বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৭
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির জন্য পাঁচটি বিদ্যুত্ বিতরণী সংস্থা ও কোম্পানির প্রস্তাবের উপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে তিনদিনব্যাপী গণশুনানি শেষ হইয়াছে গত বৃহস্পতিবার। গণশুনানি চলাকালে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) গড়ে ১৫.৯০, পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি) ১৫.৫০, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ২৩.৫০, পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৮.৫৯ ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ১২.৫৮৭ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করিয়াছে। তাহার প্রেক্ষিতে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৫.১৩ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করিয়াছে। তবে ইহাই শেষ কথা নহে। এ ব্যাপারে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাইবে। আর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হইবে চলতি মার্চ মাসের ১ তারিখ হইতে। এই পর্যন্ত যতগুলি প্রস্তাব আসিয়াছে তাহার যৌক্তিকতা নিয়া আলাপ-আলোচনা করা যেতেই পারে। ইহাতে দোষের কিছু নাই। কিন্তু সবকিছুর দাম বাড়িবে অথচ ভর্তুকি নির্ভর বিদ্যুতের দাম বাড়িবে না, এই বিষয়টির সহিত আমরা একমত হইতে পারি না। কতটুকু বাড়িলে তাহা যৌক্তিক ও সকলের জন্য উপকার হইবে তাহা অবশ্য ভিন্ন কথা। এই ব্যাপারে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বিইআরসি সুবিবেচনা ও বিজ্ঞতার পরিচয় দিবে বলিয়া আমরা বিশ্বাস করি। পত্র-পত্রিকায় এমন খবরও প্রকাশিত হইয়াছে যে, কোম্পানিগুলি অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করিয়াছে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে যাহাতে আগামী দুই-তিন বত্সর আর দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা না দেয়। সাধারণত মূল্য নির্ধারণের বেলায় যে কোন প্রস্তাবে অঙ্কের হেরফের হইতেই পারে। কিন্তু ইহাকে চূড়ান্ত মনে করা যুক্তিসংগত নহে। নিয়মমাফিক গণশুনানি অনুষ্ঠিত হইয়াছে। আশা করি, এখন সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত আসিবে। বিদ্যুতের দাম গত সরকারের আমলে কয়েকদফা বাড়ানো হয়। বিদ্যুত্ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হইলে তাহার অভিঘাত পড়ে সমাজের সর্বত্র। ইহা মানিয়া লইয়াও বলিতে হয়, বাস্তবতাকে কখনও অস্বীকার করা যায় না। কেননা এই সময়ে আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়ের দামও বাড়িয়াছে কয়েক দফায়। যেমন ডেসকো তাহার প্রস্তাবে বলিয়াছে যে, ক্রয়মূল্য ও অন্যান্য খরচসহ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ৭.১৪ টাকা। অথচ বিক্রি করা হইতেছে গড়ে ৬.৫৮ টাকা দরে। দাম না বাড়ানো হইলে চলতি অর্থবত্সরে কোম্পানিটিকে লোকসান দিতে হইবে ১৪৯ কোটি টাকা। এখন এই টাকা কোথা হইতে আসিবে? ভর্তুকি দেওয়া হইলে শেষপর্যন্ত তাহা জনগণের কাঁধেই চাপে। চাপ সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রের উপর যাহার দীর্ঘমেয়াদি পরিণাম কখনও ভাল হয় না। বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের শতকরা ৩৮ ভাগ মানুষ এখনও বিদ্যুত্ সুবিধার বাহিরে। তাহা হইলে যাহারা বিদ্যুত্ ব্যবহার করিতেছেন তাহারা কেন ন্যায্যমূল্য দিবেন না? ২০১১ সালের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, পশ্চিমা দেশগুলির তুলনায় চীন ও ভারতে বিদ্যুত্ সস্তা। তাহাও প্রতি ইউনিট গড়ে ০.০৮ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় ৬ টাকারও বেশি। সেখানে রেগুলেটরি কমিশনের মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ ইহার কম। যাহারা বিদ্যুত্ ব্যবহারে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন অথচ বেশি দাম দিতে অনিচ্ছুক, তাহাদের উচিত ধীরে ধীরে হইলেও বিদ্যুতের ব্যবহার কমাইয়া দেওয়া, কৃচ্ছতা সাধন করা। মনে রাখা দরকার, বিদ্যুত্ কোন বিলাসপণ্য নহে। বিদ্যুত্ ব্যবহারে আমাদের সচেতন হওয়া দরকার। আবার বিদ্যুত্ নিয়া পুকুরচুরি, লুটপাট, নানা অনিয়ম, সিস্টেমলস, অবৈধ সংযোগ ইত্যাদিও বন্ধ করা আবশ্যক। বিদ্যুত্ এক অমূল্য সম্পদ। আধুনিক জীবন-যাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। ইহার ব্যবহার করিতে হইলে অবশ্যই যথাযথ মূল্য দিতে হইবে। তবে এইক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ যাহাতে না বাড়ে সেই দিকেও লক্ষ্য রাখিবার বিষয় রহিয়াছে। আমরা মনে করি, গ্যাসের ন্যায় বিদ্যুত্ও উত্পাদনমুখী খাতে ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, যাহাতে মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ে। তবে বিদ্যুত্ উত্পাদন, প্রকৃত খরচ ইত্যাদি ব্যাপারে সরকারকে জনগণের নিকট জবাবদিহিও করিতে হইবে। বিশেষত রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের বিদ্যুত্ নিয়া জনমনে যে প্রশ্ন আছে, তাহার সদুত্তর দেওয়া প্রয়োজন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন