজ কোনভাবেই উপকৃত হয় না। সমাজবিজ্ঞানী, সমাজবিদের বিষয়গুলো ভেবে দেখা দরকার। একাডেমিক সনদ নিয়ে যারা এই পেশায় আছেন, আমি বলতে চাইছি যারা সমাজবিদ হিসেবে পরিচিত, তাদেরকে সমাজ সংস্কারণে পুস্তক থেকে বেরিয়ে সর্বসাধারণের কাতারে দাঁড়িয়ে কাজ করা জরুরি। কপি-পেস্ট, মুদ্রিত শব্দের পরিধি বাড়ালেও প্রকৃতার্থে তা জীবনের কোন উপকারে আসে না এ কথা মেনে নিতেই হয়।
লেখক :উন্নয়নকর্মী
